ভালো থাকুক চাচা ও তার লাইব্রেরী!

রমজান মাহমুদ: শৈশব থেকেই বইয়ের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ ও দুর্বলতা ছিলো। বিশেষ করে কারো ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর প্রতি ছিলো প্রবল আগ্রহ। তাই যেখানে নতুন বইয়ের সংগ্রহ ও লাইব্রেরীর খোঁজ পেতাম বইয়ের নেশায় ছুটে যেতাম সেখানে। এক সময় এটি নেশাতে পরিনত হলো। নেশা থেকে এখনও ছুটে চলছি নতুন বই এবং লাইব্রেরীর খোঁজে।

অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল বিক্রমপুরের প্রসিদ্ধ কোন লাইব্রেরীতে যাব। আজ সেই স্বপ্ন কিছুটা বাস্তবায়িত হল। সবার প্রিয় এমদাদুল হক পলাশ চাচা। মাসিক বিক্রমপুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চাচা বলেই ডাকি। তার সাথে পরিচয় চাঁদের হাট করার সুবাদে। বিক্রমপুর বিষয়ে চাচা অনেকগুলো নিবন্ধ লেখেছেন। আমি সেগুলো প্রায়ই পড়তাম। খুব ভাল লাগত! মাঝে মাঝে ভাবতাম আমিও তো বিক্রমপুর নিয়ে কিছু লিখতে পারি। চাচাকে একদিন বললাম, চাচা আমি কি আপনার লাইব্রেরীটা পরির্দশন করতে পারি ? তিনি কিছু সময় নীরব থাকলেন। পরক্ষনে বলে উঠলেন। আসো, কোন একদিন। আজ যাব কাল যাব ভাবতে ভাবতে আমার আর কখনও যাওয়া হয়নি। আজ হঠাৎ মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরাম -এর সভাপতি ইকবাল হোসাইন ইকু বললেন, চলেন বিক্রমপুরের এক কৃতি ব্যক্তিত্ব পলাশ ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসি। অনেক দিনের লালিত এই ইচ্ছাটাকে বাস্তবায়িত করার সুযোগটি একদম হাত ছাড়া করতে চাচ্ছিলাম না। সাথে সাথে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে দিলাম।

পড়ন্ত বিকেলের সূর্য যখন গোধূলী লগ্নে ডুবোডুবো অবস্থা বিরাজমান। আমরা এক পা দু পা করে গেট দিয়ে সোজা সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলাম। গেট হতে চাচার গৃহের দিকে সোজা সরু একটি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার দু’পাশ সারি সারি গাছে আচ্ছাদিত। যতই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি ততই ছায়াঘেরা গাছের সারিগুলি দেখে অন্যরকম একটি শৈল্পিক পরিবেশ মনে হল। পলাশ চাচা যে একজন শৈল্পিক মন মানসিকতার অধিকারী এখানে না আসলে হয়ত তা বুঝা যেত না। শৈল্পিক হবেন না-ই বা কেনো ? যার লেখার হাত এতো গভীরে তার ভিতর শৈল্পিকতার ছোঁয়া লাগবে না, তা কি হয় ! চাচার অসংখ্য লেখা বিক্রমপুরের বিভিন্ন সাময়িক, সাহিত্য ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হযেছে। নবীন লেখকদের অনেকেই তার লেখা হতে সহায়তা নিতে পারেন।

মাসিক বিক্রমপুর মুন্সিগঞ্জের সবচেয়ে পুরনো ও জনপ্রিয় একটি পত্রিকা। ১৯৭৭ সাল হতে এটি প্রকাশিত হচ্ছে। চাচার যৌবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয়েছে এ পত্রিকাটিকে ঘিরে। যৌবনের অনেক ইচ্ছে, আশা- আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়াকে বির্সজন দিয়েছেন এ পত্রিকাটির কারনে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮১ সালে রেজি:ভুক্ত হয় জেলার সবচেয়ে প্রাচীন এ পত্রিকাটি। মাসিক বিক্রমপুর ছিলো চাচার সন্তান সমতুল্য। এ পত্রিকাটি-ই ছিলো তার সুখ-দু:খের নিত্য সঙ্গী। চাচা যখন মাসিক বিক্রমপুর নিয়ে কথা বলছিলেন তার চোঁখ টলমল করছিল। সন্তান হারা বিয়োগ যন্ত্রনায় যখন কোনো পিতার কন্ঠে থাকে শত হাহাকার । পলাশ চাচার কন্ঠে সে করুন আর্তনাদ শোনা গেলো। চাচার সে আর্তনাদ তিনি কাউকে বুঝতে দিতে চান না! একটু হেঁসে শুধু বললেন, বয়স হয়েছে না । এখন কি আর তোমাদের মতো কাজ করা সম্ভব ? আমি তার এ ‘সম্ভব’ কথার মাঝে কিছু একটা লুকানো যন্ত্রনার আভাস পেলাম। যা তিনি কারো কাছে প্রকাশ করতে চান না।

চাচার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে বলেই ফেললাম, চাচা আপনার লাইব্রেরীটা খুব দেখার ইচ্ছে ! চাচা একটু মুঁচকি হাঁসি দিয়ে লাইব্রেরীতে আমাদের নিয়ে গেলেন। ইকু ভাই লাইব্রেরীতে পদার্পন করে বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে গেলেন! আমি চাচার সংগ্রহে থাকা মুন্সিগঞ্জের পুরনো বইগুলো নেড়ে চেড়ে দেখছি আর ফাঁকে ফাঁকে চাচার সাথে কথা বলছি। চাচার ব্যক্তিগত সংগ্রহের সমৃদ্ধি দেখে আমি নিজে অবাক না হয়ে পারলাম না। মাসিক বিক্রমপুরের একবারে শুরুর সংখ্যা চাচা সযতেœ রেখে দিয়েছেন। যার প্রতিটি পাঁতায় পাঁতায় রয়েছে তার অসংখ্য হারানো স্মৃতি। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে তা আমাদের দেখালেন। স্বল্প সময়ে চাচার লাইব্রেরীতে অবস্থান করে কারো তৃপ্তি পূর্ণতা পাবে বলে মনে হয় না ! চাচাকে বিদায় বেলায় বললাম, আজ আসি। অন্য একদিন কিন্তু অবশ্যই আসব। চাচা মৃদু হাঁসলেন। আমিও হাঁসলাম !
দূর থেকে দাঁড়িয়ে চাচার লাইব্রেরীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। আর মনে মনে ভাবলাম ভাল থাকুক চাচা ও তার লাইব্রেরী !

লেখক: সাধারন সম্পাদক, মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরাম।

ক্রাইমবার্তা