সন্তানের মতোই যত্ন-আত্তি মিরকাদিমের গরুর : কদর বেশি

mirkadimcowমেলে শুধু ঢাকার রহমতগঞ্জ হাটে
মিরকাদিমের গরুর ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। প্রতিবারের মতো এবারও কোরবানির জন্য গরু পালন করেছেন খামারীরা। নিজের সন্তানের মতো করেই লালনপালন করা হয় গরু। পরিচর্চা, রুটিনমাফিক উন্নত খাবার, পরিচ্ছন্ন বাসস্থানসহ নানা কারণে এই গরুর বিশেষত্ব রয়েছে। অন্যসব গরুর চেয়ে মিরকাদিমের গরুর কদর আলাদা। তাই ঢাকার রহমতগঞ্জে প্রতিবছর মিরকাদিমের গরুরহাট বসে। রাজধানীর কিছু ক্রেতা এই গরুর অপেক্ষায় থাকেন। মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের গরু ছাড়া কোরবানি যেন সম্পন্ন হয় না পুরান ঢাকাবাসীর।

মিরকাদিমের গরু দিয়ে কোরবানির প্রচলন যেন ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরান ঢাকাবাসীর। মিরকাদিমের গরুকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে নিপুণভাবে কাজ করেন খামারীরা। একেকটি গরুকে কোরবানি উপযোগী করতে এক থেকে দুই বছর লেগে যায়। বাড়িতেই ছোট ছোট খামার করে এসব গরু পালন করা হয়। এছাড়া সোহেল মিয়া, টিটু চৌধুরী ও বাচ্চু মিয়ার বড় তিনটি খামার আছে। খামারে গরুগুলো পালন করা হয় অতিযত্নে।

মিরকাদিম হাজি আমজাদ আলী কলেজের পাশে সোহেল মিয়ার গরুর খামার। বংশপরম্পরায় তিনি এই গরু পালন করছেন। এ বছর তাঁর খামারে কোরবানি উপযোগী ৫০টি গরু রয়েছে। ঈদের আগেরদিন তিনি রহমতগঞ্জের হাটে তুলবেন এসব গরু। কোন কোন গরু তৈরি করতে তাঁর দুই বছরও লেগে গেছে। তাঁর খামারের গরু ৮০ হাজার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা দাম হাঁকা হবে।

খামারের রাখাল জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রতিটি গরুর পেছনে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শ’ টাকা খরচ হয়। গরুভেদে এই খরচ এবং দামের হেরফের হয়। খামারে পাঁচজনকে দিন-রাত গরু নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। জাহাঙ্গীর বলেন, গরুর যতœ আগে, পরে নিজের যতœ। গরুকে যে খুদ খাওয়ানো হয়, তা মানুষও খেতে পারে। আর গরুর ঘর এবং গরুকে সব সময় পরিষ্কার রাখা হয়। গরুর ঘর এত পরিষ্কার থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। এভাবেই গরু বেড়ে ওঠে আর সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে। লাল, সাদা নানা রঙের গরু রয়েছে খামারে। তবে সাদা গরুই বেশি। দেখতে সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। বেশিরভাগ গরুই মাঝারি, বড় আকারের গরুও রয়েছে।
mirkadimcow
মিরকাদিমের টিটু চৌধুরী, দুলাল মিয়া, পুকাই মিয়া, আনোয়ার মিয়া, অলি মিয়া, তৈয়ব আলী মিয়া, তাজিম মোল্লা, বাচ্চু মিয়াসহ অনেকেই এমন যতœ নিয়ে কোরবানির গরু পালন করছেন। গরুর প্রতি খামারীদের যেন বিশেষ মায়া জন্মে গেছে, দেখলেই তা স্পষ্ট। খামারীদের দেখলেই গরুগুলোর আচার-আচরণে তা প্রকাশ পায়।

টিটু চৌধুরীর খামারটি মিরকাদিমের রিকাবীবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পূর্বপাশের বাড়িতে। এই খামারেও এ বছর ৫০টি গরু পালন করা হয়েছে। এছাড়া বাচ্চু তার খামারে ৩০টি গরু তৈরি করেছে। এমন অনেকেই এখানে ঐতিহ্যবাহী মিরাকাদিমের গরু তৈরিতে নাওয়াখাওয়া ভুলে দিনরাত পরিশ্রম করে।

এই খামারগুলোতে আরেক ধরনের বিশেষ গরুও রয়েছে। যার নাম গুড্ডি গরু। যেটি খুবই ছোট আকারের। উচ্চতা আড়াই থেকে তিন ফুট। প্রস্থ চার থেকে সাড়ে চার ফুট। কিন্তু দাম অনেক বেশি। একটি খাসির চেয়েও ছোট এই গরুর দাম ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। শুধু মিরকাদিমেই এই গরু পালন হয়।

অতিযত্নের এই গরু বাইরে নেয়া হয় না তেমন। ঘরে রেখেই পালন করা হয় অত্যন্ত যত্নসহকারে। ঘাস খাওয়ানো হয় না। খৈল, ভুষি, কুড়া, খুদ খাওয়ানো হয় গরুকে। অতিযত্ন আর বিশেষ ধরনের খাবারের কারণে গরুর জৌলুস ছড়িয়ে পড়ে। ক্রেতার ভাষায়, এর মাংসও সুস্বাদু।

বেশি কদরের কারণে মিরকাদিমের গরুর দামও একটু চড়াই। চাহিদার কথা মাথায় রেখে হাটের প্রবেশদ্বারেই রাখা হয় গরুগুলো। বিক্রেতারা জানান, হাটে ওঠানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গরুগুলো বিক্রি হয়ে যায়।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ হামিদুল হক জানান, মিরকাদিমের গরুর সুনাম দেশব্যাপী, কদরও বেশি। ধলেশ্বরী তীরের মিরকাদিমের আবহাওয়া ও আন্তরিক বিশেষ যত্নের কারণে গরুগুলো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং চাহিদা মেটাতে সভ্যতার জনপদ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে বিশেষ এই গরু পালন করা হয়। বিশেষ যত্নে পালিত কোরবানির এই গরু কোরবানির তাৎপর্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গরু পালনে ব্যবসায়িক চিন্তার পাশাপাশি ঐতিহ্য ধরে রাখার ব্যাপারেও এই অঞ্চলের মানুষের বেশ আগ্রহ রয়েছে। তাই চাহিদা অনুযায়ী এই গরু পালনও বাড়ছে।

মিরকাদিমের গরুরহাট ১৯৯৩ সালে প্রথম বসে রহমতগঞ্জে। এরপর থেকে প্রতিবছরই বেপারিরা এই হাটে গরু নিয়ে যান। গরুর সৌন্দর্য আর স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে এর দাম। এই হাট থেকে বেপারিদের গরু ফেরত নিয়ে যেতে হয়নি কখনই। এই রহমতগঞ্জের হাট ছাড়া কোথাও এই গরু পাওয়া যায় না।

জনকন্ঠ

Comments are closed.