খাল ভরাট: আলু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

তানজিল হাসান: বাসাবাড়ি তৈরির জন্য অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করে খাল, বিল, নদী, নালা ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখায় চলতি রবি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জের দু’টি উপজেলায় রবি ফসলের আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশের প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জে এবার আলুর চাষাবাদ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। একইসঙ্গে উন্নত মানের বীজ সংকট আলু চাষাবাদে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, ২০ হাজার হেক্টর জমির বেশ কিছু অংশ থেকে এখন পর্যন্ত পানি সরে না যাওয়ায় কৃষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

এ অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চলতি রবি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও সিরাজদিখান এলাকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বেশ কিছু অংশ জলাবদ্ধ হয়ে পানির নিচে পড়ে আছে। পানি নিষ্কাশনের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় এসব জমি থেকে পানি সরানো যাচ্ছে না। কৃষকরা অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে ধর্না দিলেও পানি নিষ্কাশনে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

নাগেরহাটের আলু চাষী সুনিল সরকার জানান, তিনি প্রতি বছর প্রায় ৪ একর জমিতে আলু চাষ করেন। এ বছর ভাল বীজের অভাবে তার আলু চাষাবাদ ব্যাহত হতে চলেছে। ডিলারের কাছে গিয়েও ভাল বীজ সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি।

এছাড়া সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার, উত্তর চাইন পাড়া, দক্ষিণ চাইন পাড়া, ভাটিংভোগ, ভবানিপুর, বাত্রৈশার, কড়ইতলা, সুজানগরসহ একাধিক এলাকার বর্ষার পানি এখনও জমি থেকে সরে যায়নি। ফলে রবি ফসলের চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তবে লৌহজং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল হাসান জানান, কৃষি জমিগুলোতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পলি পড়ে সংযোগ খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার পানি নামতে সময় লাগছে। উপজেলার বালিগাঁও-ঘৌড়দৌড় খাল, আটিগাঁও-মর্শদগাঁও খাল, পুরাগঙ্গা খাল, পুরাগঙ্গা সংযোগ সুবচনি নওপাড়া নাগের হাট খাল ও দক্ষিণ হলদিয়া-গোয়ালী, মান্দ্রা-শ্রীনগর খালসহ ৫টি খাল সংস্কারের জন্য পরপর দু‘বার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি সেচ ভবনে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘খাল খননের বিষয়টি আমাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এটি দেখে বিএডিসি। তারপরও তাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। খুব শিগগিরই এর প্রতিকার হবে আশা রাখছি।‘

বর্তমানে উপজেলার ৮ হাজার ৬৫০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু, ২ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে বোরো, ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা, ৮৫০ হেক্টর জমিতে ডাল জাতীয় শস্য, ২৬০ হেক্টর জমিতে শাকসবজি, ১শ হেক্টর জমিতে গম এবং এক ফসলি জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৮৭৭ হেক্টর। উপজেলায় দু ফসলি জমির পরিমাণ ৪ হাজার ৪৯০ হেক্টর ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ ১৬০ হেক্টর বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।

সিরাজদিখান উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা রাসেদুল হাসান জানান, রবি মৌসুমে সিরাজদিখানে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে রবি ফসল চাষাবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে নয় হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আলুর চাষ হয়। অধিকাংশ জমিতে এখনও পানি রয়েছে। তবে রবি মৌসুম শেষ হবার আগেই এসব পানি জমি থেকে নেমে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, মানুষ জমি ভরাট করে নতুন নতুন বাড়ি তৈরি করায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এগুলো সহসাই দূর করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে রবি চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে সিরাজদিখান কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল আজিজ জানান, এই এলাকার কিছু জমি উঁচু, কিছু জমি নিচু। যেসব এলাকার কথা বলা হয়েছে সেগুলো বিল এলাকা। আর বিল এলাকার পানি সরে অগ্রহায়ণের শেষে বা পৌষের শুরুতে। এতে চাষাবাদে কোনও সমস্যা হবে না, গতবছরও হয়নি। গত মৌসুমে এই উপজেলায় আলু উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫০ টন, সরিষা ১ হাজার ৬৩৭ টন, ডাল জাতীয় শস্য ১১৪.২ মেট্রিকটন।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.