নির্মিত হবে নান্দনিক শহর

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পাড় ঘিরে মহাপরিকল্পনা
আরিফুর রহমান: পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সেতুর চেয়েও বড় আয়োজন রয়েছে দুই পার ঘিরে। নদীর উভয় পারে বিদ্যমান দুই লেনের সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নির্মাণ করা হবে অত্যাধুনিক, দৃষ্টিনন্দন উড়াল সড়ক। উড়াল সড়কের অংশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ স্থাপন করে দেবে সেতু বিভাগ। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে বাংলাদেশের ভেতর এক টুকরো সিঙ্গাপুর।

পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চলে অত্যাধুনিক সুবিধাসংবলিত দেশের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর, আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র আর ব্যাপক পরিসরের আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগর চট্টগ্রামের পরই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হবে পদ্মাপার। নান্দনিকতা ও আধুনিকতার নিরিখে দেশের যেকোনো নগর-শহরকে পেছনে ফেলবে ওই এলাকা।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে যানবাহনের কারণে চাপ বাড়বে সড়কের ওপর। সে জন্য পদ্মা নদীর দুই পারে বিদ্যমান দুই লেনের যেসব সড়ক রয়েছে, সেগুলোকে চার লেনে উন্নীত করা হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে নির্মাণ করা হবে উড়াল সড়ক। নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। মধুমতী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ১৯ জেলার যোগাযোগ সহজ হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তাঁরা। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুতে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থাও থাকবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগও দেওয়া হবে। তবে এসব সংযোগ শুধু সেতুর অংশেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সেতুর দুই পাশে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণ করবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।

সূত্র জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাওয়ার শুরুতেই হোঁচট খেতে হয় ঢাকা থেকে বের হতে গিয়ে। যানজটের কারণে রাজধানীতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। যাত্রীদের যাতে যানজটে পড়তে না হয় সে জন্য রাজধানীর শান্তিনগর থেকে মাওয়া সড়কের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প পর্যন্ত সাড়ে তেরো কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উড়াল সড়ক নির্মাণের সমীক্ষার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। উড়াল সড়কটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপির ভিত্তিতে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রভৃতি করে দেবে সরকার। মূল উড়াল সড়কের অর্থায়ন ও নির্মাণকাজ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প পরিচালক আবদুল বাকি মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের মতোই উড়াল সড়কটি কোনো বেসরকারি সংস্থা করবে। মূল উড়াল সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর জোগান দেবে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান। উড়াল সড়কটি নির্মাণে মালয়েশিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত ২৯ এপ্রিল মালয়েশিয়ার সঙ্গে সরকারের একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রস্তাব পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা লৌহজংয়ের কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট পেয়ে বসতি গড়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রস্তাবিত উড়াল সড়কটি রাজধানীর শান্তিনগরে শুরু হয়ে পল্টন, গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার হয়ে হানিফ ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে বংশাল হয়ে বাবুবাজার ব্রিজের পাশ দিয়ে ঝিলমিলে গিয়ে শেষ হবে। রাজউকের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাড়ে তেরো কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সড়কটির প্রায় পুরোটাই যাবে সড়কের ওপর দিয়ে। এ জন্য জমি অধিগ্রহণ খুব কম করতে হচ্ছে। প্রস্তাবিত উড়াল সড়কের সঙ্গে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের সংযোগ স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মহাপরিকল্পনায় দেখা গেছে, ঢাকা থেকে খুলনা, যশোর এবং ঢাকা থেকে বরিশালে যাতায়াতের জন্য চার লেনের বেশ কয়েকটি সড়কের প্রকল্প রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার চার লেন প্রকল্প। এটি শুরু হবে বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে। শেষ হবে মুন্সীগঞ্জে পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কে। এরপর সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক শেষ হবে জাজিরা পয়েন্টে। সেখান থেকে মধুমতী নদীর ওপর কালনা সেতু পর্যন্ত চার লেনের আলাদা প্রকল্প। এরপর কালনা সেতু থেকে যশোরের বেনাপোল পর্যন্ত চার লেন প্রকল্প। ভাঙ্গা-বরিশাল রুটেও চার লেন সড়ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাজিরা থেকে খুলনা এবং চাঁদপুর যাওয়ার সড়কও চার লেন হবে।

জানা গেছে, ঢাকা থেকে মাওয়া ঘাট পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। মাওয়ায় যাওয়ার জন্য যে সড়কটি রয়েছে, সেটি দুই লেনের। এটিকে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। এ জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে একটি সমীক্ষার কাজ চলছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা সড়ককে চার লেনে উন্নীত করতে এই সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে গত বছর। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৮৬ কোটি টাকা, যাতে অর্থায়ন করছে এডিবি। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে সমীক্ষার কাজ শেষ হবে বলে জানা গেছে। এর পরই চার লেনের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সৈয়দ শহিদুন্নবী। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত সড়কপথের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। ফরিদপুর থেকে বরিশাল ১২৮ কিলোমিটার এবং বরিশাল থেকে কুয়াকাটা ১০৮ কিলোমিটার; পুরোটাই চার লেন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাজিরার যে অংশে গিয়ে পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক শেষ হবে সেখান থেকে ভাঙ্গা হয়ে বাটিয়াপাড়া দিয়ে কালনা সেতু পর্যন্ত সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭২০ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

কালের কন্ঠ