আড়িয়ল বিলের বিভীষিকা নৌ-ডাকাত!

crime1210মেহেদী আল আমিন: মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার মাঝখানে শত বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত আড়িয়ল বিল। বর্ষা মৌসুমে এ বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো জেলে। প্রতিদিন শত শত নৌকা নিয়ে গভীর নির্জন বিলে মাছ ধরতে যান পাশের তিন উপজেলার জেলেরা। ভূমিকা রাখেন আমিষের চাহিদা পূরণে। নৌকায় নিয়মিত ডাকাতির ঘটনায় সেই জেলেরাই সন্ত্রস্ত। ডাকাতরা লুটে নেয় মাছ ও জালসহ মূল্যবান জিনিসপত্র, চলে শারীরিক নির্যাতন। ডাকাতের উৎপাতে জেলেদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে।

শস্যক্ষেত, জলাশয় ও জনবসতি মিলে আড়িয়ল বিলের আয়তন ২৬০ বর্গকিলোমিটার। কোনো বসতি ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিলের আয়তন ১৩৬ বর্গকিলোমিটার; যেখানে বর্ষা মৌসুমে মাছ, শাপলা, শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আহরণ ও শুকনো মৌসুমে হয় ধান ও সবজি চাষ।

জানা গেছে, বাইচ খেলার বড় কোসা নৌকায় করে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাতের আঁধারে জেলেদের ওপর আক্রমণ করে ডাকাতের দল। রাতের অন্ধকারে দূর হতে বোঝার উপায় থাকে না এটা ডাকাতের নৌকা না জেলেদের। আর বুঝতে পারলেও ডাকাতদের নৌকার গতি মাছ ধরার নৌকা এমনকি ট্রলারের চেয়েও দ্রুত হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই তারা জেলেদের নৌকার নাগালে চলে আসে। মাছ, সেলফোন, নগদ অর্থ, মূল্যবান সামগ্রী লুট করে দ্রুত বিলের বাইরে চলে যায় ডাকাতরা।

শ্রীনগর উপজেলার সীমানার গভীর বিলে ৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৩টার দিকে মাছ ধরার কয়েকটি নৌকায় গণহারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। প্রতিটি নৌকায় ৫-১২ জন জেলে ছিলেন। ডাকাতির শিকার এক জেলে রাধানন্দ দাশ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘প্রথমে বুঝতে পারিনি। যখন বুঝতে পারলাম এটা ডাকাতের নৌকা; তখনই আমরা দ্রুতগতিতে নৌকা চালাতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম ডাকাতের নৌকার সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে না। তখন নৌকা থামিয়ে দিই শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে। ডাকাতরা এসে মাছ, স্বর্ণের চেইন ও সেলফোন নিয়ে দ্রুত চলে যায়। তবে তারা শারীরিক নির্যাতন করেনি। পাঁচ ডাকাতের প্রত্যেকেরই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।’

নিয়মিতই ঘটে এমন ডাকাতির ঘটনা। এসব ডাকাতকে অনেক জেলেই চেনেন। প্রতি বর্ষা মৌসুমে এ বিলে নির্বিঘ্নে মাছ ধরার জন্য প্রতিটি জেলে নৌকা থেকে ১৫-২০ হাজার টাকা দিতে হয় এ ডাকাতদের। টাকা না দিয়ে বিলে মাছ ধরতে গেলে নৌকা ও জাল নিয়ে যায় ডাকাদের দল। পরে অর্থের বিনিময়ে জেলেরা সেই জাল ও নৌকা ফিরিয়ে আনেন। তবে পুরো ব্যাপারটি এখনো গোপনই রয়েছে। কীভাবে টাকা দেন, কে নেয় টাকা— এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে নারাজ। শুধু বর্ষা মৌসুমেই নয়, শুকনো মৌসুমেও চলে ডাকাতি। আড়িয়ল বিলে প্রচুর পুকুর রয়েছে, যা বর্ষার মৌসুমে তলিয়ে যায়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে চারদিকে ধান চাষ হয় আর পুকুরগুলোয় আটকে পড়া মাছ ধরেন এর মালিকরা। এ পুকুরগুলোর মালিকরাও জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ উপঢৌকন দেন ডাকাতদের। কিন্তু প্রাণের ভয়ে কেউ কিছু বলতে চান না। থানায় মামলাও করেন না।

জাল ও নৌকার মালিক কার্তিক চন্দ্র (ছদ্মনাম) জানান, তারা প্রতি মৌসুমে ১৫-২০ হাজার টাকা দেন, যাতে নৌকায় ডাকাতি না হয়। তবু এ মৌসুমে ডাকাতির শিকার হয়েছে তার নৌকা। মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেয়ায় শুধু শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, ডাকাতি থেকে নয়। তিনি আরো জানান, ডাকাতের দল ঢাকার দোহার উপজেলার দিক থেকে আসে। আবার ডাকাতি শেষে সে দিকেই চলে যায়। পুলিশও তাদের ধরতে পারে না। এসব ঘটনা পুলিশের অজানা নয়।

এ বিষয়ে শ্রীনগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মুজিবুর রহমান বলেন, ‘জেলেদের নৌকায় ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে কেউ কোনো দিন থানায় আসেনি। এমনকি এ ধরনের ডাকাতির ঘটনা এর আগে আমি শুনিনি।’

বণিক বার্তার দোহার প্রতিনিধি জানান, উপজেলার আইনশৃঙ্খলা যে কোনো সময়ের তুলনায় খারাপ। আর প্রশাসনের শিথিলতায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ছে অনেকেই।

এ বিষয়ে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ হচ্ছে। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। দোহার থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. মাহমুদুল হক ডাকাতির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে। এ অভিযান চলমান। অন্য কোনো থানার অন্তর্গত এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটলে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়।’

বণিক বার্তা

Comments are closed.