ভিন্ন স্থানে শিকার হলেও, খুনগুলো সব একই কায়দায়

মুনীরুল ইসলাম: অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূস, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ কিংবা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার- ভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে শিকার হলেও তাদের সবার ওপর হামলার ধরন ছিল একই রকমের। মূলত গলা থেকে দেহের ঊর্ধ্বভাগ অর্থাৎ মাথাই ছিল আক্রমণকারীদের লক্ষ্যবস্তু।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইউনূস হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত, শাস্তিও হয়েছে দুজনের। হুমায়ুন আজাদ ও রাজীবের ওপর হামলাকারী হিসেবে বিচারের সম্মুখীনরাও জঙ্গি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলনের ওপর হামলার ধরন একই রকমই ছিল, আর এতে জঙ্গিরা জড়িত বলে দাবি করেছেন তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে।

একই কায়দায় হামলা হয়েছিল জঙ্গিদের ‘হিটলিস্টে’ থাকা ব্লগার আসিফ মহীউদ্দিনের ওপরও, তবে গত বছরের শীতকালে ওই হামলার সময় ভারী জামাকাপড় পরে ছিলেন তিনি, আর তাতে তিনি বেঁচে যান বলে পুলিশ জানায়।

সাভারে ব্লগার আশরাফুল আলমের ওপরও একইভাবে হামলা হয় এই বছরেরই ১ অক্টোবর, যাতে তিনি মারা যান।

এদের সবাই বিভিন্ন অঙ্গনেই জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করে আসছিলেন। অধ্যাপক ইউনূস মৌলবাদবিরোধী শিক্ষক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, হুমায়ুন আজাদের মৌলবাদ বিরোধিতা তো সবারই জানা।

আসিফের মতো রাজীব ও আশরাফুলও মৌলবাদবিরোধী লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন ব্লগে। অধ্যাপক শফিউল ছিলেন লালনভক্ত; আর বাউল দর্শনকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যায়িত করে বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর হামলা চালাতে দেখা গেছে জঙ্গিদের।

এক মাস আগে ঢাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার আহলে ‍সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নেতা নুরুল ইসলাম ফারুকীও ছিলেন জঙ্গিবাদের বিরোধী। তার পরিবারের অভিযোগও জঙ্গিবাদীদের দিকে।

ফারুকীতে তার বাড়িতে ঢুকে জবাই করা হয়, ঠিক একইভাবে ব্লগার আশরাফকে বাড়িতে ঢুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নির্জন স্থানে রাজীবকে কোপানোর পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা কেটে দেওয়া হয়েছিল বলে ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে।

এদের মধ্যে ইউনুস, হুমায়ুন আজাদ, রাজীব, আসিফের মতো অধ্যাপক শফিউলের ওপর হামলা হয়েছে পথে এবং নির্জন সময়ে। ফারুকী ও আশরাফের ওপর হামলা হয়েছে তাদের বাসায়।

লেখক-অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয় ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলার সময়। রাত ৯টায় মেলা থেকে বেরিয়ে তিনি বিপরীত দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লাগোয়া ফুটপাত দিয়ে এগোচ্ছিলেন টিএসসির দিকে।

তখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখনকার মতো সরব না থাকায় ওই সময়টাতে ফুটপাতের ওই পাশটা ছিল অনেকটাই নির্জন।

হামলার পর হুমায়ুন আজাদকে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল, তখন তার মুখ, মাথা ও গলা থেকে রক্ত ঝরে বুক ভেসে যাচ্ছিল।

এই লেখকের ভাই মঞ্জুর কবির হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, অজ্ঞান হুমায়ুন আজাদের মাথা, কাঁধ ও হাত পর্যন্ত ব্যান্ডেজ।

হামলার পরপরই হুমায়ুন আজাদকে হাসপাতালে নেওয়া গিয়েছিল, তাতে তিনি তখন বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছানোতে দেরি হয়, আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মৃত্যু র কথা জানান চিকিৎসকরা।

২০১৩ সালে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর ১০ দিনের মাথায় রাজধানীর মিরপুরের কালসীতে বাসার কাছে হামলার শিকার হন রাজীব।

এই হত্যামামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, একজন প্রথমে চাপাতি দিয়ে রাজীবের ঘাড় কোপ দেয়। এতে রাজীব পড়ে গেলে অন্যরা অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে।

গত ১৫ নভেম্বর অধ্যাপক শফিউলের ওপর হামলাকারীদের লক্ষ্যস্থল ছিল মাথা ও ঘাড়। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা বলেন, মাথা-ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ক্যাম্পাস সংলগ্ন যে এলাকায় দুপুরের পর নির্জন সময়ে শফিউলের ওপর হামলা হয়েছে, তার এক কিলোমিটারের মধ্যে ১০ বছর আগে ইউনুসের ওপর হামলা হয়েছিল ভোরে।

১ চিহ্নিত স্থানটিতে আহলে হাদিস মসজিদের কাছে খুন হয়েছিলেন অ্ধ্যাপক ইউনুস, ২ চিহ্নিত স্থানটিতে খুন হন শফিউল ইসলাম

২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে ফজরের নামাজ শেষে প্রাতঃভ্রমণের সময় ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিনোদপুরে নিজের বাসার অদূরে আহলে হাদিস মসজিদের পাশে ইউনুসকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক আটক করা হলেও এই হত্যাগুলোর ক্ষেত্রে ধারাল অস্ত্রের ব্যবহারই দেখা গেছে।

ইউনুস হত্যাকাণ্ডের আগেও উদীচী কিংবা সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা হলেও তখনও বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি তেমন প্রকাশ্য ছিল না।

২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজশাহীতে বাংলাভাইয়ের উত্থান ঘটলে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হচ্ছিল।

২০০৫ সালে জেএমবি সারাদেশে একযোগে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলে বাংলাদেশে জঙ্গিদের সক্রিয়তা নিয়ে সব সন্দেহ কেটে যায় সবার।

হুমায়ুন আজাদ হামলার পর হাসপাতালেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বই লেখার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীরা তার ওপর হামলা চালায়। তবে তখন তার বক্তব্য তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্ব পায়নি।

পরে তদন্তে এই হামলায় জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই হামলার প্রভাবে কয়েক মাস পর তার মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বর্তমানে ৫ আসামির বিচার চলছে আদালতে।

ইউনুস হত্যাকাণ্ডের মামলায়ও ২০০৭ সালে আট জঙ্গিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। পরে আদালতের রায়ে জেএমবির দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রাজীব হত্যাকাণ্ডে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান জসিম উদ্দিন রহমানী রয়েছেন।

যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তারা সবাই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং জঙ্গি ভাবাদর্শে দীক্ষিত বলে গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে।

অধ্যাপক শফিউল হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ‘আনসার আল ইসলাম-২’ এর নামে একটি ফেইসবুক পাতায় পোস্ট দেওয়া হয়েছে, যদিও এ ধরনের কোনো সংগঠনের নাম শোনেননি বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

তবে জেএমবি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ভিন্ন নামে জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার প্রয়াস দেখা গেছে, আর এর মধ্যেই আনসারুল্লাহ বাংলাটিম সংগঠনটির তৎপরতার খবর আসে।

বিডিনিউজ