১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালটি নিজেই রোগী!

শেখ মো. রতন: নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও রোগী দুর্ভোগের কারণে মুন্সীগঞ্জের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালটির এখন নাজুক অবস্থা। হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগ দীর্ঘদিন ডাক্তারশূন্য রয়েছে। এ কারণে রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে প্রায় এক বছর ধরে ডাক্তার নেই। চক্ষু বিভাগে ডাক্তার নেই ১৪ মাস যাবৎ। মেডিসিন বিভাগ ডাক্তারশূন্য প্রায় দেড় বছর ধরে। আলট্রাসনোগ্রাফির ডাক্তার নেই পাঁচ মাস যাবৎ। এ ছাড়া বহির্বিভাগে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই বলে রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এদিকে, হাসপাতালের কেবিনসহ জেনারেল বেডের সব কটি বাথরুম নোংরা। জনবলের অভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও সঠিকভাবে হয় না। টয়লেট ও পানির ট্যাপ নষ্ট থাকায় রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া হাসপাতালের চাপকল দুটি বিকল থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের খাবার পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

হাসপাতালের বেডগুলোর অধিকাংশই ভাঙা। যে বেডগুলো কোনো রকম ঠিক আছে, তার আবার বিছানা নেই। তাই বেড পেলেও রোগীদের তাতে থাকা দুষ্কর। যে রোগীরা বেড পান না, তাদের ফ্লোরেই থাকতে হয়। নিজস্ব বিছানা পেতেই থাকেন তারা।

ওয়ার্ডগুলোর বেশির ভাগ লাইট ও ফ্যান নষ্ট। এতে হাসপাতালের ভেতরের অধিকাংশ জায়গাই অন্ধকারে থাকে। কোনো দারোয়ান বা পাহারাদারও নেই। উন্নতি হয়নি আউটডোর-ইনডোর কোনোখানে। হাসপাতালটার দিকে তাকালে মনে হয় সে নিজেই রোগী। এভাবেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করছিলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর স্বজনরা।

এ ছাড়া হাসপাতালের ডেলিভারি বিভাগের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র নার্স (ইনচার্জ) শাহানাজ বেগমের নামে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। প্রসূতি রোগীদের কাছ থেকে তিনি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে শহরের দক্ষিণ ইসলামপুরের মেয়ে বলে তাকে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। লোকাল প্রভাব খাটিয়ে এবং সিভিল সার্জনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘ সময় এ হাসপাতালেই চাকরি করে যাচ্ছেন তিনি। সিভিল সার্জনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকায় তার কোথাও বদলিও হয় না। ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদও করে না।

সদর উপজেলার হাতিমাড়া থেকে মো. আশরাফের স্ত্রী তানিয়া আক্তার (২০) প্রসব ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, ভর্তি হওয়ার পর তাকে লেভার রুমে নেওয়া হয়। সেখানে তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন নার্স শাহানাজ বেগম। সরকারি ওষুধ থাকা সত্ত্বেও তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন আরো ৩ হাজার টাকার ওষুধের ফর্দ।

দরিদ্র পরিবারের কাছে ৩ হাজার টাকা অনেক বেশি। নিরুপায় হয়েই তাকে ওই টাকা দিতে হয়েছে এবং বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়েছে। ডেলিভারি শেষে তাকে মহিলা ওয়ার্ডের ৭ নম্বর বেডে রাখা হয়।

তবে এ ঘটনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন শাহানাজ বেগম। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে এ বিভাগে কোনো কাজ করা হয় না। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।’ ডেলিভারি বিভাগে অনিয়ম হচ্ছে জেনে সব সময় সিভিল সার্জন তার ব্যক্তিগত লোকের দ্বারা এ বিভাগকে নজরদারিতে রেখেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিভিল সার্জন ডা. কাজী শরিফুল আলম নার্স শাহানাজ বেগমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সতত্যা স্বীকার করে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালে এখন অনেক অনিয়ম চলছে। শাহানাজের বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ শুনেছি। তাকে ওই বিভাগের দায়িত্ব থেকে আজই সরিয়ে দেওয়া হবে। কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।’

এদিকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সঙ্গে নার্স ও আয়াদের দুর্ব্যবহারে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন রোগীরা। ওষুধপথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করছেন তারা। ডিউটি ডাক্তারদের নামে অভিযোগ রয়েছে, তারা রোগী না দেখে ওষুধ কোম্পানি ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের সঙ্গে খোশগল্প ও উপঢৌকন নেওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

জরুরি বিভাগের ডিউটি ডাক্তার মোস্তাফিজুর রহমানকে দেখা গেল রোগী না দেখে ওষুধ কোম্পানির লোকদের সঙ্গে গল্প করতে। রোগী ফেলে গল্প করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার প্রয়োজন ও সময় মতো আমি রোগী দেখব।’

ওষুধ কোম্পানি ও ক্লিনিক দালালদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালে রোগী টানাহেঁচড়া করতে দেখা যায়। অনেক নামহীন ওষুধ কোম্পানির দালাল এখানে সারা দিন পড়ে থাকেন। তাদের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখানোর জন্য ডাক্তারদের নানান উপঢৌকন দিয়ে খুশি রাখছেন। কেউ কিছুই বলছেন না তাদের। ডাক্তার এবং নার্সদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তারা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করেন অনেকে।

এসব অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকেই তাদের রোগীকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাচ্ছেন আশপাশের ক্লিনিকে।

এদিকে হাসপাতালের মধ্যে প্রতিটি ডাক্তারের রুমে নানা রঙের বোরকা পরা নারী দালালদের ভিড় দেখা যায়। আর খোদ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা এখানে পুরুষ দালালদের ভূমিকা রাখছেন। হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ইনডোর ও আউটডোরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দালালদের আধিপত্য চলে। এদের জন্য হাসপাতালে রোগী ভর্তি করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

দালাল ঠেকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওপর। এ কাজে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. কাজী শরিফুল আলম জানান, হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ক্লিনিকের দালালদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ আছে- ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজন্টেটিভদের দেওয়া মোটা মাসোহারায় পকেট ভারী করে তিনি নিজেই কিছু বলেন না।

এদিকে, হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার-(আরএমও) মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘৫০ শয্যার জনবল দিয়ে ১০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। তাই কাজের স্বার্থে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও ওষুধ কোম্পানির লোকদের দিয়ে খাবার পানি সরবরাহসহ ছোটখাটো কাজ করানো হয়। এতে দোষের কিছুই নাই।’

রাইজিংবিডি

Comments are closed.