জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন একজন কবি

তপন চক্রবর্তী: বাংলাদেশের বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে জগদীশ চন্দ্রের পৈতৃক নিবাস ছিল। তিনি ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জগদীশ চন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট পিতা ভগবানচন্দ্রের ফরিদপুরে প্রতিষ্ঠিত বাংলা স্কুলে পড়াশোনা করেন প্রথম। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৫ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন এবং বৃত্তি লাভ করেন। এরপর বিজ্ঞান বিষয়ে পড়া শুরু করেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কলেজের শিক্ষক ফাদার লাঁফ-র প্রেরণায় জগদীশ চন্দ্র পদার্থবিদ্যার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। ১৮৭৭ ও ১৮৮০ সালে তিনি যথাক্রমে এফ, এ, ও বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দুই পরীক্ষাতেই তাঁর অন্যতম অধীত বিষয় ছিল ল্যাটিন। ১৮৮০ সালে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নকল্পে বিলাত গমন করেন। বারবার অসুস্থতার কারণে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে ক্যামব্রিজে ভর্তি হন। ১৮৮৪ সালে ট্রাইপস অর্থাৎ এক সঙ্গে তিনটি বিষয়ে অনার্স (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র ও উদ্ভিদবিজ্ঞান) পাস করেন। একই সময়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বি.এসসি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

দেশে ফিরে এসে জগদীশ চন্দ্র বসু সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। এ সময় তাঁর নেশা ছিল ভ্রমণ ও ছবি তোলা। তাঁর ভ্রমণসঙ্গীরা ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভগ্নি নিবেদিতা ও ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার। কেবল শখের জন্য তিনি ছবি তুলতেন না। তিনি তাঁর বাসস্থানের একপাশে চিত্রকর্মশালা নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেখানে এডিসনের ধ্বনিগ্রাহকযন্ত্রের বা ফনোগ্রাফের সাহায্যে কণ্ঠস্বর নিবেদন ও ধ্বনি পুনরুৎপাদনের নানা প্রায়োগিক কৌশল উদ্ভাবনে রত ছিলেন। এই কর্মশালাতেই তিনি হার্টজ-এর অসমাপ্ত তড়িৎ-চৌম্বক তরঙ্গের গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে তাঁর ৩৬তম জন্মদিনে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তাঁর জীবন বিজ্ঞান গবেষণাকর্মে উৎসর্গ করবেন।

অধ্যাপনার সময় তাঁকে অবাঞ্ছিত ও অবমাননাকর পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়। সে সময় কালো চামড়ার ভারতীয় অধ্যাপকদেরকে সাদা চামড়ার ইউরোপীয় অধ্যাপকদের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হতো। জগদীশ চন্দ্র এর তীব্র বিরোধিতা করে বেতন গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তাঁর প্রচণ্ড অর্থকষ্টের সময়েও তিনি মাথা নত করেননি। তিন বছর লড়াইয়ের পর তিনি জয়ী হন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর দাবি পূরণে বাধ্য হন। জগদীশ চন্দ্র গবেষণায় নিমগ্ন হবার পর প্রথম বাধা অনুভব করলেন প্রয়োজনীয় গবেষণা উপকরণের স্বল্পতার। দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি এ সমস্যার সমাধান করলেন। নিজে নকশা করে, দেশীয় কারিগরদের দিয়ে যন্ত্রপাতি বানালেন। ১৮৯৫ সালে তিনি কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে বিদ্যুৎশক্তির দিক পরিবর্তন বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেন। একই সময়ে বিলাতের ‘ইলেকট্রিশিয়ান’ পত্রিকায় তাঁর দু’টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৮৯৫ সালেই রয়্যাল সোসাইটি জগদীশ চন্দ্রের গবেষণা সন্দর্ভ প্রকাশের দায়িত্ব নেয় ও অর্থসাহায্য প্রদান করে। গবেষণার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.এসসি উপাধি প্রদান করে। গবেষণার বিষয় ছিল ‘ডিফ্রাকশন গ্রেটিং দ্বারা তড়িৎ বিকিরণের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য নিরূপণ’। এই গবেষণার সময়ও তাঁকে সপ্তাহে ২৬ ঘণ্টা ক্লাস নিতে বাধ্য করা হয়। শিক্ষা বিভাগের মন্তব্য ছিলো, ‘অধ্যাপকের কাজ অধ্যাপনা, গবেষণা করা নয়।’

জগদীশ চন্দ্রের গবেষণা কাজকে মূলত তিন পর্যায়ে ভাগ করা চলে:
এক. বিদ্যুৎ-তরঙ্গ সম্বন্ধে পদার্থ বিজ্ঞানে তাত্ত্বিক গবেষণা;
দুই. জড় ও জীবের সাড়ার ঐক্য এবং
তিন. উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত-সম্পর্কিত গবেষণায় পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ।

হার্টজ বিদ্যুতের সাহায্যে যে বিদ্যুৎ-চৌম্বক-তরঙ্গ সৃষ্টি করেন তার ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য ৬৬০ মিলিমিটার। কিন্তু এতো দীর্ঘ তরঙ্গকে গবেষণায় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাহলে অদৃশ্য আলোক ধরার কৌশল কী? এ প্রশ্নের জবাব হার্টজ দিয়ে যেতে পারেননি। জগদীশ চন্দ্র তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।

দৃশ্য আলোর ধর্ম হলো তিনটি: এক. এরা সরল গতিতে গমন করে; দুই. এরা বাধা পেলে প্রতিহত হয় এবং তিন. এক মাধ্যম থেকে অপর মাধ্যমে যেতে এর প্রতিসরণ ঘটে। জগদীশ চন্দ্র তাঁর আবি®কৃত উন্নতমানের গ্রাহক যন্ত্রে প্রমাণ করেন যে, দৃশ্য ও অদৃশ্য আলোকের ধর্ম এক ও অভিন্ন।

হার্টজ ও মার্কনির সমসাময়িক জগদীশ চন্দ্র বসুই হলেন বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি ১৮৯৫ সালে সর্বপ্রথম সাফল্যের সঙ্গে মাইক্রোওয়েভ বা ক্ষুদ্র তরঙ্গ উৎপাদন করেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর ধর্মাবলিও নির্ধারণ করেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে রিমোট কন্ট্রোল নামে আমরা যে ধারণার সঙ্গে পরিচিত তার প্রথম উদ্ভাবকও বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ফাদার লাঁফ সহ অন্যান্য মনীষীদের সামনে বিনা তারে বার্তা প্রেরণ-সংক্রান্ত প্রদর্শনীতে তার উদ্ভাবিত মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ একটি ঘর ভেদ করে অন্য ঘরে একটি পিস্তলকে কিভাবে সক্রিয় করে তার মহড়া দিয়েছিলেন। ১৮৯৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের ‘ইলেকটিশিয়ান’ পত্রিকা লিখেছিল, ‘বর্তমান সময়ে বিনা তারে বার্তা প্রেরণ করার যতগুলো যন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছে, জগদীশ চন্দ্র বসু আবি®কৃত যন্ত্র সকলকে হটিয়ে দিলো’। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের ‘ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার’ পত্রিকায়ও বিজ্ঞানীর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। বেতার যন্ত্রের কাজ সম্পন্ন হবার আগেই তাঁকে ‘অদৃশ্য আলোক’ সম্পর্কে বক্তৃতার জন্য লন্ডনে যেতে হয়। তাঁর অদৃশ্য আলোক ‘টেলিগ্রাফি’ বিষয়ক বক্তব্য পাশ্চাত্য জগৎকে বিস্ময়বিমূঢ় করেছিল। এ সংবাদ শুনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিম মন্দিরে
দূর সিন্ধুতীরে
হে বন্ধু গিয়েছো তুমি;
জয়মাল্যখানি
সেথা হতে আনি
দীনহীনা জননীর লজ্জানত শিরে
পরায়েছ ধীরে।

জগদীশ চন্দ্রের আবি®কৃত মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ সে যুগে বৈজ্ঞানিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব না পেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে এর গুরুত্ব বেড়ে যায়। সে সময় রাডার যন্ত্র আবি®কৃত হয়। এই যন্ত্রে ক্ষুদ্র তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যরে বেতার রশ্মির বিভিন্ন প্রয়োগের দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। কাজেই প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তাঁর কাজ নতুন মাত্রা লাভ করে।

অদৃশ্য আলোকের গবেষণার সময় বিজ্ঞানী লক্ষ করেন যে, আলোক অনচ্ছ বাধাকে অতিক্রম করতে পারে বা ভেদ করে যেতে পারে। এই সূত্রকে তিনি বিনা তারে বার্তা প্রেরণের কৌশল আবিষ্কারে ব্যবহার করে সফল হয়েছিলেন। একই গবেষণা সূত্রে তিনি লক্ষ করেন যে, গ্রাহক যন্ত্রের তারটিকে যখন কৃত্রিম চক্ষুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন চক্ষুস্থিত কাঁটাটি নড়ে ওঠে। তিনি এও লক্ষ করেন, কাঁটা কিছুক্ষণ নড়ার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

তাহলে জড় বস্তুতেও ক্লান্তি আসে? এ প্রশ্ন থেকেই তাঁর মধ্যে জীবন ও জড়ের সাড়া বিষয়ে কৌতূহল জন্মায়। চক্ষুস্থিত কাঁটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ দ্বারা উত্তেজিত হবার কারণ চোখের ভেতরের পদার্থের অণুসমূহের অবস্থানের পরিবর্তন। বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যদি অণুর পরিবর্তন ঘটাতে পারে তবে বাইরে অন্য ধরনের উত্তেজনায় জড় পদার্থে সাড়া দেবে না কেন? তিনি জড় পদার্থে মাদকদ্রব্য, ক্লোরোফর্ম প্রভৃতি উত্তেজক পদার্থ প্রয়োগ করে এর প্রতিক্রিয়া লিপিকার যন্ত্রে লিপিবদ্ধ করেন। এই যন্ত্রে তিনি প্রমাণ করলেন একখণ্ড টিন, একটি গাছের ডগা, ব্যাঙের একটি পেশি বাইরের উত্তেজনায় অবিকল একইভাবে সাড়া দেয়। জগদীশচন্দ্রই প্রথম তাঁর গবেষণার নানা পর্যায়ে জড় পদার্থের সাহায্যে জীবনের বিভিন্ন মডেল তৈরি করেন। এ ব্যাপারে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। এই সকল মডেলে জীবনের বহু বৈশিষ্ট্যের মাঝে একটি বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করা হয়েছে। বৈশিষ্ট্য হলো, উত্তেজনার ফলে বৈদ্যুতিক সাড়া দেওয়া। নিঃসন্দেহে এটি জীবের সর্বব্যাপক ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যের সাহায্যে স্থূলভাবে তাৎক্ষণিক জড় ও জীবের পার্থক্য টানা যায়। আজকাল ইলেকট্রনিক্সের সাহায্যে নানান যন্ত্র বা মডেল তৈরি সম্ভব হচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের কাজ অনুকরণ করে।

উদ্ভিদও দুঃখ-বেদনা, সুখ-আনন্দ যে উপলব্ধি করতে পারে, জগদীশ চন্দ্র তা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়ে অপর এক বিস্ময় সৃষ্টি করেন। বিজ্ঞানী উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত সম্বন্ধে গবেষণা করেছেন পদার্থবিদ্যার চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়ে। এক পর্যায়ে তাঁর গবেষণা তাঁকে পৃথিবীর প্রথম বায়োফিজিসিস্ট বা জীবপদার্থবিজ্ঞানীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করে।

জগদীশ চন্দ্র একে একে উদ্ভিদের উপর আলো ও আলোর প্রভাব, উদ্ভিদের অনুভব শক্তি, উদ্ভিদের স্পন্দন ও বৃদ্ধি, উদ্ভিদের উত্তেজনার বেগ ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। উদ্ভিদের বৃদ্ধি মাপার যে যন্ত্রটি তিনি আবিষ্কার করেছিলেন তার নাম ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’। উত্তেজনার বেগ ধরার যন্ত্রের নাম রেখেছিলেন ‘রেজোন্যান্স রেকর্ডার’ বা ‘সমতাল তরুলিপি যন্ত্র’।

উদ্ভিদজগতের রহস্য উদ্ঘাটনকারী জগদীশ চন্দ্র উদ্ভিদ সম্বন্ধে বলেছিলেনÑ ‘এই আমাদের মূক সঙ্গী, আমাদের দ্বারের পার্শ্বে নিঃশব্দে যাহাদের জীবনের লীলা চলিতেছে, তাহাদের গভীর মর্মের কথা তাহারা ভাষাহীন অক্ষরে লিপিবদ্ধ করিয়া দিল এবং তাহাদের জীবনের চাঞ্চল্য ও মরণের আক্ষেপ আজ আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে প্রকাশিত করিল। জীব ও উদ্ভিদের মধ্যে যে কৃত্রিম ব্যবধান রচিত হইয়াছিল তাহা দূরীকৃত হইল। কল্পনারও অতীত অনেকগুলি সংবাদ আজ বিজ্ঞান স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করিয়া বহুত্বের ভিতরে একত্ব প্রমাণ করিয়া দিল’।

বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্রের অনন্য গবেষণাকে ব্রিটিশ সরকার ও দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানী সমাজ সহজে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা প্রবল বাধারও সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য কেউ কেউ বিরুদ্ধাচারণের বিপরীতে অনুকূল পৃষ্ঠপোষকতাও প্রদর্শন করেছিলেন। তবে সর্বাবস্থায় তিনি নিজ সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়, অটল। ব্রিটিশ সরকার তাঁর গবেষণায় বার বার বাধ সাধলেও, ইংরেজ সন্তান লর্ড ব্যাসে, তাঁর বিশ্বস্বীকৃতির ব্যাপারে যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন। ১৮৯৬ সালে জগদীশ চন্দ্র বৈজ্ঞানিক মিশনে বের হয়েছিলেন ইউরোপে। সেখানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মহলে তাঁর বক্তৃতা গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। পরাধীন ভারত সম্বন্ধে একশ্রেণির লোকের উন্নাসিকতা ও অবজ্ঞার মনোভাব যেমন ছিল, আবার একশ্রেণির লোক মানবিক উদারতা প্রদর্শনেও পরাঙমুখ ছিলেন না। ১৮৯৬ সালে ডিসেম্বরে পিয়ার্সনের ম্যাগাজিনে এই ভারতীয় বিজ্ঞানী সম্বন্ধে বলা হয়:

The Nationality of great men- though often the cause of much argument and pen-warfare is in itself a matter of no importance, for in reality, they have neither nationality, individuality, nor age¾ they are citizens of the world.

(মহান মানুষদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে কখনো কখনো বিস্তর তর্ক-বিতর্ক ও কলম-যুদ্ধ হলেও তা মোটেও গুরুত্ববহ নয়। বাস্তবে এঁদের জাতীয়তা, প্রাতিস্বিকতা বা বয়স বিচার করতে নেই, এঁরা বিশ্ব নাগরিক।)

জগদীশ চন্দ্র দ্বিতীয় বৈজ্ঞানিক সফরে ইউরোপে যান ১৯০০ সালে। প্রথম মিশনে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ সম্পর্কিত বক্তব্য দিয়ে অভাবিত সাফল্য অর্জন করেন। এবার তিনি জীব ও জড়ের সাড়া সম্বন্ধে বলার জন্য উদ্গ্রীব। ১৯০০ সালে বিখ্যাত প্যারিস প্রদর্শনী এবং এই উপলক্ষে পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসের আয়োজন। এতে জগদীশ চন্দ্র আমন্ত্রিত। তিনি সম্মতির জন্য সরাসরি লেফটেন্যান্ট গভর্নর উডবার্নের সঙ্গে দেখা করলে তৎকালীন শিক্ষা অধিকর্তা রুষ্ট হন এবং তাঁর বিদেশ যাত্রায় বাধ সাধার চেষ্টা করেন। উডবার্নের আন্তরিক সহযোগিতায় সেবার তাঁর প্যারিস যাওয়া সম্ভব হয়। তিনি কংগ্রেসে জড়ের চেতনা সম্বন্ধে তাঁর বিস্ময়কর উপলব্ধির কথা পরিবেশন করেন।

জগদীশ চন্দ্র তাঁর কর্মজীবনে জড় ও জীবনের সাড়ায় ঐক্য বিষয়ে তাঁর অনুভূতিকে পৃথিবীর বিজ্ঞানী সমাজে তুলে ধরার জন্য কয়েকবার বিদেশ যাত্রা করেছেন কিন্তু বিজয়লক্ষ্মীর বরমাল্য বিনাযুদ্ধে কোথাও জোটেনি। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেনÑ ‘ভারতই আমাদের কর্মভূমি, সহজাবস্থা আমাদের জন্য নহে।’ লন্ডনে শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি ভগ্নী নিবেদিতাকে বলেন ‘সকলেই জানে আমাদের অদ্ভুত কল্পনাশক্তি আছে। কিন্তু আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আমাদের নিখুঁত বিচারের শক্তিও আছে। অধ্যবসায় আছে।’

নানা প্রতিবন্ধকতার ভিতর দিয়ে জগদীশ চন্দ্রের সাফল্য যখন আসতেই থাকে তখন তাঁকে ইংল্যান্ডের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একালে তো বটেই, সেকালে এই আহ্বান ছিলো এক অভাবনীয় সম্মান ও সুযোগ। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ ‘আমার গবেষণা ধারায় যে বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাকে রূপায়িত করার পক্ষে ইংলন্ড প্রবাসই শ্রেয়। কিন্তু প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়’।

তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে এ বিষয়ে এক পত্রে জানান, ‘আমি কি করিব কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। আমার সমস্ত ওহংঢ়রৎধঃরড়হ-এর মূলে আমার স্বদেশীয় লোকের স্নেহ। সেই স্নেহবন্ধন ছিন্ন হইলে আমার আর কি রহিল?’ আরেক পত্রে বলেছেন, ‘আমাদের হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষে, যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি তাহা হইলেই জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যেসব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায়, তাহাও সহ্য করিব।’

এ দেশে বিজ্ঞানচর্চা প্রসারের লক্ষ্যে মহান বিজ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক জগদীশ চন্দ্র বসু জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে তাঁর জন্মদিনে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ১৯১৭ সালে। বন্ধুরাও তাঁকে অর্থসাহায্য করেছিলেন। এই মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে স্বাগত ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘বিজ্ঞান অনুশীলনের দুটি দিক আছে। প্রথমত নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার। ইহাই এই বিজ্ঞান পাঠের মুখ্য উদ্দেশ্য, তাহার পর জগতে সেই নতুন তত্ত্ব প্রচার। …আমার আরো অভিপ্রায় এই যে, এই স্থানের শিক্ষা হইতে বিদেশবাসীও বঞ্চিত হইবে না। বহু শতাব্দী পূর্বে ভারতে জ্ঞান সার্বভৌমিকরূপে প্রচারিত হইয়াছিল। এই দেশে নালন্দা এবং তক্ষশিলায় দেশ দেশান্তর হইতে আগত শিক্ষার্থী সাদরে গৃহীত হইয়াছিল। যখনই আমাদের দিবার শক্তি জন্মিয়াছে, তখনই আমরা মুক্তহস্তে দান করিয়াছি। ক্ষুদ্রে আমাদের তৃপ্তি নাই। সর্বজীবনের স্পর্শে আমাদের জীবন প্রাণময়।’

জগদীশচন্দ্র মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বাংলায় বিজ্ঞান রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর রচনা অব্যক্ত শীর্ষক গ্রন্থে সংকলিত হয়। গ্রন্থটি সকলের সমাদর লাভ করে।

১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর, সকাল ৮টায় মহান বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জীবনদীপ নিভে যায়। মৃত্যুর পর স্যার মাইকেল স্যাডলার শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন এই বলে ‘জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন কবি।’

শ্যামলবাংলা