জমি গেলেও সেতুতে অবদান রাখতে পেরে খুশি

পদ্মা সেতু পুনর্বাসন কেন্দ্র
‘দেশের স্বার্থে সরকার আমার জমি নিয়েছে। বিনিমিয়ে পেয়েছি এই প্লট। গাছপালায় ভরা ছিল আমাদের আগের বাড়ি, তার জন্য মায়া লাগে। এখানে যতটুকু জায়গা পেয়েছি, তাতে ঘর-দুয়ার তুলতেই জায়গা শেষ। তবে তার পরও আমরা খুশি। আমাদের কিছুটা ক্ষতি হলেও দেশের বড় উপকার হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় সেতুতে আমাদেরও অবদান থাকছে- এটা ভেবে ভালো লাগে।’ কথাগুলো নাছিমা বেগমের (৬০)। দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলের আব্দুল ছাত্তার দর্জির স্ত্রী তিনি। পদ্মা সেতুর জন্য তাঁরা ১০ শতাংশ জমি দিয়েছেন কর্তৃপক্ষকে। বিনিময়ে তাঁদের সেতুর কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৫ শতাংশের একটি প্লট দেওয়া হয়েছে। আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন নগদ অর্থ। তাঁর অনুভূতি জানাতে গিয়েই ওই কথাগুলো বললেন নাছিমা বেগম।

খোরশেদ আলমও কুমারভোগে পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট পেয়েছেন। তাঁর স্ত্রী রীনা বেগম (৫৫) জানালেন, বাপ-দাদার ভিটেবাড়ির জন্য মনটা মাঝেমধ্যে কাঁদে। মেয়ে শিখা বেগম বললেন, ‘পুরনো বাড়ির সঙ্গে অনেক স্মৃতি, মনে হলে খারাপ লাগে। কিন্তু কী আর করব, দেশের প্রয়োজনে জায়গা ছেড়ে দিয়েছি। একটু বদ্ধ পরিবেশে থাকলেও ভালোই আছি।’

কুমারভোগের ওসমান বেপারীর স্ত্রী হাসিনা বেগম (৬৫) জানালেন, তাঁরা তিন গণ্ডা জমি দিয়েছেন সেতুতে। বিনিময়ে পেয়েছেন সাড়ে সাত কাঠার প্লট, সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিপূরণ। দুই ইউনিটের ফ্ল্যাট তৈরি করছেন প্লটে। প্লট আর নগদ অর্থ পেয়ে হাসিনা বেগমও যথেষ্ট খুশি, ‘এখন এ বাড়ির জন্যই মায়া লাগছে। নিজে কাছে থেকে বাড়ির কাজকাম তদারকি করে নিজের মতো তৈরি করতে পারছি। তাই এটিকে ঘিরেই এখন সব স্বপ্ন।’

যশলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট পেয়েছেন দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলের ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন হাতেম খাঁ। প্লট পেয়ে তিনি খুশি হলেও তাঁর কলেজ পড়ুয়া মেয়ে সুমাইয়া খানম শিউলি বলে, ‘আমাদের সাবেক বাড়ি থেকে এ এলাকাটা একেবারে শেষ প্রান্তে। এখান থেকে কলেজে যেতে অনেক অসুবিধা হচ্ছে। টাকা খরচ হচ্ছে বেশি। তার পরও আগে থাকতাম ভাড়া বাড়িতে আর এখন হয়েছে নিজেদের বাড়ি। বাড়ি দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।’

পদ্মা সেতুর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য মুন্সীগঞ্জের লৌহজং সেতুর এ প্রান্তে চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। প্রথমত, কুমারভোগে আরএস-২ ও যশলদিয়ায় আরএস-৩ পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নিলেও ক্ষতিগ্রস্তদের কথা চিন্তা করে পরে দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলে ১৬টি ঋষি পরিবারের জন্য গড়ে তোলা হয় পুনর্বাসন কেন্দ্র আরএস-৭। তবে এখানে আরো ৩০টি ব্যবসায়িক প্লটও রয়েছে, যা প্রয়োজন বুঝে বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ছাড়া পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড-সংলগ্ন কুমারভোগে গড়ে তোলা হচ্ছে পুনর্বাসন কেন্দ্র আরএস-৮, এখানে তৈরি করা হচ্ছে আড়াই শতকের ২৪৭টি প্লট। এ পুনর্বাসন কেন্দ্রে সাধারণত ভূমিহীনরাই বসবাস করবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরাও প্লট পাবেন এখানে। একমাত্র ভূমিহীন ক্ষতিগ্রস্তরা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প কিনে বিনা মূল্যে পাচ্ছেন এসব প্লট। আর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য (জমির পরিমাণ অনুযায়ী) ৩৪ হাজার ৪৫০ টাকা ও ৩১ হাজার ৪৫০ টাকায় প্রতি শতাংশ দামে এ জমি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কুমারভোগ আরএস-২ ও যশলদিয়ায় আরএস-৩ প্রকল্পে আরো ২০টি করে প্লট রিজার্ভ রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন বুঝে প্রকল্পে বসবাসকারীদের জন্য বাজারসহ নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। কুমারভোগ আরএস-২ পুনর্বাসন কেন্দ্রে এ পর্যন্ত প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছ ২৮২টি, যশলদিয়া আরএস-৩-এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২১০টি প্লট, ঋষিপল্লীর কোনো প্লট এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে প্রক্রিয়াধীন আছে। শিগগির এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে। আরএস-৮ প্রকল্পে এ পর্যন্ত মাত্র ২৬ জনকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলো নির্মাণাধীন। তবে আরএস-২ ও ৩ প্রকল্পের তুলনায় আরএস-৭ ও ৮ প্রকল্পে অধুনিক সুযোগ-সুবিধা কম থাকছে। যেমন, আরএস-২ ও ৩ প্রকল্পে ঢাকার মতো পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও ৭ ও ৮ প্রকল্পে কয়েকটি বাড়ি পর একটি করে গভীর নলকূপ থাকবে।

সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুনর্বাসন প্রকল্প) মো. তোফাজ্জেল হোসেন জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য মোট এক হাজার ১০০ হেক্টরেরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাওয়া প্রান্তের যশলদিয়া ও কুমারভোগ পুনর্বাসন প্রকল্পসহ দুটি অতিরিক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের জন্য ৩০.০৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৯৯৮টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০টি প্লট ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে বিলি করা হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন।

পুনর্বাসন প্রকল্প, অ্যাপ্রোচ সড়ক ও নদী শাসনের জন্য ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পদ্মা সেতুর জন্য মাদারীপুরের শিবচর, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় ইতিমধ্যে ১৭ হাজার ৯২৬ জন ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছে। ক্ষতিপূরণ বাবদ ইতিমধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। আর সেতুর অন্য প্রান্ত শিবচরের বাখরেরকান্দিতে একটি ও জাজিরায় দুটি পুনর্বাসন প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি এসব পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, শেষ হয় ২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল। জাজিরার দুটি প্রকল্পে এ পর্যন্ত ১৫৭ জন ও শিবচরের প্রকল্পটিতে ২০৩ জনকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। অনুমোদনের পর অনেকেই পুনর্বাসন প্রকল্পের প্লটে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসত গেড়েছে। প্রকল্পগুলোতে আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, ড্রেনেজ, স্কুল, মার্কেট, বাজার, মসজিদ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, পুকুরসহ আধুনিক সুবিধা রয়েছে।

শিবচরের বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন প্রকল্পে বসবাসরত মাওলানা মহসিন বলেন, পুনর্বাসন প্রকল্প খুবই উন্নতমানের করেছে। পানি সাপ্লাই থাকলেও এখনো অনেকে বিদ্যুৎ পায়নি।

তবে ইমারত হাওলাদার বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে আমার ভাইয়েগো তিন বিঘা জমি গেছে। প্রত্যেকে ২০ লাখ টাকার মতো ক্ষতিপূরণ পেলেও পুনর্বাসনে কোনো জায়গা পায়নি। আমাগো মতো অনেক পরিবারই প্লট পায়নি। জমির দামও কম ধরেছে। বিঘাপ্রতি দাম ধরেছে ১৪ লাখ টাকা, অথচ এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ লাখ টাকা।’ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (পুনর্বাসন) নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সবাই প্লট পাবে না। যাদের বসতবাড়ি গেছে তাদের মধ্যেই প্লট দেওয়া হবে।

এখন চাই কাজ :
জমি দেন, আপনাদের এলাকা দিয়ে পদ্মা সেতু হচ্ছে, কাজ তো আপনারাই করবেন। যখন সেতুর কাজ শুরু হবে তখন আপনাদের বিভিন্ন কাজের সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া হবে। এত বড় সেতুর কাজ কি আপনাদের না দিয়ে করা যাবে? সেতুর ভূমি অধিগ্রহণের আগে প্রশাসন ও সরকারদলীয় লোকজন জমি দেওয়াসহ সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য এভাবেই ভূমি মালিকদের বুঝিয়েছে তাঁদের জমি সেতুর জন্য ছেড়ে দিতে। এসব কথায় আশ্বস্ত হয়ে পদ্মা সেতুর এপারে মাওয়ার লোকজন সহজেই তাদের জমি ছেড়ে দেয়। তারা এখন কাজ চায়। তাদের দাবি, কোনো শর্ত ছাড়াই জমি ছেড়ে দিয়েছে তারা। এখন মূল সেতুর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এখানে নানা ধরনের সাপ্লাইয়ের কাজ আছে। প্রয়োজনে তাদের সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হোক। স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারদলীয় লোকজনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা করে তাদের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ ও প্রদ্যুৎ কুমার সরকার, শিবচর
কালের কন্ঠ

Comments are closed.