জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন আর নেই

জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন আর নেই। রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সোমবার দুপুর আড়াইটায় তার মৃত্যু হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল শাফি মজুমদার দ্য রিপোর্টকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের মরদেহ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে।

তিনি আরও বলেন, রবিবার সকাল ১১টায় এখানে তাকে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি প্রায় অচেতন অবস্থায় ছিলেন। ভর্তির আধাঘণ্টার মধ্যে বোর্ড গঠন করে তার চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রাথমিকভাবে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ডায়াবেটিক ও বার্ধক্যজনিত কারণে সার্বিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

‘এরপরও আমরা হতাশ হয়নি, আমাদের সমস্ত মেধা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। অবশেষে সোমবার দুপুর আড়াইটায় তিনি মারা যান’ বলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

হাসপাতালে উপস্থিত স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের ফুফাত ভাই নঈম হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, মরদেহ প্রথমে শান্তিনগরের বাসায় নেওয়া হবে। সেখান থেকে তা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে।

তিনি আরও বলেন, সৈয়দ মইনুল হোসেনের বোন আমেরিকায় থাকেন। তিনি দেশে আসলে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

১৯৫২ সালের ৫ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করে মইনুল হোসেন। তার বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেবেলায় মইনুল চেয়েছিলেন প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে। ঢাকা তখন গণঅভ্যুত্থানে উত্তপ্ত। ওই সময় মইনুলকে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। মইনুল মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। খুব কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর ফিরে আসেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে।
১৯৭৬ সালে মইনুল প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক হন। ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে EAH Consultant Ltd-এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগ দেন। কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে ওই বছরের আগস্টে যোগ দেন ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’-এ। তার কর্মজীবন বেশ বৈচিত্র্যময়।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর নকশা আহ্বান করা হয়। তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মইনুল স্মৃতিসৌধের নকশা জমা দেন।

মোট ৫৭ জন প্রতিযোগী স্মৃতিসৌধের ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং তার মধ্যে স্থপতি মইনুল হোসেনের ডিজাইনটি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। নিচের মূল ভিত্তি থেকে ওপরের দিকে উঠে-যাওয়া সাতটি দেয়ালসদৃশ ত্রিকোণ কলাম। কলামগুলো বিভিন্ন উচ্চতার ও আলাদা-আলাদাভাবে পাশাপাশি ওপরের দিকে উঠে গেছে, যার সবচেয়ে উঁচু কলামটি ১৫০ ফুট। বিভিন্ন দিক থেকে এটি ভিন্ন ভিন্ন আকারে দৃশ্যমান হয়। সামনের দিক থেকে দেখলে মনে হবে— যেন একক-শুভ্র এক শৈল্পিক স্থাপনা আকাশ স্পর্শ করার জন্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গর্বিত ভঙ্গিমায়; সামনের লেকের পানিতে তার ছায়া এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে। আবার পাশ থেকে দেখলে মনে হয়, আকাশে ডানা মেলে-দেয়া একঝাঁক শুভ্র-বলাকা যেন! বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিভূ জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৈয়দ মইনুল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেন। এর মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, IRDP ভবন কাওরানবাজার, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বাংলাদেশ চামড়াজাত প্রযুক্তির কর্মশালা ভবন, উত্তরা মডেল টাউন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্য গুদামের নকশা, কফিল উদ্দিন প্লাজা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন তিনি।

এরপর অবসর জীবনে চলে যান তিনি। অনেকটা নিভৃতে জীবনযাপন করছিলেন।

দ্য রিপোর্ট