স্মৃতিসৌধের স্থপতি মাইনুলের নীরব প্রস্থান

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধের খ্যাতিমান স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নীরব প্রস্থান ঘটেছে। তিনি আর ইহজগতে বেঁচে নেই। আমাদের ছেড়ে অনেকটাই নীরবে পরপাড়ে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ নভেম্বর সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহির রাজিউন)। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

এর আগে স্থপতি মাইনুল হোসেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত ৯ নভেম্বর রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি অনেক দিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। রক্তচাপও ছিল খুব কম। হাসপাতালে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো গেল না। সন্ধ্যায় তার মরদেহ নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে এনে বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়।

তার স্মৃতির প্রতি আমরা জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। স্থপতি মাইনুল হোসেন কবি গোলাম মোস্তফার নাতিন। তিনি এমন এক কীর্তি রেখে গেছেন, যা বাঙালির স্মরণে চিরজাগরূক থাকবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত যে স্মারকসৌধ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শুধু নয়; বছরের প্রতিটি দিন দলে দলে নারী-পুরুষ-শিশু শ্রদ্ধায় অবনত হয়, তার স্থপতি তিনি। ৬৩ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে নিজেকে পাদপ্রদীপের আড়ালে রেখেছেন বরাবর, কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারীদের স্মরণে রাখার আয়োজন সম্পন্ন করেছেন অনন্য দতায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল প্রকৃত অর্থেই গণমানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম। তিনি নিজেকেও এদেরই কাতারভুক্ত মনে করেছেন।

জন্ম ও শিাজীবন : সৈয়দ মাইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী থানার দামপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মুজিবুল হক এবং মায়ের নাম সৈয়দা রাশিদা হক। বাবার চাকুরীর সুবাধে তাঁর জীবনের অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে এই ফরিদপুর শহরে। ফরিদপুর মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠানিক শিার শুরু হয়েছিল তাঁর। প্রাথমিক শিা শেষে ১৯৬২ সালে ভর্তি হন ফরিদপুর জেলা স্কুলে। ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। ১৯৭০ সালে তিনি যখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে (নকশা) ভর্তি হন। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন তখন তুঙ্গে। স্বাধীন দেশে ১৯৭৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রি পাশ করেন মাইনুল হোসেন।

কর্মজীবন : ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে ‘EAH CONSULTANT LTD.’ (ইএএইচ কনসালটেন্ট লিমিটেড) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও কয়েক মাসের মধ্যে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে। কয়েক মাস পর ওই চাকরি ছেড়ে একই বছরের আগষ্টে ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ এর চাকুরি ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে যোগ দেন ‘স্থপতি সংসদ লিমিটেড’ এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যনÍ তিনি আরো বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র হিসাবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি যোগদান করেন ‘শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েট লিমিটেড’ এ। এখানেও জুনিয়র স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি।

স্মৃতিসৌধের পটভূমি : ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পরপরই ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার সাভারে জাতীয় পর্যায়ে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভারের নবীনগরে ওই স্মৃতিসৌধের শিলান্যাস করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্মৃতিসৌধটি নির্মাণের উদ্যাগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে নকশা আহ্বান করা হয়। স্থান নির্বাচন, রাস্তা নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নের পর স্থাপত্যের নকশা নির্বাচনের জন্য দেশজুড়ে শিল্পী, স্থপতি ও ভাস্করদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হয়।

১৯৭৮ সালের জুন মাসে নকশা জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। জমা পড়া ৫৭টি নকশার মধ্যে বাঙালির স্মৃতির মিনারের জন্য নির্বাচিত হয় ২৬ বছরের তরুণ মাইনুল হোসেনের পরিকল্পনার নকশাটি। তার নকশা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের বেদিমূল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে সাতটি ত্রিকোণ কলাম, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ১৫০ ফুট উঁচু। এই সাতটি কলামে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায় সূচিত হয়েছে। আকার-আকৃতিতে ভিন্নতা থাকায় একেক দিক থেকে স্মৃতিসৌধকে দেখায় একেক রকম।

স্মৃতিসৌধের নির্মাণ শুরু : জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজের গোড়াপত্তন হয় ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে। নির্মাণের কাজ তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মূল স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৭৪ থেকে এবং ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিজয় দিবসের অল্প পূর্বে সমাপ্ত হয়। শেষ হয় ১৯৮৮ সালে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর সমগ্র নির্মাণ কাজ স¤পন্ন করে। বর্তমানে সৌধটির নির্মাণ কাজ তিন পর্যায়ে মোট ১৩.০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স¤পন্ন হয়।

স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন : স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো, কৃত্রিম জলাধার এবং উদ্যান তৈরির কাজ সমাপ্তের পর ১৯৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ওই সময়কার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। সৈয়দ মাইনুল হোসেন আপে করে জানিয়েছিলেন, স্মৃতিসৌধের উদ্বোধনী সে অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ পর্যন্ত জানানো হয়নি। গণমান্য রাষ্ট্রীয় অতিথিরা চলে যাওয়ার পর তিনি জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন নিজের সৃষ্টি।

স্থাপত্য ও তাৎপর্য : স্মৃতিসৌধের নকশা প্রণয়নের সময় মাইনূল হোসেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি যথাযথভাবেই বিবেচনায় নিয়েছেন। সৌধের মূল কাঠামো সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে বড় এই ক্রমে সাজানো হয়েছে। মাঝখানের দেয়ালটি দৈর্ঘ্যে সবচেয়ে ছোট, কিন্তু উচ্চতায় সবচেয়ে বেশি। সর্বোচ্চ বিন্দুতে সৌধটি ১৫০ ফুট উঁচু। এই সাতজোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি প্রধান পর্যায়কে নির্দেশ করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের গণমুখী শিানীতির জন্য আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে সামরিক শাসনবিরোধী স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা বিবেচনা করাসহ মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ হিসাবে বিবেচনা করে স্মৃতিসৌধটিকে রূপদান করা হয়েছে। এসবই এক সূত্রে গাঁথা, যা বাঙালি জাতিকে উদ্ভুদ্ধ করেছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার জন্য।

১৯৭১’র ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। একই বছর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ ল মানুষের প্রাণহানি হয়। এই সৃতিসৌধ আপামর জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়ায়ের স্মরণে নিবেদিত এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। সৃতিস্তম্ভ এবং এর প্রাঙ্গণের আয়তন ৩৪ হেক্টর (৮৪ একর)। এ ছাড়াও রয়েছে একে পরিবেষ্টনকারী আরও ১০ হেক্টর (২৪ একর) এলাকা নিয়ে বৃরাজি পরিপূর্ণ একটি সবুজ বলয়। এই সৃতিসৌধ সকল দেশ প্রেমিক নাগরিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ও সাফল্যের যুগলবন্দি রচনা করেছে। সাতটি ত্রিভুজ আকৃতি মিনারের শিখর দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায়ের প্রতিটি এক ভাবব্যঞ্জনাতে প্রবাহিত হচ্ছে। এই সাতটি পর্যায়ের প্রতিটি সূচিত হয় বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে চুয়ান্ন,আটান্ন,বাষট্টি,ছেষট্টি ও উনসত্তরের’র গণ-অভ্যথানের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। মিনারটি ৪৫ মিটার (১৫০.০০ ফুট)উঁচু এবং জাতীয় শহীদ সৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিন্দুতে অবস্থিত। মিনার ঘিরে আছে কৃত্রিম হ্রদ এবং মনোরম বাগান। সৃতিসৌধ চত্বরে আছে মাতৃভূমির জন্য আÍোৎসর্গকারী অজ্ঞাতনামা শহীদের দশটি গণ সমাধি। সৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে আরও রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ,অভ্যরথনা ক,মসজিদ, হেলিপ্যাড,ক্যাফেটেরিয়া।

স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের সর্বমোট আয়তন ৮৪ একর। স্মৃতিস্তম্ভ পরিবেষ্টন করে রয়েছে ২৪ একর এলাকাব্যাপী বৃরাজিশোভিত একটি সবুজ বলয়। স্মৃতিসৌধটির উচ্চতা ১৫০ ফুট। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশঃ বড়ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে নির্দেশ করে।

গৃহীত প্রকল্প : ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত প্রকল্প অনুযায়ী এখানে একটি অগ্নিশিখা, সুবিস্তৃত ম্যুরাল এবং একটি গ্রন্থাগার স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী রাষ্ট্র প্রধানগণের নিজ হাতে এখানে স্মারক বৃরোপণ করে থাকেন। স্মৃতিসৌধের মিনার ব্যতিত প্রকল্পটির মহা পরিকল্পনা ও নৈসর্গিক পরিকল্পনাসহ অন্য সকল নির্মাণ কাজের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তর।

উল্লেখযোগ্য কাজ : ১৯৭৬ সাল থেকে ২২ বছরের কর্মজীবনে মাইনুল হোসেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশার কাজ করেন। বিশেষ করে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৈয়দ মাইনূল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- জাতীয় স্মৃতিসৌধ (১৯৭৮), ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্টগ্রাম ইপিজেড কার্যালয় (১৯৮০), ঢাকা জাতীয় জাদুঘর (১৯৮২) ও উত্তরা মডেল টাউন (আবাসিক) (১৯৮৫), শিল্পকলা একাডেমীর বারো’শ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম ‘ঢাকা মিউজিয়াম’, সহ আরো অনেক কাজের নকশা বাস্তবায়ন করে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি : ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই স্থপতি, নকশা করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এর মধ্যে একুশে পদক (১৯৮৮) ও শেলটেক পদক (২০০৭) উল্লেখযোগ্য।

একটি অনন্য ইতিহাস : জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি স্মারক স্থাপনা। এটি সাভারে অবস্থিত। এর নকশা প্রণয়ন করেছেন স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। এখানে মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের দশটি গণকবর রয়েছে। বিদেশী রাষ্ট্রনায়করা সরকারী বাংলাদেশে সফরে আগমন করলে এই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন রাষ্ট্রাচারের অন্তর্ভুক্ত।

নিভৃতে একাকী জীবন : জীবনের শেষ দিনগুলোতে মাইনুল মানসিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। প্রচারের আড়ালে একেবারেই নিভৃতে একাকী জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। মাইনুল হোসেনের দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ২৩ বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় মাইনুল হোসেনের। এর পর থেকে তার জীবন কেটেছে একাকী। কারও সঙ্গে দেখা করতেন না, কথাও বলতে চাইতেন না। স্বেচ্ছায় বন্দি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর তার চিরপ্রস্থানও ঘটল অনেকটা নীরবেই।

শোক প্রকাশ : খ্যাতিমান স্থপতি মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করে গণমাধ্যমে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। তা ছাড়াও মাইনুলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।

রাষ্ট্রপতি তার শোকবার্তায় বলেন, মাইনুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি যে অবদান রেখেছেন, জাতি তা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে মাইনুল হোসেনের অনন্যসাধারণ নকশায় নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলা এবং বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে চিরভাস্বর থাকবে। এ মহান কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ জাতি চিরদিন তার নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শোক বিবৃতিতে বলেন, স্থপতি মাইনুল হোসেনের অমর কীর্তি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দৈশিক চেতনায় উদীপ্ত করবে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ স্থপতি মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে শোক বিবৃতি দিয়েছেন।

গৌরবদৃপ্ত : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সহকর্মী রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণকে এ মহান সংগ্রামের জন্য পরিপূর্ণভাবেই প্রস্তুত করেছিলেন। এ কারণেই বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সা চিরতরে দমনে পাকি¯-ানের বর্বর সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ নৃশংস গণহত্যা অভিযান শুরু করলেও তারা পরাভব মানেনি। বরং অসম সাহসে মাথা উঁচু করে শত্রুর মোকাবেলায় এগিয়ে গেছে; ছিনিয়ে এনেছে অনন্যসাধারণ বিজয়। সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ আমাদের মাথা উঁচু করে চলার প্রতীক। উন্নত ও সমৃদ্ধ, গৌরবদৃপ্ত ও মহিমান্বিত বাংলাদেশ গঠনের পথে দৃঢ়সংকল্পে এগিয়ে চলার প্রেরণা। মাইনুল হোসেন আমাদের গৌরবের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং তা ফুটিয়ে তুলেছেন তার নকশায়। তাকে দেশের শ্রেষ্ঠ সম্মান স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছে। হয়তো আরও নানাভাবে তাকে সম্মানিত করা যেত। এ েেত্র আমাদের দীনতাও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জনের জন্য যারা আত্মদান করে গেছেন, যারা ধ্রুবতারাসম জ্বলজ্বল করছেন, তাদের স্মরণ করার জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্থপতি এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য ও সম্মান আর কীই-বা হতে পারে! আমরা মাইনুল হোসেনের বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর সমবেদনা জানায়। জগতের প্রতিপালক যেনো তাকে জান্নতবাসী করেন এই কমানা আমাদের হাজার বার।

এম. কে. দোলন বিশ্বাস
ঢাকা রিপোর্ট

Comments are closed.