ধ্বংস হতে চলেছে মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘গণসদন’

ভবতোষ চৌধুরী নূপুর: অযত্ন-অবহেলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে চলেছে মুন্সিগঞ্জের অর্ধশত বছরের ঐতিহ্যবাহী নাট্যমঞ্চ ‘গণসদন।’ জাতীয়-স্থানীয় ও বিদেশি নাট্যশিল্পী-কলাকুশলীদের পদচারণায় একসময় মুখরিত থাকত এই মঞ্চ ও আশপাশের পরিবেশ। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় এই নাট্যমঞ্চের অাঙিনা থেকেই স্বৈরাচারী সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করেন মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ।

মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের মালপাড়া এলাকায় অবস্থিত তখনকার মহকুমা প্রশাসনের টিনশেড অডিটোরিয়ামটি মুন্সীগঞ্জ শহর উন্নয়ন কমিটি ১৯৭৮-৭৯ সালে পূনঃনির্মাণ করে ‘গণসদন’ নাম দেয়। ১৯৭৯ সালের ৭ জুলাই সেই সময়ের সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক এ. কিউ. এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ‘গণসদন’ নাট্যমঞ্চটি উদ্বোধন এবং এর নাম ফলক উন্মোচন করেন। দীর্ঘদিন পর ১৯৯৭-৯৮ সালে আবার সংস্কার করা হয় হলটিকে। এবং মূল ভবনের দুইপাশ দিয়ে বারান্দা তৈরি করা হয়। নির্মাণ করা শৌচাগার ও মেকআপ রুম।

‘গণসদন’ হলটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে মালপাড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি নাট্যসংগঠন গড়ে ওঠে। অনিয়মিত সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, আমরা ক’জন সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, মুন্সীগঞ্জ থিয়েটার, থিয়েটার সার্কেল, মুন্সীগঞ্জ সংগীতা একাডেমি, জয়-জয়ন্তী জলসাসহ বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন।

জেলা শহরে একমাত্র নাট্যমঞ্চ হিসেবে ‘গণসদন’ হলটি ব্যবহৃত হয়েছে ২০০৬-০৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। ওই সময়ের এক রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হলটির বেশির ভাগ অংশ পুরে যায়, নষ্ট হয়ে যায় ব্যবহারের সবকিছু। আর সেই সাথে শেষ হয়ে যায় নাট্যকর্মীদের আনাগোনা, বন্দ হয়ে যায় নাট্য আয়োজনসহ সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আস্তে আস্তে নাট্য সংগঠনগুলো স্থান পরিবতর্ন করে চলে যা বিভিন্ন এলাকায়। কালের বিবর্তনে ‘গণসদন’ নাট্যমঞ্চটি একেবারে ভূতুড়ে অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

এক সময়ের জাকজমকপূর্ণ ‘গণসদন’ নাট্যমঞ্চটি এখন ময়লার ফেলার ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। ভেতরের মেঝেতে জল জমে পরিণত হয়েছে ছোটখাটো পুকুর। বন্য গাছগাছালিতে পরিনত হয়েছে জঙ্গলে। বর্তমানে ‘গণসদন’ হলটির চিত্র দেখলে কারোরই বোঝার উপায় নেই অতিতে এখানে কখনো নাটক হয়েছে, মাসব্যাপী নাট্য আয়োজন করা হতো। দেশের খ্যাতিমান বরেন্য শিল্পী আলী যাকের-সারা যাকের, আব্দুল আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, রামেন্দ্র মজুমদার -ফেরদৌস মজুমদার, তারানা হালিম, সুবর্ণা মুস্তাফা, পীযূষ বন্দোপাধ্যায়, মানষ বন্দোপাধ্যায়সহ বর্তমান সরকারে মন্ত্রী নাট্যকার আসাদুজ্জামান নূর ও এই নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছে। মঞ্চায়িত হয় রক্তকরবী, কবর, কঞ্জুস, নূরুলদিনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, বাটুক পালোয়ান সহ খ্যাতনামা অনেক নাটক।

স্থানীয় এলাকাবাসী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শত-সহস্র শিল্পীদের পদচারণায় এক সময় গমগম করতো মালপাড়ার ‘গণসদন’ হলের চারপাশ। ঢাকা থেকে টিভি বা নামকরা কোন মঞ্চ নাট্যকর্মী আসার খবর শোনা মাত্রই এলাকার প্রতিটি ঘর প্রায় শুন্য হয়ে যতো। আবালবৃদ্ধবনিতাসহ নববধূরা ও ভীড় জমাতো ‘গণসদন’ হলটির আশেপাশে। একধরণের মুখর পরিবেশ বিরাজ করতো সেই সময় গুলোতে। আজ তার কিছুই নেই নেই সেই পরিবেশ একেবারে যা ইচ্ছে তাই হয়ে গেছে।

আগুনে পুরে যাওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের সাথে সংস্কারের বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে শুধু আশ্বাস আর মিষ্টি মিষ্টি বুলি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি।

শহরের সুধিজন ও বিভিন্ন নাট্যকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, প্রায় অর্ধশত বছরের পূরনো ‘গণসদন’ হলটিতে যেন ইচ্ছে করেই আগুন দেয়া হয়েছিলো। পুরিয়ে দেয়া হয়েছিলো মুন্সীগঞ্জের সংস্কৃতির দর্পণ। তা না হলে কর্তৃপক্ষ কেন এত উদাসীন। হলটি পুরে যাওয়ার প্রায় ৮ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও সংস্কারের নেই কোন উদ্যোগ।

এদিকে, জেলা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চটি একমাত্র ভরসার মুন্সীগঞ্জ জেলার নাট্যকর্মীদের। সরকারি পরিচালনায় পরিচালিত হলেও শিল্পকলার মঞ্চটি ব্যবহারের জন্য নাট্যকর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন যখন পূর্ব থেকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠানে সিডিউল দেয়ে থাকে। তখন বাধ্য হয়ে নাট্য সংগঠনগুলোর তাদের অনুষ্ঠান কিংবা আয়োজন পিছিয়ে দিতে হয় নইলে বন্ধ করে দিতে হয়।

মঞ্চের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নাট্য পরিচালনা। মঞ্চনাটক একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর জন্য অভিনয় শৈলীর মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। কারণ সরাসরি দর্শকদের সামনে নিজের অভিনয়-প্রতিভা বা দক্ষতাকে তুলে ধরার এ রকম ক্ষেত্র অন্য কোনো মাধ্যমে নেই। দক্ষ ও ভালো অভিনয় শিখতে হলে মঞ্চে নাটক করা অবশ্যক। তাই নাট্যকর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের একটাই দাবি নতুন নতুন নাট্যকর্মী সৃষ্টি ও যুবসমাজ রক্ষার লক্ষে অতিসত্বর ‘গণসদন’ নাট্যমঞ্চটি সংস্কার হউক। ফিরিয়ে আনা হোক পুরনো দিনের হারিয়ে যাওয়া জৌলুস আর মঞ্চের প্রানচঞ্চলতা।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল জানান, ‘গণসদন’ হলটি জেলার ঐতিহ্যে-ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই এই হলটিকে আধুনিক ভাবে নির্মাণের লক্ষ্যে ‘একনেক’এর কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমি ডিজি ও স্থানীয় এমপি ও (মুন্সীগঞ্জ-৩) তদবির করছেন। ১০০ শতাংশের উপর নির্মিত হবে ‘গণ সদন’ ভবনটি। এবং নাট্য সংগঠন গুলো অবাদে নাট্যচর্চার জন্য একটি করে কক্ষ বরাদ্দ থাকবে। মোটামুটি একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে তা বলা সম্ভব না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এটিএন টাইমস

Comments are closed.