পদ্মার ঢেউয়ে স্বপ্নের ঝিলিক

২০১৮ সালের মধ্যেই চালু হবে পদ্মা সেতু
মো. মাসুদ খান: ‘পদ্মার ঢেউ রে…’ কবি নজরুলের এই গান সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তির শিল্পী ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে যিনি শুনেছেন এবং উদ্বেলিত হয়েছেন, তিনিই বুঝবেন মর্মটা। গানটির সুরের মূর্ছনা যে অভূতপূর্ব আনন্দ জাগায় মনে, ঠিক এই মুহূর্তে মাওয়া ঘাটে পদ্মার পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে অনেকটা সে রকমই আনন্দ ও পুলক জাগাতে পারে আপনার মনেও। কারণ এখানে চলছে এক দারুণ আশাজাগানিয়া কর্মযজ্ঞ। নদীর বুক ফুঁড়ে জেগে উঠছে একটি স্বপ্ন, যে স্বপ্নের নাম ‘পদ্মা সেতু’। যে সেতু নিয়ে ঘটে গেছে অনেক হাঙ্গামা। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সহায়তা প্রত্যাহার করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দাতাগোষ্ঠী। মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে মন্ত্রী-আমলাদের নামে। দুর্নাম রটেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ধুলায় লুটেছে দেশের ভাবমূর্তি। বেকায়দায় পড়েছে সরকার। হতাশার আঁধার নেমেছে দেশবাসীর মনে।

অবশেষে একদিন ঘুরে দাঁড়ায় সব কিছু। সরকার ঘোষণা দেয়, কারো মুখাপেক্ষী হব না; পদ্মা সেতু বানাব নিজেদের টাকায়। দিকে দিকে স্লোগান ওঠে, ‘আমাদের পদ্মা সেতু আমরাই করব।’ সেই প্রত্যয়ের, সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ সত্যিই হচ্ছে! আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মায় মাথা তুলে দাঁড়াবে দেশের বৃহত্তম- ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই ‘স্বপ্নসেতু’। এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

সেতু পয়েন্টের এপারে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়া ও এর আশপাশে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা সেতু নিয়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। কোথাও চলছে রাস্তা নির্মাণের তোড়জোড়, কোথাও মাটি পরীক্ষার কাজ, কোথাও আবার চলছে নদীর ওপর প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ। আবার কোথাও বসানো হচ্ছে পাইল; তৈরি হচ্ছে বিরাটাকার ওয়ার্কশপ। তীর থেকে বিশাল বিশাল ক্রেনের সাহায্যে মালপত্র ওঠানোর কাজ চলছে জাহাজে জাহাজে।

২০০১ সালের ৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়ার পদ্মাপারে মৎস্য আড়তের কাছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সরকার বদলের পাশাপাশি সেতু প্রকল্পের কাজও থেমে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছর এবং এরপর এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রকল্পের কাজ তেমন এগোয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরকার গঠনের পর আবারও পদ্মা সেতু নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়। চুক্তি হয় বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকাসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে মাঝপথে বিশ্বব্যাংক প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে সাময়িক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তবে সরকার ঘোষণা দেয়, নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু বানানো হবে। সেই ঘোষণামতো শুরু হয়ে গেছে কর্মযজ্ঞ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেতুর অ্যালাইনমেন্টের (সারিসজ্জা) কাজ ইতিমধ্যে শেষ। গত ১ নভেম্বর থেকে মাওয়া প্রান্তে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। সেতুর অন্য প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরায় মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে ১৩ নভেম্বর থেকে। সেতুর অ্যালাইনমেন্ট বরাবর পদ্মা নদীর মাঝখানে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার একটি চরের বেশ কিছু বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা এ কাজে সহযোগিতা করছেন। অ্যালাইনমেন্ট বরাবর ওই চরের মাঝখান দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরি করা হবে। ওই চ্যানেল দিয়ে বড় বড় যন্ত্রপাতি মাঝের চরে নিয়ে যাওয়া হবে। চ্যানেল কেটে নদীতে ভাসমান প্ল্যাটফর্ম থেকে এখানে পাইল নির্মাণের কাজ চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

গত বুধবার থেকে চর কাটার কাজ শুরু হয়েছে। দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ চরটি কাটা হবে ২৫০ মিটার প্রশস্ত করে। এ জন্য চীন থেকে আনা ছয়টি বড় ড্রেজার চরের দুই পাশে স্থাপন করা হয়েছে। এর আগেই চরে অবৈধভাবে বসবাসরত ৫৬৩টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পদ্মা সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের নিয়োগ করা পদ্মা সেতুর মালামালের লজিস্টিক ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিংয়ের এজেন্ট এসআই চৌধুরী অ্যান্ড কম্পানি লিমিটেডের (সিকো গ্রুপ) নির্বাহী পরিচালক আলী আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, চীন থেকে এ পর্যন্ত চার শিপমেন্টে সেতুর মালামাল দেশে এসেছে। মূল সেতুর কাজ শুরু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জানা গেছে, পদ্মা সেতুর জন্য সিঙ্গাপুর, চীন ও জার্মানিতে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনার অংশ আগামী ২৭ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে রওনা হওয়ার কথা। আগামী ১৫ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ নাগাদ পদ্মা সেতুর মূল অংশের কাজ ব্যাপক আকারে শুরু হতে যাচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নির্মাণকাজের জন্য মাওয়ায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ পাইল ফেব্রিকেশন ওয়ার্কশপ বানানো হচ্ছে। মাওয়ার পাশে কুমারভোগে সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে এ ওয়ার্কশপের নির্মাণকাজ চলছে। ওয়ার্কশপে তৈরি হবে সেতুর পাইল। সেই পাইলের স্টিলের প্লেট আনা হবে চীন থেকে। বিভিন্ন মালামাল নিয়ে বড় বড় জাহাজ ওয়ার্কশপের পাশে ভেড়ানোর সুবিধার্থে একটি জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এই জেটির জন্য কংক্রিটের পাইল তৈরির কাজও চলছে। সেতুর জাজিরা প্রান্তে মাওয়ার কুমারভোগের মতো আরেকটি কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুর পিলারের জন্য মাটি পরীক্ষাও শুরু হয়ে গেছে। ৪২টি পিলারের ওপর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ সেতু নির্মিত হবে। ১৫০ মিটার পর পর বসানো হবে পিলার। এ ছাড়া দেড় কিলোমিটার করে উভয় পারে তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর জন্য আরো ২৪টি পিলার বসানো হবে। মোট ৬৬টি পিলারের জন্য ৬৬ পয়েন্টে মাটি পরীক্ষা করা হবে। মূল সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে নকশার সময় ১৩টি পয়েন্টে ইতিমধ্যে মাটি পরীক্ষা হয়ে গেছে। বাকি ২৯ পয়েন্টে এখন মাটি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে।

গত ৭ নভেম্বর থেকে মাঝ পদ্মায় মাটি পরীক্ষার কাজ শুরুর কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। এ জন্য মাটি পরীক্ষা যন্ত্রের লোড আরো বাড়াতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে শিগগিরই এ কাজ শুরু হবে। পদ্মা এখন অনেকটা শান্ত, তাই নদীতে ভাসমান বড় বড় ক্রেন কাজ করে চলছে নির্বিঘ্নে। স্বপ্নের সেতুর বাস্তবায়নের জোর গতি দেখে এই অঞ্চলের মানুষও খুব খুশি।

আপৎকালীন বাঁধ তৈরির কাজ শেষ
প্রায় ছয় বছর আগে মাওয়ায় পুরনো ফেরিঘাটের ১ নম্বর ঘাটে হঠাৎ ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। ঘাটের র‌্যামসহ বেশ কিছু দোকানঘর দেবে যায়। এ সময় সাতজন পদ্মায় নিখোঁজ হয়। তিন-চার বছর আগে ফের ব্যাপক ভাঙন দেখা দিলে ১ নম্বর ঘাটসহ মাওয়া ২ ও ৩ নম্বর ঘাট পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। পদ্মা সেতুর শুরুর পয়েন্টটি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে আপৎকালীন বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গত মে মাসে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে গাইড বাঁধ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন সেই বাঁধ ঠিকঠাক করা হচ্ছে।

সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহ্ নূর জিলানী (পিএসসি) কালের কণ্ঠকে জানান, সেতু এলাকার মাওয়ায় ব্যাপক ভাঙন ঠেকাতে জরুরি আপৎকালীন প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ মে মাসে শেষ হয়েছে। তীর থেকে নদীর দিকে প্রায় ১৩০ মিটার পর্যন্ত ধাপে ধাপে বালুর বস্তা ফেলে নদীর তলদেশ সমান করে ভাঙন রক্ষায় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর নদীর তলদেশে আধুনিক যন্ত্র দিয়ে জরিপ করে দেখা গেছে, গত বর্ষায় এ কাজের কোনো ক্ষতিই হয়নি। ফলে আপৎকালীন বাঁধটি এ অঞ্চলের জন্য আপাতত নিরাপদই বলা যায়। মাওয়া ঘাটকে শিমুলিয়ায় স্থানান্তরের রাস্তা নির্মাণের প্রায় দুই কিলোমিটার কাজও সেনাবাহিনী প্রায় শেষ করে এনেছে। সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ২০ বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন পদ্মা সেতুর সব ধরনের নিরাপত্তার কাজ করছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (নদীশাসন) শারফুল ইসলাম জনান, চীনের সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড কম্পানি পদ্মা সেতুর নদীশাসনের কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। প্রায় আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীশাসনের এ প্রকল্পে মাওয়া প্রান্তে প্রায় দুই কিলোমিটার ও জাজিরা প্রান্তে প্রায় ১২ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ হবে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাওয়া প্রান্তে আরো চার থেকে ছয় কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ করবে।

মাওয়া ঘাট শিমুলিয়ায় স্থানান্তর হচ্ছে : সেতুর কাজের সুবিধার্থে মাওয়া ঘাটকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কুমারভোগের শিমুলিয়ায়। প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ঘাটের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে যাত্রী ছাউনি নির্মাণের কাজ। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তাটিও প্রায় প্রস্তুত। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সম্প্রতি মাওয়া পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ মাসের মধ্যেই মাওয়া ঘাটকে শিমুলিয়ার নতুন ঘাটে স্থানান্তর করা হবে।

সেতু সম্পর্কে মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেছেন, ‘আমরা অসম্ভব আনন্দিত। সব ষড়যন্ত্র পার করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন পদ্মা সেতুর বাস্তব রূপ দিতে যাচ্ছেন। পদ্মা সেতুর মতো এত বড় এ প্রকল্পে আমার এলাকার জনগণ নিঃশব্দে জমি ছেড়ে দিয়েছে। যেখানেই সমস্যা হয়েছে, সেখানেই উপস্থিত হয়ে জনগণের মাথায় হাত দিয়ে বুঝিয়েছি। জনগণ বুঝতে পেরে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শেখ হাসিনার মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের জমি ছেড়ে দিয়েছে। এ এলাকায় আওয়ামী লীগকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বৃহৎ স্বার্থে কাজ করেছে। জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের বাড়ি মাওয়ার কাছে মেদিনীমণ্ডলে। তাঁরা নিজে ও তাঁদের পরিবারের লোকজনও জমি দিয়েছেন পদ্মা সেতুর জন্য। পুনর্বাসন কেন্দ্র করতে গিয়ে যেখানে কোনো সমস্যা মনে করেছি, আমি তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করেছি। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। পদ্মা সেতুর মূল কাজ প্রায় শুরুর পথে। মূল সেতু হয়ে গেলে দেশের জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে।’

লৌহজং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওসমান গনি তালুকদার বলেন, ‘কোনো চক্রান্তই সেতুর কাজ আটকাতে পারেনি। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

কালের কন্ঠ