পদ্মা সেতু নিয়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ

সম্পৃক্ত ৬ হাজার মানুষ
মাওয়ায় পদ্মা সেতু নিয়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্বপ্নের সেতু রূপ পেতে যাচ্ছে বাস্তবে। চীন থেকে পদ্মা সেতুর কাজের মালামাল মাওয়ায় আসার পর কাজে নতুন গতি এসেছে। সেতুর এ্যাপ্রোচ রোড, তীর রক্ষা বাঁধ ও নদী শাসনসহ সব কাজেই নতুন করে উদ্যম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্রুত এগিয়ে চলছে সব কিছুই। সেনাবাহিনীর প্রায় ২ হাজার সদস্য এবং বেসামারিক দেশী-বিদেশী প্রায় ৪ হাজারসহ মোট ৬ হাজারের মতো মানুষ পদ্মা সেতুর এই কর্মযজ্ঞে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে।

মাওয়া ঘাট পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়ায় স্থানান্তরও চলেছে পুরোদ্যোমে। এ ঘাটের কানেকটিং সড়কটি ২৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে। তবে ঘাট তৈরিসহ অন্যান্য কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানা গেছে, ঘাট সরিয়ে নেয়ার উপযোগী করতে আরও ৩ সপ্তাহ সময় লাগবে।

সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রকল্প কাজ। ইতোমধ্যে পুনর্বাসন, কনস্ট্রাকশন ইয়াড, জমি অধিগ্রহণসহ অনেক কাজই সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু বাকি মূল সেতু। এ মূল সেতু তৈরির জন্য পদ্মা তীরে বেশ কিছু স্থাপনা প্রয়োজন হবে। চীনে সেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ৪র্থ শিপমেন্টে এসব মালামাল নিয়ে একটি জাহাজ গত মঙ্গলবার চীনের সাংহাই বন্দর ত্যাগ করেছে। এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ২৫ অক্টোবর পৌঁছার কথা রয়েছে। এসব স্থাপনা এসে পৌঁছলেই পদ্মা তীরে স্থাপন করা হবে।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান আব্দুল কাদের জানান, এসব স্থাপনা এসে পৌঁছলেই আনুষ্ঠানিকভাবে মূল সেতুর কাজ শুরু হবে। শীঘ্রই দেশের মানুষও মূল সেতুর দৃশ্যমান অগ্রগতি নিজ চোখে দেখতে পাবে। স্বপ্নের সেতু বাস্তবরূপ লাভ করছে দেখে পদ্মাপারের লাখো মানুষও খুশি বলে তিনি জানান।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া মোহনার গভীর সুমদ্রে পদ্মা সেতুর তৃতীয় শিপমেন্টের মালামাল খালাস গত বুধবার বিকেল থেকে শুরু হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় কাস্টমসের কার্যক্রম সেখানেই হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহ্ নূর জিলানী (পিএসসি) জানান, পদ্মা সেতু এলাকার মাওয়ায় ব্যাপক ভাঙ্গন ঠেকাতে এবং এ অঞ্চলের বাড়িঘর রক্ষা করে মানুষগুলোকে পদ্মার রাহুগ্রাস থেকে উদ্ধারে জরুরী আপদকালীন প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ গত মে মাসে শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, তীর হতে নদীর দিকে প্রায় ১৩০ মিটার পর্যন্ত স্তরে স্তরে বালুর বস্তা ফেলে নদীর তলদেশ সমান করে ভাঙ্গন রক্ষায় বাঁধ দেয়া হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর নদীর তলদেশে আধুনিক যন্ত্র দিয়ে জরিপ করে দেখা গেছে, গেল বর্ষায় এ কাজের কোন ক্ষতিই হয়নি। ফলে আপদকালীন বাঁধটি এ অঞ্চলের জন্য আপাতত নিরাপদই বলা যায়। প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নক্সা অনুযায়ী ১৩শ’ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনী বালুর মান পরীক্ষার জন্যও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, কাজের মান বজায় রাখা ও মনিটরিং করতে সেনাবাহিনী এখানে বালুর মান নির্ণয়নের জন্য বিশেষ যন্ত্র বসিয়েছে। এ যন্ত্রের মাধ্যমে বালুর মান পরীক্ষা করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলা হয়। তাছাড়া ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে কাজের মনিটরিং করা হয়।

জেনারেল নূর বলেন, ১৪ লাখ জিও ব্যাগ ভর্তি বালু নদীতে ফেলা হয়েছে। প্রাথমিক ও জরুরী ভিত্তিতে এ তীর রক্ষা বাঁধ দিয়ে পদ্মা সেতুর এ এলাকাকে নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। তাছাড়া মাওয়া ঘাটকে শিমুলিয়ায় স্থানাস্তরের রাস্তা নির্মাণের কাজও সেনাবাহিনী শুরু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনী প্রায় ২ কি.মি. রাস্তা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী দোগাছি সার্ভিস এড়িয়া-১ তেও সেনাবাহিনী সিমেন্ট, বালু, রড, ইট, পাথরের মান নির্ণয়নের জন্য একটি আধুনিক পরীক্ষাগারও স্থাপন করেছে। মূলত সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ২০ বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ন পদ্মা সেতুর সকল ধরনের নিরাপত্তার কাজ করছে। আর ২০ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটেলিয়নের কর্নেল সারোয়ারের নেতৃৃত্বে পদ্মা সেতুর এ প্রান্তে প্রায় ২ কি.মি. এপ্রোচ সড়কের কাজ গত বছর শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি এসব কাজ সেতু কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (নদী শাসন) শারফুল ইসলাম জনান, সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন লিমিটেন নামে চায়নার একটি কোম্পানি নদী শাসনের কাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। এখন শুধু চুক্তি বাকি। চুক্তি হলেই তাদের কার্যাদেশ দেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রায় ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যায়ের নদী শাসনের এ প্রকল্পে মাওয়া প্রান্তে প্রায় ২ কি.মি. ও জাজিরা প্রান্তে প্রায় ১২ কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ হবে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাওয়া প্রান্তে আরও ৪ থেকে ৬ কি.মি. নদী শাসনের কাজ করবে বলে জানা গেছে।

বিশাল এ সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুনর্বাসন প্রকল্প) তোফাজ্জেল হোসেন জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য সর্বমোট ১১শ’ হেক্টরেরও অধিক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তার মধ্যে মাওয়া প্রান্তের জশলদিয়া ও কুমারভোগ পুনর্বাসন প্রকল্পসহ দুটি অতিরিক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের জন্য ৩০ দশমিক ৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রে মোট ৯৯৮টি প্লট তৈরি কার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০টি প্লট ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের মধ্যে বিলি করা হয়েছে। বাকিগুলোও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এদিকে লৌহজং উপজেলার পশ্চিম কুমারভোগের জয়নাল বয়াতির ২০ শতাংশের বাড়ি পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণের যাবতীয় ক্ষতিপূরণ এবং এনজিও’র মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পরও বয়াতি ৫ শতকের পরিকল্পিত প্লট পাচ্ছেন। তাই এই বৃদ্ধ বেজায় খুশি। বয়াতির স্ত্রী সূর্যবানু পুরনো বাড়ি হারানোয় মনকষ্ট থাকলেও আবার সেতু নির্মাণের কর্মযজ্ঞতায় তিনি বেজায় খুশি। তিনি বলেন, বিশাল এই সেতুর সঙ্গেই মিশে থাকবে তার পুরনো বাড়ির স্মৃতি।

স্থানীয় সাংসদ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চল ও মুন্সীগঞ্জ শুধু নয়, গোটা দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেতুটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুন্সীগঞ্জে তার নির্বাচনী এলাকার হওয়ায় তিনি সৌভাগ্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সঠিকভাবে বোঝানো গেছে বলেই মানুষ জমি দেয়াসহ সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করছে। সেতুটি সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সঠিক নেতৃত্বের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। পদ্মা সেতুকে ঘিরে মাওয়া-জাজিরা সেনানিবাস হচ্ছে। এখানে কর্মরত সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। এই ব্রিগেডের আওতায় দুই হাজার সেনা সদস্য কাজ করছে। এই সেনা সদস্যরা আপাতত পুনর্বাসন কেন্দ্রে উঠেছে। এই ব্রিগেডের কমযজ্ঞে এখানে বিশেষ মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
পদ্মা পারের ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্বপ্নে দেখতাম এই সেতু। অহন দেখতাছি আসলেই বাস্তবে সেতু হইতাছে। তাই আনন্দ লাগতাছে। আর পদ্মা সেতুকে ঘিরা সেনানিবাস, রেলস্টেশনসহ নানা কিছু হইতাছে, জমির দামও বাইড়া গেছে। এটা আমাগো এলাকার একটা গর্ব।’

জনকন্ঠ

Comments are closed.