অভিমান নিয়ে চলে গেলেন স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন

প্রচার কিংবা খ্যাতির মোহ ছিল না তাঁর। অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল তাঁর নিভৃতবাস। কারো সঙ্গে তেমন একটা কথা বলতেন না, দেখাও করতেন না। কোথাও যেতেন না তেমন। অজানা এক অভিমানে নিজেকে সব কিছু থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন মেধাবী স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন।

ঢাকা থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে সাভারে বাঙালির সাধনা-সংগ্রামের অমর স্মৃতি নিয়ে গর্বভরে দাঁড়িয়ে যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, তা আর কারো নয়, এই স্থপতির মহান কীর্তি। জাতীয় স্মৃতিসৌধ ছাড়াও তাঁর নকশায় দাঁড়িয়ে নানা নান্দনিক স্থাপনা।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অমর নিদর্শন জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন প্রায় নীরবেই চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সোমবার দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি…রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। জীবনের শেষ দিনগুলোতে একেবারেই নিভৃতে একাকী জীবন বেছে নিয়েছিলেন সৈয়দ মাইনুল হোসেন। হাসপাতালের পরিচালক আবদুল্লাহ আল শাফি মজুমদার বলেন, ‘সৈয়দ মাইনুল হোসেন হার্ট অ্যাটাক নিয়ে রবিবারে ভর্তি হয়েছিলেন। উনার রক্তচাপেরও সমস্যা ছিল। আজ (সোমবার) দুপুর আড়াইটায় তাঁর মৃত্যু হয়।’

স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন বলেন, সৈয়দ মাইনুল হোসেনের মরদেহ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে গতকাল সন্ধ্যায় নেওয়া হয় শান্তিনগরে তাঁর বাসায়। রাতে রাখা হয় বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে। তাঁর বন্ধু ও একসময়ের সহপাঠী স্থপতি বদরুল হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, মাইনুল হোসেনের দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তিনি দেশে ফিরলেই দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। স্মৃতিচারণা করে স্থপতি বদরুল হায়দার বলেন, ‘অত্যন্ত প্রখর মেধাবী ছিল মাইনুল। ড্রয়িংয়ে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত।’

সৈয়দ মাইনুল হোসেনের খালাতো ভাই জুলফিকার রহমান বলেন, ‘আমরা ছিলাম সমান বয়সের। ছোটবেলা থেকেই কম কথা বলত, চুপচাপ থাকত। পড়াশোনায় ও ছিল প্রখর মেধাবী।’

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। গণপূর্ত বিভাগ ১৯৭৮ সালে পরিকল্পিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের জন্য নকশা আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সৈয়দ মাইনুল হোসেন তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি। কাজ করছিলেন ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’-এ জুনিয়র স্থপতি হিসেবে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যে নির্মমতা তিনি কল্পনায় অনুভব করেছেন সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি স্মৃতিসৌধের নকশা করে জমা দেন। কিন্তু কোনো নকশাই পছন্দ না হওয়ায় গণপূর্ত বিভাগ দ্বিতীয়বার নকশা আহ্বান করে। দ্বিতীয়বারও নকশা জমা দেন সৈয়দ মাইনুল হোসেন। ১৭-১৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি প্রথম হন। আর তাঁর করা নকশা অনুসারে নির্মিত হয় অমর স্থাপনা জাতীয় স্মৃতিসৌধ। তাঁর নকশা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের বেদিমূল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে সাতটি ত্রিকোণ কলাম, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ১৫০ ফুট উঁচু। এই সাতটি কলামে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায় সূচিত হয়েছে। আকার-আকৃতিতে ভিন্নতা থাকায় একেক দিক থেকে স্মৃতিসৌধকে দেখায় একেক রকম।

১৯৭৬ সাল থেকে ২২ বছরের কর্মজীবনে সৈয়দ মাইনুল হোসেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা করেন। এসবের মধ্যে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্টগ্রাম ইপিজেড কার্যালয় (১৯৮০), জাতীয় জাদুঘর (১৯৮২) ও উত্তরা মডেল টাউনের (১৯৮৫) নকশা উল্লেখ্যযোগ্য।
সৈয়দ মাইনুল হোসেনের দাদা ছিলেন সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলী আর নানা কবি গোলাম মোস্তফা। বাবা সৈয়দ মুজিবুল হক আর মা রাশিদা হকের তিন সন্তানের মধ্যে বড় সৈয়দ মাইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ১৭ মার্চ। জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে। বাবার পেশা ছিল অধ্যাপনা। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস পড়াতেন তিনি। ফরিদপুর মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল মাইনুলের। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন ফরিদপুর জেলা স্কুলে।

তখন থেকেই স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭০ সালে তিনি যখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন তখন তুঙ্গে। স্বাধীন দেশে ১৯৭৬ সালে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি পান মাইনুল হোসেন। ইএএইচ কনসালট্যান্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করলেও কয়েক মাসের মধ্যে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে। এরপর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই স্থপতি। পেশাগত জীবনে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া পান শেলটেক পদক। সৈয়দ মাইনুল হোসেন ১৯৮২ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই মেয়ে সৈয়দা তাহরিমা হোসেন ও সৈয়দা তানজিলা হোসেন।

শোক : স্থপতি মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তাঁর শোকবার্তায় বলেন, স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি যে অবদান রেখেছেন জাতি তা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব ইহসানুল করিম বেইজিং থেকে এ তথ্য জানান বাসসকে। রাষ্ট্রপতি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। আলাদা শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্থপতি মাইনুল হোসেনের অনন্য সাধারণ নকশায় নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলা এবং বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে চিরভাস্বর থাকবে। এ মহান কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ জাতি চিরদিন তাঁর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সৈয়দ মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সংস্কৃতিসচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এক শোকবার্তায় বলেন, ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে আমি গভীর শোকাহত এবং মর্মাহত। তিনি শুধু দেশের বিভিন্ন সুরম্য ইমারত নির্মাণ করেননি, মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মারক জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা নির্মাণ করে ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন।’

এ স্থপতির মৃত্যুতে আরো শোক জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া, জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা আলহাজ খাজা মোস্তফা আমির ফয়সল মুজাদ্দেদি ও মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ।

কালের কন্ঠ