মিটার, খুটি ও তার বাণিজ্য!

মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি
মাসুদ খান: সিরাজদিখান পল্লী বিদু্যুৎ সমিতি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। খোদ সমিতির লোকজনই মিটার, খুঁটি আর তার বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে। সমিতির অসাধু কয়েকজন লোকের যোগসাজশে গড়ে ওঠা দালালচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গ্রাহকসেবা। দালালদের টাকা দিয়েও বছরের পর বছর মিটার ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে না গ্রাহকরা। গ্রাহকদের টাকা পকেটে নিয়েও সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সিরাজদিখান উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহক হয়রানি সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সময়মতো টাকা জমা দিয়েও গ্রাহকরা বিদ্যুৎ সংযোগসহ মিটার পাচ্ছে না। ২০-৩০ জনের একটি দালালচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পল্লী বিদ্যুতের সেবা। দালাল ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না। আবার দালালকে টাকা দিয়েও বছরের পর বছর সংযোগ পাচ্ছে না গ্রাহকরা। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পেতে মিটারের জন্য ৬০০ টাকা, সদস্য ফরম ১০০ টাকাসহ ৭০০ টাকা জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও এখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

প্রায় দুই বছর আগে বালুরচর ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি গ্রামের মো. সেলিম মিয়া একটি মিটারের জন্য ১২ হাজার টাকা দেন পল্লী বিদ্যুতের দালাল হামিদুলের কাছে। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও মিটার পাননি তিনি। এ ব্যাপারে হামিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে পল্লী বিদ্যুতের সেবক পরিচয় দিয়ে শিগগিরই মিটারের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে জানান। উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোর্ড সদস্য মাহবুব মিন্টুর কাছেও টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে অনেক গ্রাহক।

কেয়াইন ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বাচ্চু শেখ বলেন, ‘প্রায় আট মাস আগে চারটি মিটারের জন্য ৪৮ হাজার টাকায় মিন্টুর সঙ্গে রফা হয়। তারপর তাঁকে ১২ হাজার টাকা দিই। অথচ আজও আমি মিটার পাইনি।’ তবে মাহবুব মিন্টু কারো কাছ থেকে মিটার বাবদ টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, বালুরচর ইউনিয়নের নাসির মেম্বার কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে মিটার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেন। কিন্তু মাসের পর পর মাস গেলেও গ্রাহকরা মিটার পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে নাসির মেম্বার বলেন, ‘জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বোর্ডের সভাপতি জাকির হোসেনের কাছে আমি মিটারের জন্য টাকা দিয়েছি। তিনি আমার বন্ধু মানুষ। শিগগিরই মিটারের ব্যবস্থা করবেন।’ লতুব্দী ইউনিয়নের মাহমুদপুর মহিলা মাদ্রাসার জামাল উদ্দিনের কাছ থেকে দুই বছর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে পল্লী বিদ্যুতের সভাপতি জাকির হেসেন ৭৫ হাজার টাকা নেন। কিন্তু আজও তারা বিদ্যুৎ পায়নি। এ ব্যাপারে জাকির হোসেনের মোবাইল ফোনে কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করে মঙ্গলবার পাওয়া গেলেও এ প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘আমি জাকিরের ভাই শাহ আলম। জাকির অসুস্থ। কথা বলতে পারবে না।’

একটি সূত্র জানিয়েছে, পল্লী বিদ্যুতের ওয়্যারিং পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম ও কর্মচারী ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে যোগসাজশে ওই দালালরা গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম দেব কুমার মালো বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রায় এক হাজার ১০০ গ্রাহকের টাকা জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১৫০ গ্রাহককে ইতিমধ্যে সংযোগ মিটার দেওয়া হয়েছে। ডুপ্লেক্স তারের অভাবে এখন সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিগগিরই ডুপ্লেক্স তার চলে আসবে। তখন সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘গ্রাহকরা আসলে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা নিজেরা অফিসে না এসে অন্যের মাধ্যমে কাজ করাতে বেশি পছন্দ করে। তাই একশ্রেণির দালাল তৈরি হলে হতেও পারে। ‘

কালের কন্ঠ