শাখাওয়াত সরকার : একজন সাদাসিধা ভদ্রলোক

শামীমুল হক: খুবই সহজ সরল, সাদাসিধা এক মানুষ। নিরেট ভদ্রলোক। কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেও ভয় পেতেন। পাছে কোন ভুল হয়ে যায় কিনা? আর ধমক দিলে তা হাসি দিয়ে বরণ করে নিতেন আপন মনে। সেই ১৯৯২ সাল থেকে দেখে আসছি তাকে। দীর্ঘ ২২ বছরে একটুও বদলাননি তিনি। তাকে দেখলেই মজা করে বলতাম, ‘সরকার’ দেশ চলছে কেমন? সহাস্যে বলতেন, ভাই যা বলেন।

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করতেন- ভাই আপনি কেমন আছেন? তিনি আর কেউ নন, আমাদের শাখাওয়াত সরকার। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া প্রতিনিধি। ব্যবসা করতেন। ফার্মেসি ব্যবসা। সৎ জীবনযাপন করতেন। দুই যুগেরও বেশি সময়ের সহকর্মী হিসেবে কোনদিন কোন রিপোর্ট ছাপানোর আবদার করতেন না। রিপোর্ট পাঠিয়ে ফোনও করতেন না। গতকাল সকালে ঘুম ভাঙে কুদ্দুছ ভাইয়ের ফোনে। রিসিভ করতেই দুসংবাদ- শুনেছেন শাখাওয়াত মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কিভাবে? কুদ্দুস ভাই বললেন, পুরো বিষয় জানি না।

তবে সকালে নাকি পা পিছলে পড়ে যান। এরপরই ডাক্তার এসে মৃত ঘোষণা করেন। দেরি না করে এক সময়ের সহকর্মী পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মতিউর রহমান গাজ্জালী ভাইকে ফোন করলাম। ফোন ধরেই তিনি কাঁদছিলেন। বললেন, আমাদের ৭ ভাইয়ের মধ্যে ও সবার ছোট। আর সে-ই সবার আগে চলে গেলো? কি হয়েছিল শাখাওয়াতের? তিন বছর আগে হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর হার্টে রিং পরানো হয়।

গত বছর আবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়। আর গতকাল ভোরে পা পিছলে পড়ে যায়। সম্ভবত আবারও ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর এতেই মারা যায়। তার দুটি সন্তান। একজন এসএসসি ও অপরজন এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। গাজ্জালী ভাই বললেন, ভাই ওর জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন ওকে বেহেশত নসিব করেন। ওর সন্তানরা যেন শোক সইতে পারে। দীর্ঘদিন আমি নিজেও অসুস্থ।

গত মাসে আমার পিতা মারা যান। ওই দিন অনেক সহকর্মী ফোন করেছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন। সহমর্মিতা জানিয়েছেন। এরমধ্যে শাখাওয়াতও একজন। ফোন করে বললেন, শামীম সবাইকেই তো একদিন মরতে হবে। আল্লাহর কাছে খালুর জন্য দোয়া করেন। আমরাও দোয়া করছি। আর আপনি মোটেও চিন্তা করবেন না। ক’দিন আগে মাত্র আপনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। খুব সাবধানে থাকবেন ভাই। আমি শুধু শাখাওয়াতকে বললাম দোয়া করবেন।

শাখাওয়াত অফিসেও আসতেন খুব কম। দীর্ঘ ২২ বছরে তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। বেশ ক’বছর আগে মুন্সীগঞ্জে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যাই। যে অনুষ্ঠানে মানবজমিনের মুন্সীগঞ্জস্থ স্টাফ রিপোর্টার মোজাম্মেল হোসেন সজলকে পুরস্কৃত করা হবে। অনুষ্ঠানে মুন্সীগঞ্জের জ্ঞানী গুণী অনেক লোক উপস্থিত। বক্তৃতা দিতে উঠেছি। একপর্যায়ে দেখি একেবারে পেছনে বসে আছেন শাখাওয়াত। বক্তৃতা শেষে তাকে ইশারায় ডাকলাম। বললাম, গজারিয়া থেকে এতোদূর কেন এলেন। আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, আপনি মুন্সীগঞ্জে আসবেন, আর আমি গজারিয়ায় বসে থাকবো- এটা ভাবলেন কিভাবে?

এক সময় মতিউর রহমান গাজ্জালী সাংবাদিকতা জগতের পরিচিত নাম ছিলেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে শাখাওয়াত তার বড় ভাই হিসেবে কখনও গাজ্জালী ভাইয়ের ভাইয়ের পরিচয় দেননি। অত্যন্ত বিনয়ী শাখাওয়াত নিজে যা করতে পারতেন তা নিয়েই সুখী ছিলেন। মাঝে মাঝে রিপোর্ট পাঠাতে দেরি হলে রাগ করতাম। কিন্তু শাখাওয়াত হাসি দিয়েই তা ভুলিয়ে দিতেন। মানবজমিন ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনও ভাবেননি। তার কথা, মতিউর রহমান চৌধুরী আমাকে সাংবাদিক বানিয়েছেন, তাকে ছেড়ে অন্য কোন পত্রিকায় যাবো না।

কারণ, এমন একজন মহান মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি নিজেকে গর্বিত ভাবি। এ সুযোগ আমি হারাতে চাই না। ভাই আর যা-ই করেন এ সুযোগ থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না। এই তো ক’বছর আগেও ডাকযোগে প্রতিদিন জেলা উপজেলা থেকে রিপোর্ট আসতো। তখন এখনকার মতো ই-মেইল, ইন্টারনেট সুযোগ ছিল না। বাংলারজমিন ডেস্কের সহকর্মীরা প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকতেন খাম খোলা নিয়ে। ভাল রিপোর্ট বেছে তা এডিট কিংবা রি-রাইট করে পাঠিয়ে দিতেন কম্পিউটার রুমে। সপ্তাহে কমপক্ষে দুটি খাম শাখাওয়াতের থাকতোই।

গজারিয়ার সমস্যা, সম্ভাবনা নিয়ে নানা রিপোর্ট পাঠাতেন নিয়মিত। ছাপা হলে খুশি হতেন। কোন রিপোর্ট ছাপা না হলে তার কোন অনুযোগ ছিল না। তখন মাঝে মধ্যে অফিসে এলে তাকে বলতাম- শাখাওয়াত সরকার না হয়ে শাখাওয়াত গজারিয়া নাম হলো না কেন? হা হা করে হেসে উঠতেন শাখাওয়াত। আর বলতেন, ঠিক আছে ভাই, আপনি যেহেতু বলেছেন সেহেতু আজ থেকে আমি শাখাওয়াত গজারিয়া। আজ শাখাওয়াত নেই। রয়ে গেছে তার অনেক স্মৃতি। শাখাওয়াত বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল আমার কাছে স্মৃতি হয়ে।

মানবজমিন

Comments are closed.