সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত জাপান প্রবাসী বাংলাদেশ কমিউনিটি

রাহমান মনি: বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা সম্প্রতি বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছেন, বাংলাদেশে সব ধর্মের পাশাপাশি সহাবস্থানের এমন নজির পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই জন্য ধন্যবাদ ড্যান মজীনাকে। দেরিতে হলেও তিনি বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে চিনতে পেরেছেন তার মেয়াদকালের শেষ প্রান্তে এসে। যদিও আবহমান বাংলার হাজার বছরের সম্প্রীতির এই ঐতিহ্যকে অতি সম্প্রতি সরকারি পর্যায়ে উগ্র মৌলবাদীদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত করানোর একটা জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তার মধ্যেও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ উদারপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সবাই জানে বাংলাদেশিরা ধর্মভীরু হলেও ধর্মান্ধ নয়। বাংলাদেশিরা মনে করে ধর্ম যার যার, দেশটা সবার। সম্মিলিতভাবেই তারা দেশটাকে ভালোবাসে।

বাংলাদেশের এই সম্প্রীতির ধারা প্রবাসেও অব্যাহত রেখে সুনাম কুড়াচ্ছেন বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে জাপানে প্রবাসীদের দ্বারা যে কোনো ধর্মীয় আয়োজনেও প্রতিটি ধর্মের লোকজন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে আয়োজনকে সর্বজনীন করে তোলে। আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে তো সবার সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ বলার অপেক্ষা রাখে না। স্থানীয় জাপানিদের পদচারণে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে প্রায় প্রতিটি আয়োজন।

এই প্রথমবারের মতো জাপানপ্রবাসীরা একই দিনে পালন করল তাদের দুটি বড় এবং অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ৫ অক্টোবর জাপানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল আজহা এবং একই দিনে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা পালন করেছে জাপান প্রবাসীরা। এর আগে ৬ নভেম্বর ২০১১ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা এবং একই দিনে মুসলিমরা পালন করেছিল ঈদ-উল আজহা। একই দিনে স্থানীয় উত্তরণ কালচারাল গ্রুপ পালন করেছিল তাদের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিনটি ছিল জাপানপ্রবাসীদের বিশেষ উপভোগ্য একটি দিন। সকালে ঈদ উৎসব, দুপুরে প্রবারণা পূর্ণিমায় অংশ নিয়ে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে বাড়ি ফিরেছেন। এমন মধুর আনন্দঘন দিন আর কিই-বা হতে পারে?

৫ অক্টোবর দিনটি ছিল রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ঈদ এবং পূজাকে ঘিরে আনন্দ উৎসাহ বিরাজ করছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। হঠাৎ করেই ‘ফ্যানফোন’ নামে ৪ মাত্রার এক সামুদ্রিক ঝড় আঘাত হানে জাপানে। ঝড়ে ১১ জনের প্রাণহানি বা নিখোঁজ হন এবং ঝড়ের প্রভাবে মুষলধারে বৃষ্টি। টাইফুন জাপানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানা শুরু করে এবং ৬ অক্টোবর তা টোকিও অতিক্রম করে। প্রতি দশ বছরে সাধারণত এমন একটি টাইফুন আঘাত হানে জাপানে। ঘণ্টায় ১০০ মি.মি. বৃষ্টিপাতসহ ২৮২ কি.মি. বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করতে পারলেও, ব্যাহত করতে পারেনি প্রবাসীদের মনোবলকে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আবেগ যেমন কাজ করেছে, তেমনি কাজ করেছে সম্প্রীতির ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। তাই তো উভয় ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনে সব ধর্মাবলম্বীর পদচারণে আয়োজনস্থল ছিল লোকে লোকারণ্য।

জাপান চাঁদ দেখা কমিটি ৫ অক্টোবর ঈদ-উল আজহা পালন করাকে ঘোষণা দিলে প্রবাসী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে মসজিদগুলোতে ঈদ নামাজের আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে। অঝোরধারায় বৃষ্টি হওয়ায় উন্মুক্ত স্থানে নামাজের আয়োজন করতে না পারায় একই স্থানে একাধিকবার জামাতের আয়োজন করতে হয়। তবে এবার মসজিদের আয়োজনগুলোতে জাপানি গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের তীক্ষè নজর থাকায় কিছুটা হলেও ভীত থাকতে হয়। এর কারণ ঈদের পূর্বে স্থানীয় একটি মসজিদে এক নাইজেরিয়ান কর্তৃক এক পাকিস্তানি নাগরিককে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত করা। দুর্ঘটনাটি মসজিদের ভিতরে হওয়ায় মুসলিম সমাজে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

ঈদের দিন জাপানের মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটির সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাদল চাকলাদার তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কোরবানির মাংসে এক ঈদ অভ্যর্থনার আয়োজন করলে ধর্ম-বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে পদ্মা ট্রেডিংয়ে উপস্থিত হয়ে বাদল চাকলাদারের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। এটি ছিল একটি বিরল আয়োজন। তাই প্রবাসীরা উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে অংশ নিয়ে থাকে। কারণ, টোকিও এবং আশপাশের জেলাগুলোতে পশু জবেহর উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রবাসীদের কোরবানি দিতে হয় অনেক দূরে। প্রসেসিংয়ের পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাড়পত্র পাওয়া শেষে নিজ গৃহে মাংস পৌঁছতে পৌঁছতে ২-৩ দিন সময় লেগে যায়। কিন্তু এই দিন বিশেষ ব্যবস্থায় দুপুরের মধ্যেই কোরবানির মাংসে আপ্যায়ন করানোর ব্যবস্থা নেন এবং করানও।

জাপান প্রবাসীদের নিয়ে ঈদের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি করে থাকে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান। আগামী ১৯ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান এক ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সাইতামা কেন-এর তাকানো বুনকা সেন্টারে এই দিন বিনোদন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করানো হবে। সোসাইটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিবছর এই আয়োজনটি করে থাকে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে অর্ধসহস্রাধিক প্রবাসীর অংশগ্রহণ ঈদ পুনর্মিলনী আয়োজন শেষ পর্যন্ত মহা মিলনমেলায় পরিণত হয়।

৫ অক্টোবর ছিল জাপানে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। দিবসটি পালন উপলক্ষে টোকিওর কিতা সিটি কিতা আকাবানে কুমিন সেন্টারে দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বাংলাদেশে ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ষষ্ঠীতে বোধনের মাধ্যমে দুর্গোৎসব শুরু হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে ওই দিন বোধনে ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ নিয়ে আনন্দময়ী মা উমাদেবী গজে চড়ে মর্ত্যলোকে আসেন। ১ অক্টোবর বুধবার সব অশুভ শক্তিকে শোধন করে সবকিছু শুদ্ধে পরিণত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহা সপ্তমী। বৃহস্পতিবার মহা অষ্টমীতে দেবীর কল্পারম্ভ ও কুমারী পূজা (বিহিত পূজা) করেন ভক্তরা। তিথি অনুযায়ী শুক্রবার একই দিনে ছিল মহানবমী ও বিজয়া দশমী। দশমী পূজার মাঙ্গলিক সব কাজ হয় ওই দিনই। এই দিন পবিত্র নগরী মক্কাতে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক ইসলাম ধর্মাবলম্বী তাদের চতুর্থ স্তম্ভ পবিত্র হজ পালন করে থাকে। ৪ অক্টোবর বিজয়া শোভাযাত্রা ও বিসর্জনের মাধ্যমে মহাময়ী-মমতাময়ী মা দুর্গা বা দেবী দুর্গতিনাশিনীকে স্বামীগৃহে কৈলাসে ফিরিয়ে দেয়া হয় বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন।

কিন্তু প্রবাসে ৫ দিনব্যাপী এই আনুষ্ঠানিকতা করা সম্ভব না হওয়ায় মাত্র একদিনেই যাবতীয় ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঢাকের বোল, মন্ত্রপাঠ, কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মাধ্যমে দেবী দুর্গার অর্চনা শুরু হয়। এর পর অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ ও ভোগ বিতরণ, পূজাবিষয়ক আলোচনা, শিশুদের অনুষ্ঠান, ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতী এবং সবশেষে মিষ্টি বিতরণ ও দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার কার্যক্রম। জাপানে নদীতে বিসর্জন দেয়ার নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে প্রতীকী বিসর্জন দেয়া হয়।

এবারের পূজায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। প্রবাসীদের পাশাপাশি দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ সস্ত্রীক উপস্থিত থেকে পূজা আনন্দ উপভোগ করেন।
মিজ তনুশ্রী গোলদারের পরিচালনায় পূজাবিষয়ক আলোচনায় বক্তব্য রাখেন সর্বজনীন পূজা কমিটি জাপানের সভাপতি শ্রী সুনীল রায়, সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার বর্মণ, রাষ্ট্রদূতপতœী সোমা জাবিন, উপদেষ্টা সুখেন ব্রহ্ম, উপদেষ্টা ড. কিশোর কান্তি বিশ্বাস প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের কৃষ্টি ও ধর্মীয়, সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আপনারা জানেন আজ জাপানে ঈদ উদযাপন হচ্ছে। দুর্গাপূজা এবং ঈদ উভয়ের শাশ্বত আবেদন হচ্ছে ত্যাগ ও বিসর্জন। উভয় সর্বজনীন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপূজাও একটি সর্বজনীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রবাসেও আপনারা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তাতে আমি গর্বিত। জাপানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে নিঃসন্দেহে।’
স্থানীয় উত্তরণ কালচারাল গ্রুপ ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিচালনা করে। ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটির পরিচালনায় ছিলেন ববিতা পোদ্দার।

বিদায়বেলায় আনন্দ-আমেজের মধ্যেও দেবীর বিদায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভক্তরা। কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে ‘দুর্গা মায় কি জয়, মহামায়া কি জয়’ ধ্বনিতে জগতমাতাকে বিদায় জানান শত শত ভক্ত। তবে তা ছিল প্রতীকী বিসর্জন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.