স্বাধীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর : একাল সেকাল – মুহাম্মদ জমির হোসেন

ঐতিহাসিক জনপদ বিক্রমপুর, স্বাধীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এক সময়ের সেই গৌরবের রাজধানী বিক্রমপুর এখন অতিতের নিরব সাক্ষী মাত্র। নির্জন ভগ্নস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। অস্তিত্বরক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টায় কেবল মৌনমুখের নীরব হাতছানি। রক্ষা করার কেউ নেই। এমনকি ঐতিহ্যিক অবয়বের শেষ চিহ্নটুকু রক্ষা করতে ব্যর্থ। জাতীয়ভাবে প্রতœতত্ত্ব বিভাগেরই তা রক্ষণাবেক্ষণের কথা। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়াস পদক্ষেপ নামসর্বস্ব সীমানায় অবরদ্ধ। অথচ পৃথিবীর সব দেশেই এ ব্যাপারে অন্তরনিষ্ঠ প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়।

কারণ, ঐতিহ্যভ্রষ্ট জাতি অবশ্যই ধ্বংসপ্রবণ জাতি। এদের পতন অনিবার্য। অতীত, ইতিহাস ও ঐতিহ্য – এই তিনের উপর একটা জাতির গতিপথ নির্মীত হয়। রবীন্দ্রনাথ সপ্রসঙ্গ বর্ণনার গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, “হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে কাজ করে যাও গোপনে”। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে ভবিষ্যত কর্মপন্থার রূপরেখা। এ প্রেক্ষিতে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবিলুপ্তি জাতিগত জীবনে একটা অপূরনীয় ক্ষতি। আর বিক্রমপুরবাসীর জন্য তা এক ধরণের অশনি সংকেত। প্রলয়ের শিহরিত সর্বনাশা বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। সারা বাংলায় বিক্রমপুরের নেতৃস্থানীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি আজ স্বপ্নলোকের রোমন্থন ছাড়া কিছু নয়। বর্তমান প্রজন্ম তা কল্পনাই করতে পারছে না। কী তাদের উত্তরাধিকার ? কী তাদের কর্মপথের অন্বিষ্ট অন্বেষা ? ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। এ এলাকার মানুষ এখন স্থূল বৈষয়িক ভাবনার ঠুনকো ঐশ্বর্যের মোহে মগ্ন। মায়া মরীচিকাবেষ্টিত মিথ্যা জৌলুসের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও নন্দনবোধের জগৎ থেকে প্রায় নির্বাসিত।

এ ছাড়া বর্তমানে আরো একটা সমস্যা এর জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা-বিভক্তির সুবাধে বর্তমানে এ অঞ্চলটি ‘মুন্সিগঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায়। ফলে ‘বিক্রমপুর’ নামের বিলুপ্তি বিদায়ের ঘন্টাটি আবার নতুন করে বেজে ওঠে। সম্প্রতি কিছু সংগঠন এ জেলাটি মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর নামে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছে। এ দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, অংশবিশেষ অঞ্চল মুন্সিগঞ্জের নামে নামকরণ হতে বাধা নেই। কিন্তু বিক্রমপুর শব্দটি প্রযুক্ত হলে তা আরও বেশি অর্থগাঢ় ও মর্মগাঢ় ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হতে পারে। এর ফলে নামের মাধ্যমে কিছুটা হলেও বিক্রমপুর জনপদের ঐতিহ্য সুরক্ষিত হতে পারে।.

খ্রিঃ পূঃ তিন হাজার বছর পূর্বের খগে¦দের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ নামে দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক যুগ, মহাকাব্যের যুগ, পৌরণিক যুগ- এই তিন যুগেই বঙ্গ নামের দেশটি বেশ সুপরিচিত। এ ছাড়া মহাকবি ভাঘের কাব্য, অষ্টাধ্যায়ী পাণিনিতে, পাণিনির বৃত্তি, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, বিষ্ণুপুরাণ , মৎস্যপুরাণ, হরিবংশ, ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ নামটি বারবার উল্লিখিত হয়েছে। এই ‘বঙ্গ’ দেশের প্রাচীন সীমানা সম্পর্কে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, “উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয় হইতে নেপাল, সিকিম ও ভোটানরাজ্য; উত্তর-পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ উপত্যকা; উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি; পূর্বদিকে গারো-খাসিয়া-জয়ন্তিয়া-ত্রিপুরা-চক্রগ্রাম শৈলশ্রেনী বাহিয়া দক্ষিন সমুদ্র পর্যন্ত, পশ্চিমে রাজমহল-সাঁওতাল-পরগনা-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূম-কেওঞ্জার-ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই প্রকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখন্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাংলার গৌড়পুন্ড্র-বরেন্দ্রীথ-রাঢ়া-সুহ্ম-তাম্রলিপ্তি-সমতট বঙ্গ-বঙ্গাল-হরিকেশ প্রভিৃতি জনপদ”।

এর মধ্যে ‘সমতট’ জনপদের মধ্যেই বিক্রমপুরের অস্তিত্ব ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক ইউয়ানচায়েঙ্গের ভ্রমন বৃত্তান্তে এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়। সেখানে তিনি বিক্রমপুরকে প্রাচীন সমতটের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেন। বিক্রমপুর ছাড়াও সমতটের অংশ ছিল যশোহুরের কতকাংশ, ফরিদপুর, খুলনা, বাখরগঞ্জ, ঢাকা এবং ত্রিপুরা জেলা। এর মধ্যে বিক্রমপুরের সীমানা নির্ধারণ বেশ দুরূহ ব্যাপার। বিভিন্ন সময়ে এর সীমা পরিসীমা বারবার গতিপথ পরিবর্তন করছে। রাজনৈতিক উত্থান পতনের কারণে এর ভৌগলিক অবস্থানের অদল-বদল ঘটে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমেও বিক্রমপুরের রূপ-রপান্তর অব্যাহত থাকে। বিশেষত হেয়াঁলি পদ্দার ভাঙাগড়ায় এই এলাকা বিভিন্নভাবে ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন করে। প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন, “নদী-প্রবাহের দিন গতি পরিবর্তন হেতু বিক্রমপুরের সীমানাও পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তারপর চন্দ্র বর্ম সেন প্রভৃতি হিন্দু ও বৌদ্ধ নৃগতিগণেল শাষণকালে পাঠান ও মোগল প্রভাবকালে চাঁদরায়, কেদাররায় প্রভৃতি বার ভূইয়ার প্রাধান্য সময়েও বিক্রমপুরের সীমা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হইয়াছে, তারতপর ইংরেজ-রাজত্ব-কালে বিক্রমপুরের সীমা পদ্মা নদীর গতি পরিবর্তনে ও ভীষণ আক্রমনে দিন-দিনই পরিবর্তিত হইতেছে”। এ প্রসঙ্গে তিনি বিক্রমপুরের সীমনা নির্নয় করতে গিয়ে বলেন, “উত্তরে ধলেশ্বরী নদী, পূর্বসীমা মেঘনাদ বা মেঘনা, পশ্চিমসীমা পদ্মা ও চন্দ্রপ্রতাপ কতকটা এবং আরিয়ল বিলের অপর পারের দোহার, গাঞ্জিমপুর(উহা চন্দ্রপ্রতাপ ও বিক্রমপুরের সীমান্ত স্থানে অবস্থিত) প্রভৃতি স্থান; দক্ষিণ সীমা ইদিলপুর”।

‘বিক্রমপুর’ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে নানারকম গল্পকথা প্রচলিত আছে। কেউ কেউ রাজা বিক্রমাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত রাজ্য থেকেই বিক্রমপুরের উদ্ভব বলে মনে করেন। ‘বিপ্রকুলকল্পলতিকা’ গ্রন্থ অনুসারে সেনবংশীয় বংশধর বিক্রমসেনই বিক্রমপুরের স্থপতি বলে অনুমিত হয়। সংস্কৃত বৌদ্ধগ্রন্থ ‘বিক্রমনীপুর’ থেকেও বিক্রমপুর নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। “বিক্রমপুরী-বিহার হইতে বিক্রমপুরের নাম হইয়াছে। তেঙ্গুরের মতে বিক্রমপুরী-বিহার বঙ্গদেশে (মগধের পশ্চিমে) অবস্থিত ছিল। নামের মিল দেখিয়া মনে হয় যে, উহা পূর্ববঙ্গের (ঢাকা বিভাগ) বিক্রমপুর নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। এবং জায়গাটির নাম বিহারটির নাম দুই-ই ধর্মপালের বিক্রমশিলার অপর নাম হইতে হইয়াছিল। এই ধর্মপালই বাংলাদেশের একমাত্র রাজা, যাহার বিক্রমশীলদেব নাম ছিল এবং তিনি যে পূর্ববঙ্গের উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই ( Indian Culture Buddhist Vihars of Bengal-vol 1 No-2 Nalininath Das Gupta, page -230)। এসব মতামতের ভিত্তিতে ‘বিক্রমপুর’ নামের উদ্ভব সম্পর্কে অনেকটাই অবগত হওয়া যায়। তবে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ যোগে-মোটামুটিভাবে নবম শতাব্দী থেকেই শ্রীবিক্রমপুর নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। এরপর থেকেই শ্রীচন্দ্রদেবের তাম্রশাসন, শ্যামলবর্মার তাম্রশাসন, সেনরাজাদের তাম্রশাসন প্রভৃতির মাধ্যমে বিক্রমপুরের অস্তিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হতে থাকে।

প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে বিক্রমপুরের অস্তিত্ব ছিল দীর্ঘদিন। শত-শত বছরের ইতিহাসমৃদ্ধ এই জনপদের কীর্তিগাথার পরিধি ব্যাপক। এসম্পর্কিত আলোচনা গবেষণা সাপেক্ষ ও বেশ আয়াসসাধ্য ব্যাপার। এর জন্য বিস্তৃত পটভূমিই অধিকতর উপযোগী। স্বল্প পরিসরে তা উপস্থাপন করা দুঃসাধ্য। অনেকটা অসম্ভবও বটে। তথাপি অতিশয় সংক্ষিপ্ত ভাবে রাজধানী বিক্রমপুরের কিছু পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

মূলত রামপাল ও তার চারিদিককার বিস্তৃত এলাকা নিয়ে শ্রীবিক্রমপুর-নামক রাজধানী গড়ে ওঠে। কেউ কেউ বলেন, পালবংশীয় রাজা রামপালের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। আবার এ ব্যাপারে ভিন্ন মতালম্বী কথাবার্তাও প্রচলিত রয়েছে। এই রাজধানীরই অংশবিশেষ হচ্ছে- সুবাসপুর (সুখবাসপুর), বজ্রযোগিনী, আটপাড়া, সুয়াপাড়া, নাহাপাড়া, রঘুরামপুর, শঙ্করবান্দ, মীরকাদিম, পানাম, পঞ্চসার, চুড়াইন, কেওয়ার, সিপাহীপাড়া, দেওসার, সোনারং, টঙ্গীবাড়ি প্রভৃতি। এখানে চন্দ্র, বর্ম ও সেন-বংশীয় রাজারা দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছেন। দশম শতক থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চন্দ্রবংশীয় শাসকবর্গ অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে বর্মরাজগণ এখানে বসেই বঙ্গরাজ্যে শাসনদন্ড পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে বিজয়সেনের মাধ্যমে ‘বিক্রমপুর’ সেনরাজাদের হস্তগত হয়। এরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন, বল্লালসেনের পুত্র লক্ষণসেন, লক্ষণসেনের পুত্র বিশ্বরূপসেন, কেশবসেন প্রমুখ নৃপতি অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই এলাকায় এখনও সেই হারিয়ে যাওয়া রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যগোচর হয়।

এখানে রাজা বল্লালসেনের আবাসিক অট্টালিকার অস্বিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বাড়ির চর্তুদিকে পরিবেষ্টিত ২০০ ফিট প্রশস্ত পরিখার অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। লোকজন এখনও এটিকে বল্লালবাড়ি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এই বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি গজারি বৃক্ষ অবস্থিত। লোকে এটিকে বল্লালের হস্তিবন্ধন-স্তম্ভ বলে সম্মান প্রর্দশন করেন। এখনও অনেক পূন্যার্থী সিঁদুর সন্দেশ দিয়ে পূজা নিবেদন করে থাকেন। বল্লালবাড়ির মাঝখানে একটি মিঠাপুকুর রয়েছে। এর পাশেই আছে অগ্নিকুন্ড। কথিত আছে, বল্লালসেন বাবা আদম ফকিরের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। এ সংবাদ পেয়ে তাঁর অন্তপুরবাসীগণ এই অগ্নিকুন্ডেই আত্মবির্সজন দেন। অগ্নিকুন্ডের যাবতীয় চিতাভস্ম মিঠাপুকুরে জলাঞ্জলি দেয়া হতো। বল্লালবাড়ি থেকে প্রায় আধমাইল দূরে বাবা আদম ফকিরের মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের পাশেই রয়েছে তাঁর কবর। মসজিদের প্রস্তরফলকের মাধ্যমে এর নির্মানকাল ১৪৮৩ খ্রিঃ বলে জানা যায়। বাবা আদমের মসজিদ বরাবর দক্ষিণে একটি দীঘি অবস্থিত। এটি কোদালধোয়ার দীঘি হিসেবে খ্যাত। প্রচলিত আছে, বল্লালসেনের দীঘি থননকার্যে নিয়োজিত শ্রমিক প্রতিদিন এখানে কোদাল ধুয়ে নিত! কর্মশেষে প্রতিদিন তারা এখানে এককোদাল মাটি কেটে কোদাল ধুয়ে ফেলত। এক কোদাল করে মাটি কাটার দরুণ ক্রমান্বয়ে একটা বিশাল দীঘির সৃষ্টি হয়। কালক্রমে এটি কোদাল ধোয়ার দীঘি হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

এ ছাড়াও রামপালের দীঘি বা বল্লালসেনের দীঘি ছিল বিক্রমপুরের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। এই দীঘির দৈর্ঘ ২২০০ ফিট ও প্রস্থ ৮৪০ ফিট। এটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে। রাজা বল্লালসেন এই দীঘিটি খনন করিয়েছিলেন। এই দীঘি সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। ১৮৬৭ খিঃ প্রসন্নচন্দ্র গুহ রামপালের বিবরণ প্রসঙ্গে বলেন, “কথিত আছে, মহারাজা বল্লালসেন এরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে, তাঁহার জননী একাদিক্রমে যতদূর পদব্রজে যাইতে পারিবেন রাজা বল্লাল ততদূর দীর্ঘ এক দীঘিকা খনন করাইয়া দিবেন। তদনুসারে তাঁহার মাতা এক দিবস বৈকালে বাহির বাটীর দক্ষিণ হইতে ক্রমাগত দক্ষিণাভিমুখে চলিয়া যাইতে থাকিলেন। তিনি অধিকদূর গমন করিলে পর বল্লালসেনের মনে এই ভাবনা উপস্থিত হইল যে, তাঁহার মাতা অনেক দূর অতিক্রম করিয়াছেন। আরও গমন করিলে তিনি অত বড় দীঘিকা অত্যল্প সময়ের মধ্যে খনন করিতে পারিবেন না। রাজার ইঙ্গিতানুসারে একজন অনুচর তাঁহার জননীর চরণে অলক্ত-চিহ্নিত করিয়া বলিল, ‘ঠাকুরাণি! আপনার চরণে শোণিত চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি, এ শোণিত চিহ্ন কিসের ?

একথা শুনিয়া বল্লালজননী চমকিত ভাবে ফিরিয়া চাওয়া মাত্রই সেই স্থানে এক খোটা গাড়িয়া চিহ্নিত করতঃ দীঘি খনন-কার্য আরম্ভ হইল’। এখানে পাশাপাশি আরও অনেকগুলো দীঘি দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হরিশ্চন্দ্রের দীঘি বলে পরিচিতি লাভ করে। রামপালের দক্ষিণে সুখবাসপুর গ্রামে বহু পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। মনসাবাড়ির দীঘি থেকে এক প্রকান্ত বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। যা আব্দুল্লাপুরে বৈষ্ণবদের আখড়ায় রক্ষিত আছে। এরকম অজ¯্র স্মৃতিস্তম্ভ এখনও রামপালের যত্রতত্র থেকে আবিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দ্রুততার সাথে নিঃশেষিত হচ্ছে। কিন্তু কালের বৈরী বাস্তবতা উপেক্ষা করে এখন কিছু নিদর্শন টিকে আছে। যেমন, কীর্তিনাশা পদ্মা, কালীগঙ্গা নদী, তালতলার প্রসিদ্ধ খাল, মীরকাদিমের খাল, হলদিয়ার খাল, ধলেশ্বরী নদী, আড়িয়ল বিল, কদম বিল, হাসাঁড়ার বিল, ঐতিহ্যবাহী পানের বরোজ প্রভৃতি।

বিক্রমপুরের এই রাজোচিত পরিবেশই কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও শিল্প সাহিত্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সারা বাংলায় এর অপ্রতিহত প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। এমনকি বাংলার বাইরেও এই সাংস্কৃতিক সভ্যতার ধারা বিস্তার লাভ করে। এরই সুযোগ্য উত্তরপুরুষরূপে বহু জ্ঞানী-গুনী, আচার্য-পন্ডিত এখানে আর্বিভূত হন। এদের মধ্যে প্রথমেই বৌদ্ধ পন্ডিত ধর্ম প্রচারক অতীশ দীপঙ্করের নাম স্মরণ করা যায়। তিনি আনুমানিক ৯৮০ খ্রিঃ কিংবা ৯৮২-৮৩ খ্রিঃ বিক্রমপুর বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অতীশ দীপঙ্কর নয়পালদেবের রাজত্বকালে নালন্দা মহাবিহারের সঙ্ঘস্থবির নিযুক্ত হন। এবং তিব্বতরাজ্যের আমন্ত্রণে সেখানে তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়েছেন। অতঃপর রাজার মাধ্যমে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে জাতীয় ধর্মগুরুরূপে বিবেচিত হতে থাকেন। অতীশ দীপঙ্কর প্রচুর গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে – বোধিপথপ্রদীপ, চর্য্যা সংগ্রহপ্রদীপ, মধ্যমোপদেশ, সংগ্রহগর্ভ, মহাযান পথসাধন, বর্ণসংগ্রহ, দশ কুশল কর্মোপদেশ, বর্ণ বিভঙ্গ প্রভৃতি। এ পর্যায়ে পরবর্তীতে আরো অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিপুরুষের আর্বিভাব ঘটে। যাদের বিশ্বপ্রতিম প্রতিভা-প্রতিপত্তি আজ সর্বজনবিদিত। এঁেদর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, সৈয়দ এমদাদ আলী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ব্রজেন দাস, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ।

জগদীশচন্দ্র বসু শ্রীনগর থানার রাঢ়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান। জগদীশচন্দ্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছেন। জগদীশচন্দ্র গাছের মধ্যে জীবনের অস্তিত্বজ্ঞাপক আবিষ্কারের জন্য বিশ্বপরিচিতি লাভ করেন। তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্ত্বের জন্য রবীন্দ্রনাথ রীতিমত বিস্ময়বিষ্ট হন। এবং কবিতার ভাষায় বন্ধু জগদীশজন্দ্রকে উৎসাহ প্রদান করেন। ‘জগদীশচন্দ্র’ শিরোনামযুক্ত কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, “যেদিন ধরনী ছিল ব্যাথাহীন বানীহীন মরু/ প্রাণের আনন্দ নিয়ে, শঙ্কা নিয়ে, দুঃখ নিয়ে তরু/ দেখা দিল দারুণ নির্জনে কত যুগ-যুগান্তরে/ কান পেতে ছিল স্তধ্ব মানুষের পদশব্দ তরে/ নিবিড় গহণতলে … হে তপস্বী, তুমি একমনা/ নিঃশব্দেরে বাক্য দিলে; অরণ্যের অন্তরবেদনা/ শুনেছ একান্তে বসিংমূক জীবনের যে ক্রন্দন/ ধরনীর মাতৃবক্ষে নিরন্তর জাগানো স্পন্দন/ … তাহার রহস্য তব কাছে/ বিচিত্র অক্ষররূপে সহসা প্রকাশে লভিয়াছে”। এ ছাড়া ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিশ্ব বিজ্ঞানসভায় বিজয়মাল্য দিয়ে বরণ করে নেন। তিনি বলেন, “বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে/ দূর সিন্ধুতীরে / হে বন্ধু, গিয়েছ তমি! জয়মাল্য খানি / সেথা হতে আনি / দীনহীনা জননীর লজ্জানত শিরে / পরায়েছ ধীরে”।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথা সাহিত্যে একটি অবিস্মরনীয় নাম। তিনি সিরাজদিখান থানার মালবদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৬টি উপন্যাস ১৭টি গল্পসংকলনে প্রায় ১৭৭টি ছোটগল্প লিখেছেন। এর মধ্যে পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, সহরতলী,অহিংসা, হলুদ নদী সবুজ বন, দিবারাত্রির কাব্য প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটি নোবেলপ্রাপ্তির উপযোগী বলে মনে করা হয়। সমালোচকগণ এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দশটি উপন্যাসের একটি বলে মতামত দিয়েছেন। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে মানিক বিক্রমপুরকে পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানে লৌহজং থানার গাওদিয়া গ্রামের কাহিনী অর্ন্তভুক্ত করা হয়। উপন্যাসটিতে শশী কুসুমের প্রণয়কাহিনী গাওদিয়া গ্রামকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে। তাদের এই ক্লাসিক্যাল মানবসম্পর্ক শিল্পময় মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়। এ সুবাধে বিক্রমপুরের কিছু অংশবিশেষ মানুষের চিরায়ত নন্দনবোধের অংশ হয়ে রইল।

সৈয়দ এমদাদ আলী টঙ্গীবাড়ি থানার ধামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু সাহিত্যিকদের একছত্র দাপটের মুখে এমদাদ আলী কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ঐতিহ্যভ্রষ্ট অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম জাতিকে তিনি আলোকিত পথের সন্ধান দেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে – কাব্য-ডালি, পত্রোপন্যাস-‘হাফেজা’ ও জীবনকাহিনী – ‘রাবেয়া’। এ ছাড়া তিনি ‘নবনূর’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা পকিাশের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের অভিভাবকরূপে আর্বিভূত হন। অনেকে এই পত্রিকাকে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সাথে তুলনা করে থাকেন।

এ পর্যায়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আলোচনাসূত্রে প্রবন্ধটির সমাপ্তি নির্দেশ করতে চাই। কারণ, তাঁর বক্তব্য অভিবাষণগুলো আলোচ্য বিষয়ের সাথে গভীরভাবে সাজুয্যপূর্ণ। প্রবন্ধের উদ্দেশ্য- অন্বেষা ও বিক্রমপুরের স্বরূপ-প্রকৃতি অনেকটাই এসব ভাষণে কথা কয়ে ওঠে। যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অনশ্বর অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর বিক্রমপুরবাসীকে তা রেনেসাঁর আলোয় আলোকিত পথের সন্ধান দিতে সক্ষম। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বিক্রমপুর সম্মিলনীর দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের সভাপতি রূপে ১৩২৩ সালের পৌষ মাসে ডোমসার গ্রামে যে অভিভাষণ পাঠ করেন – তার অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত হলো। তিনি বলেন, “যে দেশেই থাকি না কেন, যত বিদেশই ঘুরিয়া বেড়াই না কেন, যখনি মনে করি আমি বিক্রমপুরবাসী, তখনই প্রাণে প্রাণে একটা গর্ব অনুভব করি। বিক্রমপুর যে আমার শরীরের শিরায় শিরায় আমার অস্থিমজ্জাগত বিক্রমপুরের শত শত কাহিনী যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের মধ্যে জড়াইয়া গিয়াছে। এই যে ভাব, যাহা সকল ভাব, সকল ভাবনা, সকল চিন্তা, সকল সাধনার মধ্যে আপনাকে জানাইয়া দেয়, এই যে স্মৃতি, যাহা ফুলের সঙ্গে জড়ান গন্ধের মক আমাদের জীরনে জড়াইয়া আছে; এই ভাব ও এই স্মৃতি সর্বদা জাগ্রত দেবতার মত আমাদের হৃদয়-মন্দিরে জাগাইয়া রাখিতে হইবে।…………………….

যেমন সমস্ত বাঙালা দেশের একটা চিরন্তন বানী আছে, আমাদের বিক্রমপুরেরও সেইরূপ একটা বিশিষ্ট বানী আছে। আমরা কান পাতিয়া তাহা শুনিতে চাই। সে বানী শুধু আমাদের জন্যে। কর্মক্ষেত্রে সে বানীকে সার্থক করিতে হইলে সে বানী বুঝা চাই – শুনা চাই, তাহাকে প্রাণে প্রাণে উপলধ্বি করা চাই।

মুহাম্মদ জমির হোসেন
প্রভাষকঃ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
উত্তরা, ঢাকা

বিক্রমপুর সাহিত্য পরিষদ