শিশু গৃহকর্মী এবং ‘মানবিক শিক্ষাকেন্দ্র’ আমাদের পরিবার

কমল কর্মকার: আমাদের অনেকের পরিবারেই গৃহকর্মী রয়েছে। এদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর; গড় বয়স আট থেকে ১৭ বছর। এর চেয়ে বড় বয়সি দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা পোশাকশিল্প বা অন্য কাজে চলে যায়। সাধারণত কন্যাশিশুরাই গৃহকর্মীর কাজ করতে আসে। অন্য একটি পরিবারের শিশু তো আমাদের পরিবারে এমনি এমনি আসে না; দারিদ্র্য আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েই তারা আসতে বাধ্য হয়।

এই শিশুরা তাদের চিরচেনা ধুলোমাখা শৈশবের স্মৃতি ফেলে, তাদের পরিবার ছেড়ে আসে অন্য একটা পরিবারে। তার পরও একটা ক্ষীণ স্বপ্ন থাকে তাদের চোখে- নতুন সমৃদ্ধ পরিবারটিতে থাকবে না খাবারের অভাব, আর টেলিভিশন দেখার সুযোগ তো মিলবেই। একটি পরিবার ছেড়ে এসে হয়তো আরেকটি পরিবার খুঁজে পাবে তারা।

কিন্তু কদিন যেতে-না-যেতেই তাদের সেই ক্ষীণ স্বপ্নটাও কর্পূরের মতো উবে যায়। তারা সেখানে তাদের কোনো পরিবার খুঁজে পায় না; উল্টো বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়।

পত্রিকার পাতায় প্রায়ই গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর ছাপা হয়। প্রতিনিয়ত নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে শিশু গৃহকর্মীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা মা-বাবা আত্মীয়স্বজন ছেড়ে একই বাসায় প্রায় বন্দি অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এই অবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু গৃহকর্মীদের মা-বাবা কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না।

গৃহকর্মীদের যে ধরনের নির্যাতন করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে- গালিগালাজ করা, ঠিকমতো খেতে না দেওয়া, বেতন না দেওয়া, কথায় কথায় গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, রুটি বেলার বেলুনি দিয়ে আঘাত, শরীরে গরম পানি ঢেলে দেওয়াসহ কিছু ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন।

কন্যাশিশু গৃহকর্মীদের অবস্থা বেশি নাজুক। শিশু গৃহশ্রমিকের মধ্যে শতকরা চার ভাগের তিন ভাগই কন্যাশিশু।

আমাদের দেশে শিশু গৃহকর্মীদের নেই কোনো বিশ্রাম নেওয়ার সময়, নেই পড়াশোনার সুযোগ, নেই সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের সুনির্ধারিত বেতন। তাই তারা ভীষণভাবে শিক্ষার অধিকার, খাদ্যের অধিকার, বিশ্রাম পাওয়ার অধিকার এবং বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কাজে অংশগ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে শিশু গৃহকর্মীদের দিয়ে অনেক বিপজ্জনক কাজ করানো হয়। যেমন- রান্না করা, মাছ-মাংস কাটা, গরম পানি ফোটানো ইত্যাদি। ফলে নিরাপত্তা-ঝুঁকি তো রয়েছেই সর্বক্ষণ।

গৃহকর্মীদের গায়ে ছেঁড়া ও মলিন পোশাক দেখলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও গৃহকর্মীদের দেখা যায় সব সময়ই ছেঁড়া পোশাক পরে আছে। অথচ আমাদের দেশে প্রতিবছর পোশাক রপ্তানি করে আয় হয় ২৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। দেশের সর্বত্র- অলিগলিতে, ভ্যানে, ফুটপাতে কম পয়সায় অনেক ভালো পোশাক পাওয়া যায় এখন। বস্ত্রশিল্পের উৎকর্ষের এ যুগে গৃহকর্মী শিশুরা ছেঁড়া পোশাক পরে থাকবে কেন?

গৃহকর্মী শিশুদের নিয়ে এসব অমানবিকতার বাইরেও অবশ্য কিছু ভিন্ন চিত্র রয়েছে। অনেক পরিবারই গৃহকর্মীদের প্রতি আচরণে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিছু কিছু পরিবারে শিশু গৃহকর্মীকে দেখে বাইরের কেউ ভাবতেও পারবেন না যে সে অন্য পরিবার থেকে আসা। আর তারা নিজেদেরও সেই পরিবারেরই একজন বলে ভাবছে। তবে এ চিত্র খুব বেশি নয়। এসব পরিবারের শিশু গৃহকর্মীদের প্রতি মানবিক আচরণ নিয়ে সংবাদ বা ফিচার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। এসব পজিটিভ সংবাদ সংবাদমাধ্যমে উঠে এলে অনেক পরিবারই মানবিক আচরণে উদ্বুদ্ধ হতো বলে আমার বিশ্বাস।

আমাদের শিশুরা আমাদের পরিবার থেকেই জীবনের মানবিক শিক্ষা লাভ করে থাকে। বাবা-মায়ের নৈতিক আদর্শই শিশুদের জীবনে প্রভাব ফেলে। গৃহকর্মীর প্রতি আমাদের কী আচরণ, তা তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আমরা যদি গৃহকর্মী শিশুটির প্রতি অমানবিক আচরণ করি, তাহলে সেই অমানবিক শিক্ষাটাই তার মানসগঠনে প্রভাব ফেলবে। তার চরিত্রে স্থায়ী হয়ে যাবে অমানবিকতা। নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াবে। হয়তো একসময় সে তার সহপাঠীকেই অনায়াসে খুন করে ফেলবে। যেমন, কিছুদিন আগে মিরপুরে স্কুলছাত্র এক কিশোরকে তার বাসার সামনে ছুরি মেরে খুন করল আরেক কিশোর স্কুলছাত্র।

এবার কোরবানি ঈদে আমার বাসার বারান্দা থেকে গরু কোরবানি দেখছিলাম। দেখলাম, গরুটিকে পা বেঁধে শোয়ানোর হলো। তারপর গলায় চালানো হলো ছুরি। এ সময় ওই পরিবারের বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও গরুটির ওপর হামলে পড়ে জাপটে ঠেসে ধরল, যাতে ছুড়ি চালাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। জবাই করার পর গরুর গলা থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। আর শিশু-কিশোররা মহা উৎসাহে চেঁচিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে। তাদের বয়স ছয় থেকে ১২ বছর। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। শিশুদের এ কাজে জড়িত না করলে কি হতো না! এত বড় একটা প্রাণী জবাইয়ের সঙ্গে হাতে-কলমে তাদের পরিচয় হয়ে গেল। এত রক্ত দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেল তারা। মনোবিজ্ঞানীরা এর খারাপ প্রভাব সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।

আলোচনা হচ্ছিল শিশু গৃহকর্মী আর আমাদের ‘মানবিক শিক্ষাকেন্দ্র পরিবার’ নিয়ে। শিশুরা অমানবিকতা আর নিষ্ঠুরতার প্রথম পাঠটা পেয়ে থাকে আমাদের পরিবার থেকে। বিশেষ করে, শিশু গৃহকর্মীর প্রতি আমাদের অমানবিক আর নিষ্ঠুর আচরণ দেখে দেখে তাদের পবিত্র, কোমল মনটা ধীরে ধীরে কলুষিত হয়ে যায়। নিষ্ঠুরতা তার চরিত্রে স্থায়ী হয়ে যায়। অথচ আমরা বাবা-মায়েরা যদি গৃহকর্মীদের প্রতি নিজের সন্তানের মতো স্নেহ-মমতা নিয়ে মানবিক আচরণ করি, তাহলে আমাদের শিশুরা তা দেখে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। আর প্রতিটি ঘরে ঘরে শিশুরা মানবিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠলে সমাজে খুনখারাবি, নিষ্ঠুরা অনেক কমে আসবে। স্থিতিশীলতা আসবে সমাজে।

সুতরাং আমাদের প্রতিটি পরিবার গড়ে উঠুক মানবিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
রাইজিংবিডি

Comments are closed.