ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বিক্রমপুর

পর্যটন পিপাসুদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে
মীর নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল: মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের খ্যাতি জগৎজোড়া। ইতিহাসের সমৃদ্ধপূর্ণ এই জনপদ হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে থাকা এই অঞ্চলে পর্যটকদের হাতিছানি দিয়ে ডাকার সব সম্ভাবনাই আছে। কী নেই এখানে। সদ্য আবিষ্কৃত হাজার বছরের প্রাচীন পাল আমলের বৌদ্ধবিহার ছাড়াও মুঘল স্থাপত্য ইদ্রকপুর কেল্লা, সুলতানী আমলের বাবা আদমের মসজিদ এবং ব্রিটিশ স্থাপত্য সোনারং জোড় মঠকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের বিচরণ শুরু হয়েছে।

এখানে শুধু প্রাচীন স্থাপত্যই নয় রয়েছে প্রকৃতির নয়নাভিরাম পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, রজত রেখা ও কাজল রেখা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য। মাওয়ার পদ্মার চর তাই এখন আকর্ষণীয় স্পষ্ট। ইতোমধ্যেই এখানে দু’টি রিসোর্ট হয়েছে। যেখানে ভিড় লেগেই আছে।

আর জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈত্রিক ভিটা শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়ীখাল পর্যটকদের অন্যতম বিচরণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই ভিন্ন। তাই এবার পর্য়টকদের ভিড়ও বাড়ছে। এই জনপদে শরত বিদায় না নিতেই সকালের ঘাসে শিশির বিন্দুর দেখা মিলে। পালতোলা নৌকা, আর রাখালের গান, পিঠাপুলির উৎসব সব কিছুর দেখা মিলবে এই বিক্রমপুরে।

বাংলার বারভূইয়াদের দমনের উদ্দেশ্যে মুন্সীগঞ্জে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলা ধলেশ্বলী নদীর তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। দুর্গের পূর্বদিকে ইংরেজীতে লিখা রয়েছে ‘দি ইদ্রাকপুর ফোর্ট’। বর্তমানে এটি মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এই দুর্গকে কেন্দ্র করেই জেলা শহর মুন্সীগঞ্জে জনবসতি গড়ে ওঠে।

সোনারং জোড় মঠ মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সত্যেন সেনের সোনারং গ্রামে অবস্থিত। এত সুন্দর জোড় মঠ ভারতীয় উপমহাদেশে বিরল। অনুমান করা হয় এখন থেকে ৩৫০ বছর আগে এই জোড় মঠ নির্মিত হয়। মঠ দুটিতে কোন নামফলক নেই।

উপমহাদেশের সর্বচ্চ মঠ হর শ্রীনগর উপজেলার শ্যামসিদ্ধিতে। সুবিশাল এই মঠের উচ্চতা ২৪২ ফুট। মঠের মূল দরজার ঠিক উপরে মার্বেল পাথরের নামফলকে লেখা রয়েছে-‘শম্ভুনাথে বাসাধ্য মঠ’ শতাব্দ-১৭৫৮ সন-১২৪৩। শম্ভুনাথ মজুমদার মহাশয় এই মঠ নির্মাণ করেন।

সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের কালীর আটপাড়ায় রয়েছে প্রাচীন শতীদাহ মন্দির। এটিও বিলুপ্তির পথে। একই উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের পানাম পোল ঘাটা গ্রামে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো ইটের পুল। ইট দিয়ে তৈরি এই পুলটি অন্যতম আকর্ষণীয় পুরাকীর্তি। তালতলা-মিরকাদিম খালের ওপর এটি স্থাপিত।

বিক্রমপুরের প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম হলো অতীশ দীপঙ্করের বাড়ি। মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বজ্রযোগিনী গ্রামে এই বাড়ির অবস্থান। ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে অতীশ দীপঙ্কর মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। বিক্রমপুরের পিতার নাম কল্যাণশ্রী এবং মাতার নাম প্রভাতী। অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধ মহাতান্ত্রিক ছিলেন। তিনি তিব্বতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনীতে অতীশ দীপঙ্করের বাড়িতে চীন সরকার আকর্ষণীয় স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে।

জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি মুন্সীগঞ্জে রাঢ়িখালে। এখানে একটি জাদুঘর ও শিক্ষা কমপ্লেক্স রয়েছে। যা ইতোমধ্যেই পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এই উপজেলার বালাসুরে রাজা যদুনাথ রায়ের বাড়িতে তৈরি করা হয়েছে দুটি জাদুঘর। দেশের একমাত্র নৌকা জাদুঘর রয়েছে এই মুন্সীগঞ্জেই। অধ্যাপক সুখেন চন্দ্র ব্যানার্জী বলেন, আমার বিশ্বাস, বিক্রমপুর জাদুঘর একসময় দেশের অন্যতম জাদুঘরে রূপান্তর হবে।

লৌহজং উপজেলার মাওয়া পদ্মা পারে ছুটির দিনে ও বিভিন্ন উৎসবে পর্যটকদের ঢল নামে। শুধু মাওয়াই নয়, পর্যটকদের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে লৌহজংয়ের পদ্মা রিসোর্ট, মাওয়া রিসোর্টসহ পদ্মা পারের কয়েক কি.মি. বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে পর্যটকরা আসছে দল বেধে। উপভোগ করেছেন বালু চরে ঘুড়ে বেড়ানোর আনন্দ, নদীতে গোসল করা আর পড়ন্ত বিকেলে সূর্যাস্ত যাবার অভাবনীয় দৃশ্য দেখা। নানা উৎসবে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর দক্ষিণের পদ্মা পারে পর্যটকদের ভিড় ছিল নজর কাড়ার মতো। রাজধানী ঢাকার যানজটে ত্যক্ত-বিরক্ত নগরবাসী সীসাযুক্ত বাতাস থেকে একটু হাঁফ ছেড়ে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করতে পরিবারপরিজন নিয়ে ছুটে এসেছিলেন রাজধানী ঢাকার অনতি দূরের এই পদ্মা পারে। বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকেও পর্যটকরা আসেন পদ্মার নির্মল আনন্দ উপভোগ করতে।

তারা ঘুড়ে বেড়ান বালুময় এই পদ্মা পারে। অনেকে আবার স্পিডবোট, নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করে পদ্মা নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরগুলোতে ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। সেখানে মজা করে বিভিন্ন খেলায় মেতে ছিলেন পর্যটকরা। বিশেষ করে ফুটবল আর ক্রিকেট খেলে মুক্ত বাতাসে আনন্দ আর উল্লাসে হারিয়ে যান প্রকৃতির সাথে। পদ্মার বুকে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। ইটপাথরের জীবনযাপন ছেড়ে পদ্মা পারের নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে।

সাথে প্রিয়জন স্ত্রী-সন্তান থাকলে সময়টা আরও ভাল কাটে। অনেকেই এখানে এসে বিমোহিত হচ্ছেন। অনেকে আরার নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে পদ্মায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দুরন্তপনায় মেতে ছিলেন বন্ধুবান্ধবদের সাথে। ছুটির দিনসহ বিশেষ দিনগুলোতে চলে আসছে মাওয়ার এই নীলাভূমিতে। তাই সরকার মাওয়ার অদূরে মাঝের চরে আকটি অত্যাধুনিক পর্যটক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মন্ত্রণালয় একত্রে জরিপও করেছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।

জায়গাটি পর্যটনের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। সরকারীভাবে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে পর্যটকদের আর কষ্ট করে কক্সবাজার বা কুয়াকাটায় যেতে হবে না। ঢাকার অতি কাছের এই জায়গাটিতে তারা পরিবারপরিজন নিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পদ্মা পারের এই নৈসর্গিক লীলাভূমিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখাসহ বেড়িয়ে যেতে পারবেন।
বর্তমানে জেলার মুক্তারপুর সেতু পর্যটকদের কোলাহলে মুখরিত। বিভিন্ন উৎসব ছাড়ার বিকেলে বা সন্ধ্যায় এখানে ধলেশ্বরী নদীর নির্মল বাতাস উপভোগ করতে আসেন সববয়সী নারী পুরষ। সন্ধ্যার পর সুউচ্চ এই সেতু থেকে নৌকা, লঞ্চ, চাঁদের আলো এবং সূর্যাস্তের নৈসর্গিক দৃশ্য কার না ভালো লাগে। তাই দূরদূরান্ত থেকে নানা শ্রেণীপেশার মানুষের মিলনমেলা এখন এই সেতু।

ঈদ ও পুজোর আনন্দ উপভোগ ছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যায় এমন ভিড় পড়ে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তারপুর সেতুতে। বিকাল থেকেই মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষের পদচারণা শুরু হয়। সন্ধ্যায় এই ভিড় যায় আরও বেড়ে। সেতুটির ফুটপাথ ছাপিয়ে ভিড় চলে আসে যানচলাচল স্থলেও। তবে ঈদের ছুটিতে আশপাশে বিনোদনের কোন স্থান না থাকায় এই ভিড় পড়ে যায়। তাই সন্ধ্যার পর এই সেতুতে গাড়ি চলা দুষ্কর হয়ে পড়ে। আর এই সেতুর নিচেই ধলেশ্বরীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ভিন্নমাত্রা যুক্ত করে।

দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বিনোদনপিপাসু মানুষ। প্রকৃতির টানে গভীর রাত অবধি ঘুরে ফিরছে। ধলেশ্বরী নদীর রাতের রূপ দেখে মুগ্ধ তারা।

চাঁদের আলোয় নদীর উপর দাঁড়িয়ে নদী, আকাশ আর বাতাশের এই লোভনীয় দৃশ্য দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করতেই এখানে ছুটে আসা।
মফস্বল শহর মুন্সীগঞ্জ এবং পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে কোন পার্ক বা বিনোদনের যথাযথ স্থান না থাকায় মুক্তারপুর সেতুকেই এই অঞ্চলের মানুষ বেছে নিয়েছে একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে। তবে পর্যটকদের দাবি নয়নাভিরাম ধলেশ্বরী তীরে পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন করা হোক। অনিন্দ্য রহমান জানান, ধলেশ্বরীর মতো এত সুন্দর নদীকে ঘিরে মুন্সীগঞ্জে পর্যটন কেন্দ্র করা এখন সময়ের দাবি।

জনকন্ঠ

Comments are closed.