শহীদ মিনারে ৯ বিশিষ্টজনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা এবং আমার কিছু কথা

রাহমান মনি: একটা সময় ছিল যখন কেবলি কোনো সংগঠনের পদবঞ্চিতরা একে অপরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করত। এরপর রাজনৈতিক নেতারা শুরু করলেন বিরুদ্ধ মত পোষণকারী অর্থাৎ একে অপরকে নিজ নিজ এলাকায় ঘায়েল করার নামে অবাঞ্ছিত ঘোষণা। বিরোধী দলের বিশেষ ব্যক্তিদেরও পেশি শক্তি প্রয়োগে বাধা দিয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা। তবে তা ছিল নেহায়েতই কম। বিংশ শতাব্দীর শেষ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে অবাঞ্ছিত নামের নাজেহাল করা হয়।

আমার জন্ম স্বাধীনতার আগে হওয়ায় বাংলাদেশের জন্ম অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ শহরের মাঠপাড়া গ্রামেই আমি বড় হয়েছি। এই মাঠপাড়া সংলগ্ন মুন্সীগঞ্জ হরগংগা কলেজ ছিল পাক হানাদারদের ক্যাম্প। তাই পাক হানাদারদের অত্যাচার খুব কাছ থেকে দেখার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো একটি দল বা বাহিনী বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠী দ্বারা এককভাবে সংগঠিত হয়নি। কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার ছাড়া বাংলার আপামর জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আমার মা, চাচি, খালা, ফুফুদের দেখেছি কীভাবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। গ্রামের সহজ-সরল লোকদের দেখেছি, কীভাবে তারা শহরের লোকদের আশ্রয় দিয়েছেন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছেন। অচেনা মানুষকেও সহযোগিতা করেছেন সম্পূর্ণ উজাড় করে। কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবার আশায় কেউ যুদ্ধ করেননি।

স্বাধীনতার পর সেই সব কুলাঙ্গারকে শাস্তি দিতে দেখেছি। মুন্সীগঞ্জে তেমন কোনো নামকরা রাজাকার ছিল না। একজন ছিল যার নাম পোকা (ভালো নাম জানা নেই)। স্বাধীনতার পর একদিন জুম্মার নামাজের পর পানির ট্যাঙ্কের সঙ্গে টানিয়ে আখ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার দৃশ্যও দেখেছি। কিছুক্ষণ মারার পর শরীরের ফেটে যাওয়া স্থানগুলোতে লবণ মেখে দেয়ার পর গগনবিদারী আর্তনাদ শুনেছি। কিন্তু তখন এবং পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে রাজনীতি করতে দেখি নাই। কুলাঙ্গারদের শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি বীরদের সম্মাননা (খেতাব) দিতে দেখেছি। বীরত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হয়েছেন জাতীয় বীরেরা। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলেও এসব বিতর্কের কথা কখনোই শুনিনি। এখন আবার খেতাব কেড়ে নেয়ার আবদার করাও শুনতে হচ্ছে।

স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর কিছুটা হলেও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ কথাটি সমাজে চালু হতে থাকে। নব্বই-পরবর্তী তা ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। বিশেষ করে ভোটের আগে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ২০০০-পরবর্তী তা মহামারী আকার ধারণ করে। এই সময় থেকে মতের বিরুদ্ধে গেলেই যাকে-তাকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী আখ্যায়িত শুরু হয়। তবে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ২য় দফায় ক্ষমতা গ্রহণ করার পর সরকারের সরলতার সুযোগ নিয়েই হোক আর দুর্বলতার সুযোগেই হোক, চেতনার ফেরিওয়ালা কিছুসংখ্যক সুবিধাবাদী মতলববাজ নেতা নামধারীরা ভূঁইফোড় সংগঠন খুলে সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টার আড়ালে সরকারের বদনাম কামানোর চেষ্টায় মেতে উঠে। তারা মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে যখন-তখন সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন বিশেষণে আখ্যায়িত করছে। এতে সরকার দেখেও না দেখার ভান করে তাদেরকে এক প্রকার প্রশ্রয় দিচ্ছে।

সরকারের এই প্রশ্রয়ের সুযোগে অতি সম্প্রতি (১৫ অক্টোবর শুক্রবার) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক সমাবেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান নামের একটি সংগঠন মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম নামের সংগঠনের উপস্থিতিতে দেশের ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত (!) ঘোষণা করে।

অবাঞ্ছিত ঘোষিত এই বিশিষ্ট ৯ জন হলেন, বিশিষ্ট কলামিস্ট ফরহাদ মজহার, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক ড. মাহফুজউল্লাহ্, ইংরেজি দৈনিক ‘নিউএজ’-এর সম্পাদক নুরুল কবীর, ‘দৈনিক মানবজমিন’ সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ‘সাপ্তাহিক’ সম্পাদক ও লেখক গোলাম মোর্তোজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. তুহিন মালিক, দিলারা চৌধুরী এবং আমেনা মহসিন। তাদের সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বনামধন্য।

তথাকথিত এই দুই সংগঠন কর্তৃক অবাঞ্ছিত ঘোষিত বিশিষ্টজনদের নাম দেখে আমি মোটেও অবাক হইনি। আর এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপতি এ কে খন্দকার, সংগঠক ড. কামাল হোসেন, সেক্টর কমান্ডার জেনারেল জিয়া, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, মীর শওকত, কর্নেল অলিদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার, পাকিস্তানের চর, দোসর কিংবা অন্যান্য বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়ে থাকে অহরহ, সেখানে এই বিশিষ্ট ৯ জন তো আর মুক্তিযোদ্ধা নন। তারা হচ্ছেন কথার যোদ্ধা, স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ছাড়াও একটি ক্ষেত্রে তাদের মিল পাওয়া যায় আর তা হলো কথা যুদ্ধের মিল। টকশোতে অংশগ্রহণ।

সম্প্রতি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে টকশোতে তারা বিভিন্ন কথা বলে থাকেন, যা অনেক সময় সরকারের বিরুদ্ধেও চলে যায়। টকশো হয়ে যায় সরকারের জন্য সত্যিকার অর্থেই টক।

কিন্তু যে দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল সেদেশের সরকার যে গঠনমূলক সমালোচনাও যে বরদাস্ত করবে না, তা এসব কথা যোদ্ধারা বুঝতে চান না। তাই সমালোচনা হোক না তা গঠনমূলক বা পর্যালোচনামূলক, সমালোচনা তো সমালোচনাই, তাই কাফফারা তাদের দিতেই হবে। আর কাফফারা হিসেবে দেশের যেকোনো শহীদ মিনারে তাদের চলাচলের ওপর বিধি নিষেধ জারি, তাই এতে অবাক হবার মতো কিছু পাইনি।

এই ৯ বিশিষ্টজনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণায় যুক্তি দেখানো হয়েছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগে অর্জিত দেশের সব শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধের পবিত্রতা রক্ষার্থে ঘাতক-দালাল, মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী, দুর্নীতিবাজসহ গণশত্রুদের শহীদ মিনারে স্থান হবে না। এদের প্রতিহত করার জন্য শহীদ মিনার থেকেই এই ঘোষণা দেয়া হচ্ছে।

সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের কেন্দ্রীয় সভাপতি মেহেদি হাসান ঘোষণায় বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও দেশদ্রোহী পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনার অপচেষ্টা করায় এই ৯ জনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো। মানে নিজেদের মহাশক্তিধর হিসেবে তুলে ধরলেন এরা।

পিয়াস করিম কী আসলেই যুদ্ধাপরাধী এবং দেশদ্রোহী ছিলেন কি ছিলেন না সেই বিতর্কে আমি যাব না। তার সম্পর্কে আমার তেমন কোনো জ্ঞানও নেই। টকশোতে শুনেছি আর পত্রিকা পড়ে কিছুটা জেনেছি। আরও জেনেছি পিয়াস করিমের মৃত্যুর পর বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রীর বক্তব্য শুনার পর।

এই বিশিষ্টজনদের কেউ এবং পিয়াস করিম কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বা বিচারের বিরোধিতা করেননি। তারা টকশোতে কথা বলে থাকেন বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। বিচার প্রক্রিয়া যেন আরও স্বচ্ছ হয় এবং সঠিক বিচার হয় সেটা নিয়ে। এটা তো আপামর জনসাধারণ সবার চাওয়া। বাংলাদেশে এমন লোক (জামায়াত ছাড়া) খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি সঠিক বিচার চান না। সবাই চায়। আমিও চাই।

এই ৯ জনের মধ্যে গোলাম মোর্তোজা সম্পর্কে কিছুটা হলেও আমার ধারণা আছে অন্তত যুদ্ধাপরাধী নিয়ে। গোলাম মোর্তোজা লেখালেখির সঙ্গে আমার পরিচয় নব্বই দশকের শুরু থেকেই। বিশেষ করে সফল সম্পাদক শ্রদ্ধেয় শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক ২০০০’-এর প্রথম সংখ্যা ১৯৯৮ সালে বাজারে আসার পর থেকে। প্রধান প্রতিবেদক পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার ক্ষুরধার এবং সাহসী লেখা আমাকে আকৃষ্ট করত। যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে তার মতো আর কোনো সাংবাদিক লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।

২০০১-২০০৬ পর্যন্ত চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে অত্যন্ত প্রতাপশালী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে অত্যন্ত সাহসী লেখা গোলাম মোর্তোজা ছাড়া আর কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেই সময়ে।

এরপর জাপান প্রবাসীদের আমন্ত্রণে তিনি চারবার জাপান সফর করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনেক সম্মানের সঙ্গেই তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিছু অনুষ্ঠানে আবার সম্মাননাও দেয়া হয়েছে।

সেই সুবাদে কিছুটা হলেও কাছ থেকে দেখার এবং জানার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে তার মনোভাব সরাসরি জেনেছি তার কাছ থেকে। জাপানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২টি সভা হয়েছে। দুটি সভাই হয়েছে গোলাম মোর্তোজা এবং ড. জাফর ইকবাল স্যারের অনুপ্রেরণায়।

সেই মোর্তোজাকেই যদি যুদ্ধাপরাধী বিচার বানচালকারীদের মধ্যে ফেলা হয় তাহলে আর কি-ই বা বলার থাকে?

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.