হাকিম হইয়া হুকুম কর… : পদ্মা সেতু

অজয় দাশগুপ্ত: ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে পদ্মা নদী অতিক্রম করার পর প্রশস্ত বিশ্ব রোডে এগিয়ে যেতে থাকলে শিবচরের পাচ্চর এলাকা চোখে পড়বে। সেখানেই বসবাস মহম্মদ আলী মৃধার। তিনি জানালেন, পদ্মায় সেতু নির্মিত হলে সড়কপথে ঢাকা জিপিও থেকে বরিশাল জিপিও পর্যন্ত দূরত্ব কমে দাঁড়াবে ১১০ কিলোমিটারের মতো। বাংলাদেশে যেসব ‘বিশ্ব রোড’ নির্মিত হয়েছে সেগুলোতে অনেক আনাড়ি চালকও ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাতে পারেন। পাজেরো ধরনের জিপগাড়ি অনায়াসে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার স্পিড তুলে দেয়। গাড়ির যাত্রীরা ভয় পায় বটে, কিন্তু চালকরা বলেন_ এমন ভালো সড়কে স্পিড তুলতে না পারলে গাড়ি চালানোর মজাই থাকে না।

ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গা অতিক্রম করে যারা সড়কপথে বরিশাল যাতায়াত করেন তাদের পথে মস্ত বড় বাধা পদ্মা নদী। এ নদী অতিক্রম করেই পেঁৗছাতে হয় কাওড়াকান্দি। তারপর ভাঙ্গা-টেকেরহাট-ভুরঘাটা-গৌরনদী হয়ে বরিশাল। পদ্মায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার পাশাপাশি এই পথের দূরত্ব কমিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। সেতুর কাজ দেখাশোনা করছেন প্রকৌশলী শফিকুল সাহেব। তিনি জানালেন, নদীর দুই তীরে ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মিত হবে। এর মধ্যে ঢাকার দিকে, অর্থাৎ মাওয়ার কাছে দেড় কিলোমিটার এবং অপর তীরে ১০.৫ কিলোমিটার। ইতিমধ্যে এ দুটি সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। সেতু এবং তার পাশাপাশি প্রশস্ত সড়ক নির্মিত হলে যেসব গাড়ি ঢাকা থেকে বরিশাল শহরে যাবে, তাদের মোট দূরত্ব কমবে ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। এখন এসব গাড়ি ভাঙ্গা, টেকেরহাট, মোস্তফাপুর হয়ে বরিশাল যায়। কিন্তু নতুন সড়ক নির্মিত হলে এসব এলাকা বাইপাস হয়ে যাবে। বর্তমানে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি প্রভৃতি জেলার বেশিরভাগ বাস-ট্রাক গাবতলী, মানিকগঞ্জ, পাটুরিয়ার পথে যায়। সেখানে পদ্মা নদী অতিক্রম করতে হয় ফেরিতে। তারপর দৌলতদিয়া, ফরিদপুর হয়ে ভাঙ্গা পেঁৗছে চলতে হয় বরিশালের পথে। ঢাকা থেকে এ পথে বরিশাল শহর যতটা দূর, ঢাকা থেকে মাওয়া পথে গেলে দূরত্ব তার চেয়ে ঠিক ১০০ কিলোমিটার কম। পদ্মায় সেতু হলে এবং তার সঙ্গে যে নতুন সড়ক নির্মাণ করা হবে তাতে এ দূরত্ব আরও ৩০-৩৫ কিলোমিটার কমে যাবে। বাহ, কী মজা!

বরিশাল অঞ্চলের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং আরও কয়েকটি দল একত্রিত হয়ে মুসলিম লীগকে ধরাশায়ী করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরিশালের পাশের জেলা গোপালগঞ্জের অধিবাসী। তার এক বোনের বিয়ে হয়েছে বরিশালের আগৈলঝাড়ার অধিবাসী আবদুর রব সেরনিয়াবাদের সঙ্গে। তিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্র তাকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। তার পুত্র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এখন জাতীয় সংসদের স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। এ মন্ত্রণালয় গ্রামবাংলার সড়কপথের উন্নয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের যে আসন (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) থেকে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, সেটি বরিশাল সংলগ্ন। ঢাকা-মাওয়া-ভুরঘাটা-গৌরনদী হয়ে সহজেই কোটালীপাড়া যাওয়া যায়। কোটালীপাড়া থেকে খুলনা-যশোর-বাগেরহাটও খুব কাছের শহর। মাওয়া-কাওড়াকান্দি পথে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ভাঙ্গা হয়েও যশোর যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে মংলা বন্দর এখন অনেক অনেক দূরের পথ। কিন্তু পদ্মা সেতু এবং তার সংলগ্ন নতুন সড়ক পথ ধরে মংলা বন্দর যত দূরে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর তার চেয়ে বেশি দূরে।

বরিশাল বিভাগে আরও অনেক মন্ত্রী রয়েছেন। বেগম মতিয়া চৌধুরী পিরোজপুরের নাজিরপুর এলাকার সন্তান। বরিশাল অঞ্চল কৃষির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু শিল্প বলতে তেমন কিছুই নেই। কৃষিভিত্তিক শিল্পের কথা বলা হয়, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় কেউ এগিয়ে আসেন না। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ভোলার অধিবাসী। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বিপদসংকেত ধ্বনিত হতে থাকলেই এ জেলার নাম আসে। স্বাধীনতার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ঝালকাঠি জেলার অধিবাসী। ষাটের দশক থেকেই তিনি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। আরেকজন বিশিষ্ট রাজনীতিক রাশেদ খান মেনন জাতীয় সংসদে একাধিকবার বরিশালের একটি আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তার হাতে রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন দপ্তর। শাজাহান খান রয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তার বাড়ি মাদারীপুরে। সেতু নির্মিত হলে ড্রেজিংয়ের তাগিদ কমে যাবে, এমন শঙ্কা রয়েছে। পদ্মা নদী না থাকলে প্রকৃতি-পরিবেশে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন রয়েছেন নিশ্চয়ই। জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী শরীয়তপুরের বাসিন্দা। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে তারা ঢাকায় না থেকে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ি থেকেই প্রতিদিন ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবেন। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা। সেতুটি তার জন্যও জরুরি।

বরিশালে বিএনপিরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা রয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বরিশাল শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি স্বল্পসংখ্যক আসনে জয়ী হয়েছিল। এর মধ্যে একটি আসন ছিল বরিশাল সদরে, যেখানে নির্বাচিত হয়েছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার। এ শহরের মেয়র পদটি রয়েছে বিএনপির হাতে। বর্তমান মেয়র বেশিরভাগ সময় ঢাকা থাকেন বলে অভিযোগ। সেতু হলে এ নিয়ে তাকে অভিযোগ শুনতে হতো না। ঢাকা থেকেই তিনি বরিশালে রোজ অফিস করতে পারতেন।

গোপালগঞ্জের ফারুক খান টানা পাঁচ বছর মন্ত্রী ছিলেন। সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিমও এ জেলার বাসিন্দা এবং জাতীয় সংসদে সবচেয়ে বেশিবার নির্বাচিত সদস্য। জাতীয় সংসদের উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরীর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায়। ভাঙ্গা থেকে অল্প দূরত্ব পাড়ি দিলেই তার বাড়ি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনও জাতীয় সংসদে মাদারীপুরের একটি আসন থেকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি মন্ত্রী হওয়ার পর পদ্মাতীরের অধিবাসীরা আশায় বুক বেঁধেছিল_ এইবার সেতু হবেই।

কথায় বলে, অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট। আবার এটাও ঠিক যে, অনেক বিশিষ্টজন হাত মেলাতে উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্প দ্রুতই সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। পদ্মা সেতু এবং সংশ্লিষ্ট কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্রে আমরা দ্বিতীয়টিই দেখতে চাই। দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বঞ্চনাবোধ যথেষ্টই রয়েছে। এতজন গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় রাজনৈতিক নেতার নিজ বাসভূম বরিশালের বিভিন্ন জেলা কেন পশ্চাদপদ, সে প্রশ্ন অনেকের। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে তার সুফল ভোগ করবেন মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বৃহত্তর যশোর ও খুলনার বাসিন্দারা। সেতুটি নির্মিত হলে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে সড়কপথে চার ঘণ্টারও কম সময়ে পণ্য চলে আসবে ঢাকায়। রেলপথ নির্মিত হলে সময় লাগবে আরও কম।

একবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডির এক প্রকৌশলীর কাছে ‘কুমিল্লা-ভ্রাতৃত্বের’ গল্প শুনেছিলাম। তিনি জানালেন, সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাকালে একবার রেলপথে সিলেট থেকে ঢাকা রওনা হয়েছেন। পথে স্বল্প সময় ট্রেনটি কুমিল্লায় থামার কথা। সময় ছিল শীতকাল এবং ট্রেনটি শেষ রাতের দিকে কুমিল্লায় থামবে। কুমিল্লার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ হয় সেজন্য কুমিল্লার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সব জাতীয় সংসদ সদস্য ভোররাতে রেলস্টেশনে দেখা করে নিজেদের আর্জি তুলে ধরেন এবং সফলকাম হন। বরিশাল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর এবং গোপালগঞ্জের নেতৃবৃন্দের নিজেদের আর্জি তুলে ধরার জন্য কারও দ্বারস্থ হওয়ার দরকার নেই। কারণ তারা নিজেরাই তো ‘হাকিম হয়ে হুকুম করতে পারেন এবং পুলিশ হয়ে ধরতে পারেন’।

পদ্মা নদীর দুই পাশে এখন বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে। দুই তীরেই অ্যাপ্রোচ রোড নির্মিত হচ্ছে। পাথর জমা হচ্ছে, বালু ফেলে নিচু এলাকা ভরাট করা হচ্ছে। সড়ক ও রেললাইনের জন্য জমি হুকুমদখল করা হয়েছে। বেশ কিছু পাকা ও আধাপাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা অফিস খুলে বসেছেন। সম্প্রতি সংবাদপত্রে খবর বের হয়েছে_ নদীর মাটি পরীক্ষার কাজ চলছে। ১৫০ মিটার পর পর নদীতে পিলার বসবে। পিলার স্থাপনের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ হবে এসব রিপোর্ট হাতে পেলে। একেকটি পিলারের দৈর্ঘ্য হবে ১২০ মিটার। পাশে তিন মিটার। পিলারগুলো ইস্পাতের তৈরি এবং তা আমদানি করা হবে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে স্থাপন করা হয়েছে পাথর-সিমেন্ট-বালুতে তৈরি পিলার। সেখানকার পিলারগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ৮৩ মিটার। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুউচ্চ আকাশছোঁয়া ভবনটির যা উচ্চতা, যমুনা সেতুর পিলারের গড় উচ্চতা অনেকটা সে ধরনের। পদ্মা সেতুতে ইস্পাতের পিলার নদীর তলদেশ দিয়ে চলে যাবে আরও প্রায় ৩৭ মিটার গভীরে। ঈশ্বরদীর পাকশী এবং ভৈরবের মেঘনায় যে সেতু রয়েছে তার পিলার যে ধরনের, পদ্মা সেতুতে সে ধরনের পিলার স্থাপন করা হবে। পিলারের ওপরে বসবে কংক্রিটের তৈরি স্ল্যাব। সেগুলো সেতু এলাকা থেকে খানিকটা দূরে তৈরি হবে।

সেতু তৈরি কাজের সুবিধার জন্য মাওয়া এলাকা থেকে ফেরি ও লঞ্চঘাট খানিকটা দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সেতুটি নির্মাণ করবে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর। এত বড় নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা তাদের রয়েছে কি-না, সেটা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. সাদিক আহমদের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা নতুন যেসব শহর নির্মাণ করছে সেগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের মডেল শহর নিউইয়র্ককে মনে হয় ‘৫০ বছরের পুরনো শহর’। চীনে নির্মিত হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম কয়েকটি সেতু। এর মধ্যে রয়েছে হংকং-ঝুহাই-মাকাও সেতু, যার দৈর্ঘ্য ২২.৮ কিলোমিটার। এর নির্মাণকাজ ২০১৬ সালে শেষ হবে। লান ঝাউ-উরুমকুই হাইস্পিড রেলওয়ের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে ২০১৩ সালে। এর ওপর দিয়ে দ্রুতগামী ট্রেন চলছে নিয়মিত। পদ্মা সেতু অনেক ছোট প্রকল্প। তবে এ সেতুটি চীনের কাছে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রমাণের চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশে তারা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণেও আগ্রহী এবং এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও তাদের রয়েছে।

চীন সেতু নির্মাণ এবং এর পাশাপাশি প্রমত্ত পদ্মা নদী শাসনের কাজটি ঠিকভাবে করতে পারবে কি-না সে বিষয়ে আমাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবশ্যই মনিটরিং থাকা চাই। ২৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে দুর্নীতি হবে না, সেটা নিশ্চিত করার উপায় সম্ভবত কারও জানা নেই। অনেক লোভাতুর চোখ স্থির হয়ে রয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বখরার জন্য। তবে আশা করব, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যেসব নেতার নাম এ লেখায় উল্লেখ করেছি, তারা নজর রাখবেন। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্টরা কিছু অনুশাসন মেনে চলেছেন_ যেমন, সেতুর কাজে যেসব পণ্য আমদানি করা হয়েছে তার কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা। হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও কাজ যেন থেমে না থাকে সেটাও নিশ্চিত করেছে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বরিশাল অঞ্চলের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তারা বড়ই অসহায় বোধ করেন। সড়কপথে ফেরি বন্ধ রাখা হয়। নৌপথে লঞ্চ ও স্টিমার চলাচলের তো প্রশ্নই আসে না। ত্রাণসামগ্রী পাঠানো যায় না। জরুরি বলে বিবেচিত কাজগুলোও তখন দিনের পর দিন ফেলে রাখতে হয়। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে শুধু পথের বাধাই দূর হবে না, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর শিল্প-কৃষি-ব্যবসার উন্নয়নের পথও খুলে যাবে। বরিশাল পরিণত হবে ঢাকার সবচেয়ে কাছের বিভাগীয় শহরে।

সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। কাজের প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যা দেখা দেবে। আশা করব, ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা রয়েছেন তারা বিশেষভাবে যত্নবান থাকবেন, যাতে যে কোনো বাধা সহজে দূর করা সম্ভব হয়। সেতুটি নির্মিত হচ্ছে নিজেদের অর্থে। এ অর্থের অনেক দায় আছে। তবে কাজটি সুসম্পন্ন করা গেলে এ ব্যয় দ্রুতই উসুল হয়ে যাবে। এ প্রকল্পের সুযোগে আখের গুছিয়ে নিতে তৎপর লোকের সংখ্যা কম হওয়ার কথা নয়। যমুনায় সেতু নির্মাণের সময় আমি অন্তত ১০ বার প্রকল্প এলাকায় গিয়েছি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের সরকারের আমলে এর কাজ হয়েছে। সেতু নির্মাণের সময় প্রকল্পের নামে অনেক বিলাসবহুল জিপগাড়ি কেনা হয়। এর কয়েকটি অন্য দল থেকে লোক ভাগিয়ে আনার জন্য উৎকোচ দেওয়া হয়েছে বলে জেনেছি। আরও অভিযোগ ছিল, সেতু নির্মাণের কাজে লেবার সরবরাহের জন্য স্থানীয় রাজনীতিকরা অন্যায়ভাবে চাপ সৃষ্টি করেন ঠিকাদারের ওপর। টাঙ্গাইলের এক প্রভাবশালী নেতা একদল লোক নিয়ে নির্মাণ এলাকায় প্রবেশ করতে বাধা পেয়ে নির্বিচারে ভাংচুরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ছোট-বড় ঠিকাদারি কাজের জন্য উৎপাতের শেষ ছিল না। পদ্মা সেতুতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে কি-না কে জানে।

সমকাল