জাপানে স্বরলিপির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

রাহমান মনি: জাপানে প্রবাসীদের দ্বারা পরিচালিত দুইটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে। তার একটি হচ্ছে ‘উত্তরণ বাংলাদেশি কালচারাল গ্রুপ’ এবং অপরটি ‘স্বরলিপি কালচারাল একাডেমী’। উত্তরণ হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক দল, যেখানে তৈরি শিল্পীদের সমন্বয়ে বাংলা সংস্কৃতি চর্চা করা হয়। আর স্বরলিপি হচ্ছে একাডেমি যেখানে বাংলা সংস্কৃতি শেখানো হয়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর এবং বাংলা সংস্কৃতি শিখতে আগ্রহী জাপানিদের বাংলা ভাষা, নাচ, গান শেখানো হয়। আগামী ডিসেম্বরে উত্তরণ পালন করতে যাচ্ছে তাদের ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর গত ১২ অক্টোবর ২০১৪ স্বরলিপি পালন করেছে তাদের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর স্বরলিপি তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করল। ২০০৯ সালে তারা সর্বশেষ ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছিল। যদিও উত্তরণ প্রতি বছরই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে থাকে।

২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্বরলিপি এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে। ১২ অক্টোবর ২০১৪ টোকিওর কিতা সিটি, তাকিনোগাওয়া কাইকান-এ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, সর্বস্তরের প্রবাসী এবং বিপুলসংখ্যক জাপানি দর্শকশ্রোতা উপস্থিত থেকে স্বরলিপির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপভোগ করেন।

তনুশ্রী বিশ্বাস এবং মিজানুর রহমান শাহীনের উপস্থাপনায় শুরুতেই স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন একাডেমির অধ্যক্ষ নাসিরুল হাকিম। একাডেমি পরিচালনা, আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টা মুনশী খ. আজাদ, প্রধান অতিথির শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, শত ব্যস্ততার মাঝেও স্বরলিপি এবং উত্তরণ জাপানে যেভাবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চা ও বিকশিত করার জন্য যে ভূমিকা রাখছে তাতে আমি গর্বিত এবং সাধুবাদ জানাই। প্রবাসে একটি সংগঠনের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা মোটেও সহজ নয়। কিন্তু শুধু দেশের প্রতি, মাতৃভাষার প্রতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর প্রেম এবং দায়বদ্ধতা থেকে আপনারা তা করতে পারছেন। আমি বিশ্বাস করি জাপানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আপনারা আরও জোরালো ভূমিকা রাখবেন। আজকের এই আয়োজনে যারা ভূমিকা রেখেছেন, স্পনসর দিয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং সর্বোপরি অগণিত দর্শকশ্রোতাকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ মূল পর্ব বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঢেলে সাজানো হয়। কোরাস, আবৃত্তি, নাচ, কৌতুক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক গান, দ্বৈত গান, ব্যান্ডের গান, মায়ের গান, দেশাত্মবোধক গান এবং সবশেষে নাটক দিয়ে সাজানো হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি। দেশাত্মবোধক গান জাপানি তরুণী (বাংলার বধূ) তোমোকো খন্দকারের কণ্ঠে ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’ এবং বাদলের কণ্ঠে মায়ের গান ‘মা তুমি আমার আগে যেও নাকো মরে’ দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে। অনেক দর্শকশ্রোতাই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। মিষ্টি মেয়ে নওরিন হাকিম (অদিতি), শাম্মী আকতার, সোমা রহমান এবং মুহিতের গান দর্শক উপভোগ করেছে।

স্বরলিপির শিক্ষার্থীবৃন্দের দ্বারা ‘নবান্ন’ (জাপানি গিন্নিরা, সব শিশু এবং অন্যান্য) পর্বটিতে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, খাদ্য সংস্কৃতি এবং উৎসবকে ফুটিয়ে তোলা হয় যা জাপানি দর্শকেরও মন কেড়ে নিয়েছে।

সব শেষে পর্বে ছিল খণ্ড নাটক। জাকিউল আলম রওনকের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ‘নির্বাচন জয়ের আজব ফর্মুলা’ নাটকটি দর্শক উপভোগ করেছে।
নাট্যকার ও নির্দেশক জাকিউল আলম রওনক জানান, একটি উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষিত এবং সমাজসেবী যোগ্য নেতাকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া খুবই জরুরি বিষয়।

নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ময়নার নামভূমিকায় অভিনয় করে সোমা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ান। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে রুমেল, হীরা, বাদল, রতন, দেলোয়ার, রানা, জুয়েল এবং তানভীর অনবদ্য অভিনয় করেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তনুশ্রী বিশ্বাসের সম্পাদনায় ‘স্মরণিকা’ নামে একটি সুভ্যনিয়র বের করে স্বরলিপি। স্মরণিকাতে ‘আরও যারা ছিলেন স্বরলিপিতে এখন বাংলাদেশে কিংবা অন্য কোনো দেশে’ নামে নয়জন প্রাক্তন সদস্যদের ছবি ছাপানো হয়।

কিন্তু স্বরলিপির আজকের এই ২২ বছর পূর্তি পালন করতে আসতে পারার পিছনে এমন কিছু লোকের ঘামঝরা অবদান আছে যাদের ছবি থাকলে স্মরণিকাটি আরও মর্যাদাবান হতো। এদের মধ্যে শিউলী, নাকাগাওয়া, জুয়েল আহসান কামরুল, রুবেল এইচ কামরুল, নেসারুল ইসলাম ব্রিটেন, হোসাইন মুনীরদের কথা না বললেই নয়।
স্বরলিপি হয়ত বলবে এদের অনেকেই এখনও জাপানে রয়েছেন। কিন্তু ব্রিটেন এবং রুবেল তো জাপানের বাইরে। ব্রিটেন থাকেন বাংলাদেশে এবং রুবেল থাকেন ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে।

আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে যে যুক্তি (ছবি যোগাড় করা সম্ভব হয়নি) দেখানো হয়েছে তা বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে বড়ই বেমানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টুইটার কিংবা ফেসবুকে রয়েছে তাদের সরব উপস্থিতি এবং বর্তমানের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই রয়েছে তাদের যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব। সম্পাদকীয়তে কিংবা অনুষ্ঠানে এ ভুল স্বীকার করে ঘোষণা আসলে ভালো হতো। কিন্তু তা আসেনি। যদিও সম্পাদকীয়তে নাম উল্লেখ করে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে কোনো কোনো সদস্যের প্রতি।

স্মরণিকাটিতে ‘স্বরলিপি ক্লাসের কিছু কথা’ নামে সুন্দর একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। লেখাটিতে অনেক অভিভাবককেই উৎসাহ জোগাবে তাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখানোর প্রতি। অথচ লেখক কিংবা লেখিকার নাম আসেনি স্মরণিকাটিতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লেখাটি লিখেছেন রেণু আজাদ (উপদেষ্টা)।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের দৃষ্টিনন্দন স্টেজটি শিল্পী কামরুল হাসান লিপুর অসংখ্য শৈল্পিক কাজের একটি।

লেখাটির শুরু করেছিলাম, স্বরলিপি এবং উত্তরণ নাম ও কাজের ভিন্নতা দিয়ে। শেষ করতে চাই উভয়ের মিল দিয়ে। বাংলাদেশে যেমন হিন্দুর ঘরে জন্ম নেয়া শিশুটি পৈতৃকসূত্রে হিন্দু কিংবা মুসলমান বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঘরে জন্ম নেয়া সন্তানটিও নিজ নিজ ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকে, তেমনি জাপানেও উত্তরণ কিংবা স্বরলিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ঘরে জন্ম নেয়া শিশু সন্তানটিও একই সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে যান পৈতৃক কিংবা মাতৃক অথবা উভয়সূত্রে নিজের অজান্তেই। উভয় সংগঠনের স্মরণিকাগুলো দেখলে অন্তত তাই মনে হয়। খুদে সদস্যদের ছবি প্রকাশ পেয়ে থাকে স্মরণিকাগুলোতে।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.