নির্মাণ শুরুর অপেক্ষায় প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু প্রকল্প

পদ্মা সেতু প্রকল্পের মাওয়া ও জাজিরায় সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়েছে। জার্মানি ও চীন থেকে আনা হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। প্রাথমিক কাজ সেরে নিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত বরাদ্দ। এখন অপেক্ষা মূল সেতু নির্মাণ শুরুর। আগামী মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাওয়ায় এরই মধ্যে প্রকল্প অফিস নির্মাণ শুরু করেছে চায়না মেজর ব্রিজ। প্রকৌশলীদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরায় ভাড়া করা হয়েছে ২০টি বাড়ি। নির্মাণ করা হচ্ছে বেশকিছু আবাসিক ভবন। আর শ্রমিকদের থাকার জন্য পদ্মার দুই পাড়ে টিনশেডের প্রায় ২০০ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সয়েল টেস্টের জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু যন্ত্রপাতি এসেছে মাওয়ায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুটি জাহাজে সেগুলো প্রকল্প এলাকায় আনা হয়েছে। আরো যন্ত্রপাতি চারটি জাহাজে আনা হচ্ছে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, মূল সেতুর নির্মাণ শুরুর প্রাথমিক কাজ এগিয়ে চলেছে। সয়েল টেস্টের জন্য এরই মধ্যে যন্ত্রপাতি আনা শুরু করেছে চায়না মেজর ব্রিজ। আগামী মাসে শুরু হতে পারে এ কাজ। আর সংযোগ সড়কের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ে এগুলো সম্পন্ন হবে। এছাড়া বাজেটে ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ফলে অর্থায়ন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

জাজিরায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। চার লেনের এ সংযোগ সড়কের মাটির কাজ প্রায় সম্পন্ন। তবে বিটুমিনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। ৯৭০ মিটারের পাঁচটি ছোট সেতু, ১৯টি বক্স কালভার্ট, আটটি আন্ডার পাস ও টোলবুথ নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য রড, পাথর, বালু, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণ জড়ো করা হয়েছে নদীর পাড়ে। নৌপথে আনা বিভিন্ন উপকরণ খালাসের কাজ চলছে। রাখা হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেমের অফিসের কাছে। সংযোগ সড়ক ছাড়াও স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য ১২ কিলোমিটার সার্ভিস রোড ও ৩ কিলোমিটার লোকাল রোড নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে।

এদিকে মাওয়ায়ও ২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে মাটির কাজ চলছে। টোলবুথ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ইট, সুরকি, পাথর, বালু প্রভৃতি জড়ো করা হয়েছে প্রকল্প এলাকায়। তবে সার্ভিস এরিয়া-২-এর অগ্রগতি সবচেয়ে কম। এর আওতায় সেতুটির নির্মাণকালীন ও নির্মাণ-পরবর্তী প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

উল্লেখ্য, জাজিরা ও মাওয়া সংযোগ সড়ক এবং সার্ভিস এলাকা-২-এর ঠিকাদার হিসেবে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়ার এইচসিএম কনস্ট্রাকশন। এ অংশগুলোর পরামর্শক হিসেবে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, আগামী মাসে সয়েল টেস্টের কাজ শুরু হতে পারে। এ কাজে চায়না মেজর ব্রিজকে সহায়তা করবে চীনের মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। গত জুলাইয়ে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়। চায়না মেজর ব্রিজের প্রধান প্রকৌশলীসহ ২২ জনের একটি দল কয়েক দফা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। সহকারী প্রধান প্রকৌশলীসহ ১৫ জনের একটি দল এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। প্রয়োজনীয় শ্রমিকও সংগ্রহ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১৫ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি ২৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন নৌপথে নির্মাণ যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে প্রকল্প এলাকায়। স্রোত কমে এলে সয়েল টেস্টের কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দেশের সর্ববৃহৎ এ অবকাঠামো নির্মাণ হুট করেই শুরু করা যাবে না। এজন্য পদ্মা সেতুর নির্মাণে আগেই কর্মপরিকল্পনা করা আছে। সে অনুযায়ী এগিয়ে চলছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এখন পর্যন্ত ১৫ শতাংশ বাস্তবায়ন অগ্রগতি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই এর উদ্বোধন করা যাবে আশা করা যায়।

নদী শাসনে চুক্তি আগামী মাসে: পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদী শাসনের কাজ পেয়েছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে গত মাসে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। বর্তমানে সিনোহাইড্রোর সঙ্গে চুক্তির খুঁটিনাটি ও আইনি দিক চূড়ান্ত করছে সেতু বিভাগ। আগামী মাসে এ চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ অংশের আওতায় মাওয়ায় দেড় কিলোমিটার ও জাজিরায় ১২ কিলোমিটার নদী শাসন করা হবে।

পরামর্শক নিয়োগ প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে: পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল অবকাঠামো ও নদী শাসনের জন্য পৃথক পরামর্শক নিয়োগসংক্রান্ত প্রস্তাবটি ক্রয় সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ১৩ অক্টোবর এটি অনুমোদনের কথা রয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবনা বিবেচনায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানিকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগে সুপারিশ করেছে সেতু বিভাগ। এজন্য ব্যয় হবে ৩৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

বাস্তবায়ন ব্যয়: ছয়টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, নদী শাসনে ৮ হাজার ৭০৮ কোটি, পরামর্শক (সেনাবাহিনী ও কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে) ব্যয় ৫৩৭ কোটি, জাজিরা সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১ হাজার ৯৭ কোটি, মাওয়া সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১৯৩ কোটি এবং সার্ভিস এলাকা-২ নির্মাণে ২০৯ কোটি টাকা। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। তবে প্রকল্প এলাকায় পদ্মা নদীভাঙন রোধসহ কিছু ছোট প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। সেগুলো যুক্ত হলে এ ব্যয় ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু অত্যাধুনিক স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হবে। দুই তলাবিশিষ্ট এ সেতুর ওপর তলায় চলাচল করবে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। এর এক প্রান্ত থাকবে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায়; অন্য প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরায়। সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বনিকবার্তা

Comments are closed.