মুন্সীগঞ্জে বাস মালিকদের একচেটিয়া নৈরাজ্য কায়েম

ভবতোষ চৌধুরী নুপুর: ঢাকার নিকটবর্তী নদীবেষ্টিত জেলা মুন্সীগঞ্জ। জেলা প্রশাসকের তথ্য মতে মুন্সীগঞ্জ সদর থেকে সড়কপথে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। নদীপথে যাতায়াত থাকলেও জেলার সড়কপথে রাজধানীর সাথে যোগাযোগ সহজ ও দ্রুত। তাই এলাকার হাজার হাজার মানুষ সড়কপথে বেশি যাতায়াত করে।

এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের চোখের সামনেই কতিপয় পরিবহন মালিক একচেটিয়া নৈরাজ্য কায়েম করে রেখেছে বাস সার্ভিস ব্যবসায়। তবে এই ঘটনায় নির্বাক প্রশাসন আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যাত্রীসাধারণ।

মুন্সীগঞ্জ জেলা সদর থেকে দুটি রুটে রাজধানীতে প্রায় দুই শতাধিক বাস যাত্রী পারাপার করে। তিনটি পরিবহন কোম্পানি- দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড, কুসুমপুর পরিবহন ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড যা চিতলীয়া-ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ-ঢাকা ভায়া মুক্তারপুর হয়ে রাজধানীতে চলাচল করে।

এ পরিবহন কোম্পানিগুলোর মধ্যে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ থাকা আর কুসুমপুর পরিবহনের বাসের সংখ্যা কম থাকায় নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড।

নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াতকারী যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশটা একেবারে মগের মুল্লুক হইয়া গেছে। দেখার যেন কেউই নাই। ঢাকা যাই প্রতিদিন, কাইল গেলাম ৫০ টাকা দিয়া আইজ ৬০ টাকা। তেলের দাম বাড়ে নাই, যুদ্ধও লাগে নাই, তাইলে কেন বাড়লো ভাড়া ? তাও আবার ১০ টাকা ?’

সরজমিনে দেখা গেল মুন্সীগঞ্জ শহরের বাস কাউন্টারেগুলোতে। তিনটি পরিবহন কোম্পানির মধ্যে কুসুমপুর পরিবহন ও দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের কাউন্টার খোলা রযেছে, বন্ধ রয়েছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট পরিবহনের কাউন্টার।

যথারীতি কুসুমপুর পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায় টিকেটের গায়ে ভাড়ার মুল্য নির্ধারণ করা ৫০ টাকা। আর দিঘীরপার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির টিকেটের গায়ে মুল্য নির্ধারণ করা রয়েছে ৬০ টাকা।

এ বিষয়ে দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের সুপারভাইজার মোঃ মতিনকে জিজ্ঞেস করা হয়, একই স্থান থেকে বাস ঢাকা যাচ্ছে এবং বাসগুলোর আসন সংখ্যা ৩৬ থেকে ৪০ জনের হলে কেন আপনাদের বাসের ভাড়া ১০ টাকা বেশি ?

তিনি জানান, আগে অন্যান্য বাসের ভাড়ার চাইতে আমাদের বাসের ভাড়া ৫ টাকা বেশি ছিল, তবে কেন এখন ১০ টাকা বাড়ালো তা ম্যানেজার বলতে পারবে।

২০১৩ সালে জারি করা বিআরটিএর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা (টোল, ফেরি থাকলে) নইলে স্বাভাবিক ভাড়া ১ টাকা ৭ পয়সা। কিন্তু নিয়মকানুন অমান্য করে ২৮ কিলোমিটারের ভাড়া ৩৯ টাকার স্থলে ৬০ টাকা নেয়া হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জের সর্বত্রই এ চিত্র দেখা যায় অহরহ। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে ঢাকার দূরত্ব ৩১ কিলোমিটার। হিসাব অনুযায়ী ভাড়া হবে ৪৩ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। মুন্সীগঞ্জের দিঘীরপাড় থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার যার ভাড়া হয় ৫৬ টাকা। কিন্তু ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৯০ টাকা করে।

এদিকে গজারিয়া উপজেলায়ও ভাড়া বৃদ্ধির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যাত্রীরা। এ অঞ্চলগুলোতে প্রকৃত ভাড়ার তুলনায় দুই-তিনগুন বেশী ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।

ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী দন্ত চিকিৎসক ডাক্তার প্রনয়ণ কুমার ভৌমিক জানান, আমার প্রতিদিন ঢাকা যেতে হয় চাকরির কারণে। মাঝে মাঝে গেলে হয়তো গায়ে এতোটা লাগতো না। কিন্তু প্রতিদিন যাওয়া-আসায় আর্থিকভাবে অনেক চাপে পড়তে হয়। অনেকেই আছে যাদের জন্য প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৬০০ টাকা যোগাড় করা কষ্টকর।

তিনি জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ৩৫ টাকার ভাড়া তিন দফা বৃদ্ধি করে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয় ৩-৪ মাস আগে। তবে হঠাৎ একলাফে কেন ১০ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে তা কেউ জানাতে পারেনি। কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় মালিকপক্ষ জানে সব।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক মোঃ বাবর জানান, প্রতিনিয়ত গাড়ির জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এ রুটে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১ টাকা ৫৫ পয়সা যা জনপ্রতি ৪৩ টাকা ৪০ পয়সা করে। তবে বর্তমানে এ ভাড়ায় পোষাচ্ছে না বলে বাস ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল জানান, বাস ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তবে দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড কি করে, কেন ভাড়া বৃদ্ধি করেছে তারা আমাদের জানায়নি। সরকারের নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী ভাড়া না নিয়ে বেশি ভাড়া নিলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সরেজমিন তদন্তে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের সর্বত্রই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বাস ও পরিবহন সিন্ডিকেটগুলো প্রশাসনের চোখের সামনেই কাউকে তোয়াক্কা না করে দিনের পর দিন ভাড়া বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত যাত্রীরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সর্বসাধারণ।

এটিএন টাইমস

Comments are closed.