কত না আকুতি-মিনতি করছি, তবুও ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছিনা

পদ্মা সেতু
মোজাম্মেল হোসেন সজল: মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় জমি ও বাড়ি অধিগ্রহণের সব টাকা এখনও বহু পরিবার বুঝে পায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাপ দাদার ভিটে বাড়ি দিয়েও ক্ষতি পূরণের টাকার জন্য দিনের পর দিন ধরণা দিতে হচ্ছে ডিসি অফিস আর পদ্মা সেতু প্রকল্প অফিসে। আর এসব ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো তাদের ন্যায্য ক্ষতিপুরণের টাকা না পেয়ে ফুসে উঠছে।

এমনি একজন ক্ষতি পূরণের পুরো টাকা বছর গড়িয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত পায়নি বলে অভিযোগ করেন, লৌহজংয়ের উপজেলার দক্ষিণ মেদিনীমন্ডল গ্রামের মৃত আব্দুর রব শেখের ছেলে আলমগীর শেখ।

তিনি জানান, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে নদী শাসন ও পুর্নবাসন কল্পে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণের ফলে দক্ষিণ মেদিনী মন্ডল মৌজার আর এস দাগ নং ৭৬৭ ভূমিসহ সকল অবকাঠামো অধিগ্রহণ করা হয়। উক্ত দাগে সে সহ আরো দুজন বসবাস করেন। তারা সকল অবকাঠামোর যৌথ তদন্ত তালিকায় লিপিবদ্ধও হয় এবং ৭ ধারা নোটিশও পায়। নোটিশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র এলএ শাখায় জমা দিয়ে ক্ষতিপূরণের প্রাপ্য টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে আলমগীরের ক্ষতিপূরণের দেয়া টাকার পরিমাণ ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। যা তার সকল অবকাঠামোর প্রকৃত মূল্যের ৬ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। অথচ তার প্রতিবেশী বিল্লাল হোসেন ও মিজানুরের ক্ষতি পূরণের মুল্যে তালিকা যাচাই করে দেখা যায়, মিজানুরের দোচালা ঘরের মূল্যে ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা। আর সেখানে আলমগীরের ৪টি ঘরের মধ্যে বড় চৌচালা ঘরটি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে কথা হয় মুন্সীগঞ্জ এল এ শাখার সার্ভেয়ার ওবায়দুলের সাথে সে জানায়, আলমগীর শেখের টিনের চৌচালা ঘর যা কাঠের পাটাতন এই ঘরটি যৌথ তদন্তের সময় তালিকায় লিপিবদ্ধ হলেও (বিআইডিএস) ডাটায় নতুন ঘর চিহ্নিত করায় চূরান্ত যৌথ তদন্ত তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এ দিকে আলমগীর শেখের অভিযোগ, সে এই চৌচালা ঘরটি ১৯৯৮ সালে উত্তোলন করেন এবং সে সময়ের ঘওে লাগানো বিদ্যুতের মিটারের বিলও তার কাছে রয়েছে বলে তিনি জানান।

এমন বাদ পড়েছে এ এলাকার বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের ঘর। আলমগীর শেখের ৪টি ঘরের মধ্যে বড় ঘরটি বাদ দিয়ে মাত্র ৩টি ঘরের টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এমন বৈসম্যের শিকার এখানে বেশ কয়েকটি পরিবার। এর মধ্যে আলমগীর শেখসহ অনেকেই দীর্ঘ এক বছর ধরে দৌড়ঝাঁপ করেও কোন সুরাহা করতে পারছে না।

এই বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলা এল এ অফিসে ক্ষতিপূরন চেয়ে মামলা ও পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প মূল ভবনে ধরণা দিয়ে কোন সুরাহা হচ্ছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্থ এই পরিবারগুলো।

পদ্মা বহুমুখী সেতু ভুমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনা সহকারী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। কারন জেলা প্রশাসনের এলএ অফিস এই তালিকা করেছে। এই ঘরগুলো কেন বাদ পড়েছে তারাই ভালো বলতে পারবে।

এদিকে, “প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কত না আকুতি-মিনতি করছি। তবুও টাকা দিচ্ছে না জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার কর্মকর্তারা। আর কত ঘুরতে হবে আমাকে। কবে পাব জমি অধিগ্রহণের টাকা”-স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে জমি অধিগ্রহণের টাকা না পেয়ে আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলেন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পশ্চিম কুমারভোগ গ্রামের বাসিন্দা আসলাম শেখ। তার ৬১ শতাংশ জমি পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। শতাংশ প্রতি সরকার টাকা দিচ্ছে ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। সেই মোতাবেক সর্ব-সাকুল্যে জমি অধিগ্রহণ বাবদ আসলাম শেখ পাবেন ১ কোটি টাকার উপড়ে। এখনও পর্যন্ত এক টাকাও পাননি তিনি। আসলাম শেখের মত আরো অনেকেই পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণের টাকা পাননি। তাই আক্ষেপ দক্ষিণ মেদেনীমন্ডল গ্রামের সালাম দর্জিসহ আরো অনেকেরই।

সালাম দর্জি ছাড়াও উত্তর কুমারভোগ গ্রামের মিজান চৌধুরীর ১৪ শতাংশ জমি, পশ্চিম কুমারভোগের আলতামাছের ৪৮ শতাংশ ও সৈয়দ বেপারীর ১২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হলেও আজ অব্দি অধিগ্রহণ বাবদ সরকারের ঘোষিত টাকা বুঝে পাননি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ বাবদ টাকা না পেয়ে এমনই অসংখ্য পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কুমারভোগ গ্রামের ভুক্তভোগী খোরশেদ বেপারী জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় গিয়ে দিনরাত মাথা ঠুকেও জমি অধিগ্রহণের টাকা বুঝে পাচ্ছেন না তার মত আরো অনেকে।

খোরশেদ বেপারী বলেন, জীবনের শেষ সম্বল বলতে ১৪ শতাংশ জমি। আর পদ্মা সেতু নির্মাণে ১৪ শতাংশ জমির সবটাই অধিগ্রহণ করা হয়েছে। শেষ সম্বল অধিগ্রহণ বাবদ এক টাকাও বুঝে পাইনি।

জমি অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়ায় খোরশেদ বেপারীর মতই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার কর্মকর্তাদের দুষেছেন-মাওয়ার বিসা খা, মনির হোসেনসহ আরো অনেকে।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতুর পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে ১ হাজার ১’শ হেক্টরেরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে যশলদিয়া ও কুমারভোগ পুনর্বাসন প্রকল্প ও অতিরিক্ত আরো ২ টি পুনর্বাসন কেন্দ্রের জন্য ৩০ দশমিক ৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

পুনর্বাসন কেন্দ্র গুলোতে সর্বমোট ৯’শ ৯৮টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। ৪’শ ৫০ টি প্লট ইতিমধ্যে ভূমির মালিকদের মধ্যে বিলি করা হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- জমি অধিগ্রহণ বাবদ যারা টাকা বুঝে পাননি, তাদের অনেকেরই জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

আবার বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে আদালতে রয়েছে মামলা। অনেকের জমির মালিকানা একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছে। কাজেই প্রশাসন জমির মালিকানা বিরোধের কারণে জমি অধিগ্রহণের টাকা বুঝিয়ে দিতে পারছে না।

তবে কি পরিমাণ বিরোধপূর্ণ জমি পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে-তাও জানাতে অপারগতা জানিয়েছেন এলএ শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা