সময়ই বলে দেবে আমার চেষ্টা কতটুকু কাজে এসেছে: তাহসান

নিজেকেই ভাঙছেন অার গড়ছেন তাহসান। তিনি সংগীতের বাইরেও গায়ে জড়িয়েছেন অভিনেতা, মডেল এবং উপস্থাপকের তকমা। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে বিচারক লেবাসটাও। ‘মরীচিকা’ ছবির নায়ক তিনিই। কথা হলো তার সব্যসাচী পরিসর নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন- ওয়ালিউল মুক্তা

বাংলা ট্রিবিউন: নায়ক জীবন কেমন লাগছে?
তাহসান: এটা আলাদা কোনও বিষয় নয়। অভিনয়টা আমি কাজ হিসেবে নিয়েছি। সত্যি বলতে, আমি কিন্তু নায়ক বা অভিনেতা হতে চাইনি। ২০০৪ সালে আমার অভিনীত প্রথম নাটক ‘অফবিট’ প্রচার হওয়ার পর প্রায় আট বছর টিভি পর্দার জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইনি। অনেক নির্মাতা কাজের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন কিন্তু আমি পাশ কাটিয়ে গেছি। একটা সময় পর মনে হয়েছে অভিনয় করা যেতেই পারে।

বাংলা ট্রিবিউন: এমনটা মনে হওয়ার কারণ কী?
তাহসান: আমাদের দেশে মেয়েদের নিয়ে বেশ কয়েকবার সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়েছে। এছাড়া এখন মেয়েদের চুল, লাবণ্য নিয়েও প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সেখান থেকে অনেকেই মডেলিং ও অভিনয়ের জগতে নিয়মিত হয়েছেন। এটা আমাদের অভিনয়শিল্পর জন্য ইতিবাচক। অথচ ছেলেদের নিয়ে প্রতিযোগিতা তেমন একটা নেই। ‘সুপার হিরো, সুপার হিরোইন’ এবং ‘ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম চ্যানেল আই হ্যান্ডসাম দ্য আলটিমেট ম্যান’ নামের পুরষদের নিয়ে প্রতিযোগিতা কিছুদিন হলো শুরু হয়েছে। তাই অভি‌‌নেতা সংকট তো থাকছেই। আর আমার মনে হয়, প্রথম নাটক প্রচার হওয়ার পর দর্শকরা আমাকে কিছুটা হলেও পছন্দ করেছিল। তাই নির্মাতারাও আমাকে নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমি অনেক ভেবেই অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিই।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রথম নাটকের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?
তাহসান: আফসানা মিমি একটি নাটক বানাবেন। নাটকের প্রয়োজনে একটি ব্যান্ডের প্রয়োজন পড়ে। তখন তিনি ব্ল্যাক ব্যান্ডের কথা ভেবেছিলেন। নির্মাণ করলেন ‘অফবিট’। অসাধারণ গল্প, অার নির্মাণ ক্যারিশমায় নাটকটি তরুণদের মাঝে বেশ প্রভাব ফেলে। নাটকটির আরও একটি মাইলফলক আছে, তখন সিডি আকারে প্রকাশ হয়েছিল এটি। যার ফলে অনেকেই বাসায় বসে সুবিধামতো সময়ে এটি দেখতে পেয়েছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: এ পর্যন্ত কতগুলো নাটকে অভিনয় করেছেন?
তাহসান: এভাবে কখনও গুনে দেখা হয়নি। বাংলা উইকিপিডিয়ায় আমার একটা প্রফাইল আছে। একজনের কাছে শুনলাম, সেখানে তারা ২৮টি নাটকের নাম উল্লেখ করেছেন। ইউকিপিডিয়ার এ দলের ধন্যবাদ প্রাপ্য। তারা বেশ যত্ন নিয়ে প্রোফাইটি গুছি‌য়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি ও তিশা একসঙ্গে অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। তিশার সঙ্গে আপনাকে বেশি দেখতে পাওয়ার কারণ কী?
তাহসান: এখানে আমার কোনও ভূমিকা নেই। তিশা খুব ভালো একজন অভিনেত্রী। আর তার সঙ্গে আমার কয়েকটি নাটক বেশ আলোচিত হয়েছিল। তাই হয়তো বিজ্ঞাপনসহ আর কয়েকটি নাটকে আমাকে তার সঙ্গে দেখা গেছে। কোরবানি ঈদেও তার সঙ্গে ছিল আমার একটি নাটক।

বাংলা ট্রিবিউন: যে কোনও কাজ করতেই তো প্রস্তুতি লাগে। আপনি কী মনে করেন, নায়ক হতে কী কী প্রয়োজন?

তাহসান: নায়ক নয়, আমি অভিনেতার কথা বলতে পারি। অভিনেতার জন্য সাবলীল থাকাটা জরুরি। আমি কিছু পরিচালকের মুখে শুনেছি, তারা শিল্পীদের অতি অভিনয়ে বিরক্ত। মঞ্চনাটক হয় তো শিল্পীদের জন্য পাঠস্থান। কিন্তু অনেক অভিনেতায় মঞ্চ ও পর্দাকে মিশিয়ে ফেলেন। চেষ্টা করি, ব্যক্তিজীবনে আমি যেমন থাকি, তেমনভাবে ক্যামেরায় থাকতে। এটাই হয়তো আমার অভিনয়ের মূলমন্ত্র।

বাংলা ট্রিবিউন: নিজে দুটি ছবিতে অভিনয় করছেন। নায়ক জীবনে কঠিন কোনও খলনায়কের মুখোমুখি হয়েছেন?
তাহসান: ‘টু বি কন্টিনিউ’ ছবির দৃশ্যধারণ কিছুটা হয়েছে। পরিচালক পরে এর পাণ্ডুলিপিতে বেশ পরিবর্তন এনেছেন। যা আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। আর ‘মরীচিকা’র কাজ এখনও শুরু হয়নি। আর এগুলো ভিলেনের সামনে আমাকে পড়তে হয়নি। তবে ‘এলিয়েন ও রুম্পার গল্প’ নামের একটি নাটকে আমাকে খলনায়কের সামনে পড়তে হয়েছে। সেটাতে এ চরিত্রটি করেছিলেন ইরেশ যাকের। তার সঙ্গে আমার মারামারিও করতে হয়েছিল। একটু আঘাতও পেয়েছিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: গায়ক, গীতিকার, সুরকার, বাদক, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা, মডেল এবং উপস্থাপক এতগুলো কাজ সমন্বয় করেন কীভাবে?
তাহসান: ইংরেজিতে ‘পলিম্যাথ’ নামে একটি শব্দ আছে। বাংলায় এটিকে সব্যসাচী বলা যেতে পারে। তবে পুরো অর্থ ঠিক দাঁড়াবে না। পৃথিবীতে অনেক লিজেন্ডরা ছিলেন, যারা এ ধরনের। একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারতেন। লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চি, এরিস্টটল বা জেমস লাইটহিল-এরা হচ্ছেন সে মাপের মানুষ। আমি নিজেকে সেই কাতারে দাঁড় করাতে চাচ্ছি না। তবে ‘পলিম্যাথ’ শব্দকে খুব পছন্দ করি। এটাকে মেনে চলার চেষ্টা করি। আর সময়ই বলে দেবে আমার চেষ্টা কতটুকু কাজে এসেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু কাজগুলো করা বা নিজেকে শাণিত করার সময় পান?
তাহসান: আর একটি বিষয় বলা যায়, অনেক আগে ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েলের লেখা ‘আউটলিয়ার-এ স্টোরি অব সাকসেস’ নামের একটি বই পড়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল- কোনও মানুষ কোনও কাজের পেছনে যদি ১০ হাজার ঘণ্টা ব্যয় করে, তাহলে সে এতে একজন বিশেষজ্ঞ পরিণত হয়। একসময় আমি নিয়মিত পিয়ানো বাজাতাম। এটা আমার ভালোলাগার কাজ তাই হয়তো এ বাদ্যযন্ত্রে কিছুটা আয়ত্তে এসেছে। অন্য কাজগুলোর জন্যও আমি পরিশ্রম করি, যতক্ষণ না এটা আমার আয়ত্তে আসে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে তো বাণিজ্যিক ছবির নায়ক বলতে যা বুঝায়, সেভাবেও আপনাকে দেখা যেতে পারে?
তাহসান: না, না। তা নয়। নাচ বা মারপিট করার জন্য অামার ইচ্ছে নেই। এগুলো নিয়ে ভাবছিও না। বেশিরভাগ সময়ই আমি অভিনয় করি ভালো কিছু কাজের অনুরোধে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিনোদন অঙ্গনে আপনি অনেক ব্যস্ত। তার পরও শিক্ষকতাও করছেন। এর কারণ কী?
তাহসান: শিক্ষকতা পেশা আমার জন্য স্বস্তির জায়গা। আমার মা-সহ অনেকেই এই পেশায় যুক্ত। তাই এ পেশার প্রতি ভালোলাগা তো ছিলই। নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও এখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেইনি। আমি এখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত আছি।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.