মিরকাদিমের সাদা গাই গনি মিয়ার হাটে

mirkadim-cow-04কোরবানির পশু
ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু বাছাইয়ে পুরান ঢাকাবাসীর পছন্দের শীর্ষে ‘ধবল গাই’। আর শত বছর ধরে এই চাহিদার জোগান দিয়ে চলেছে মিরকাদিমের খামারিরা। মুন্সীগঞ্জ জেলার একটি পৌরসভা মিরকাদিম। আর আপাত মামুলি এই জায়গার নামটি বিখ্যাত হয়ে গেছে এই ধবল গাইয়ের সুবাদে। তাদের অতি যত্নে পালিত গরুগুলো তোলা হয় পুরান ঢাকার গনি মিয়ার হাটে। সেখান থেকেই বাছাই করে কিনে নেন বনেদি ঢাকাইয়ারা।

মিরকাদিমে সাদা রঙের বিশেষ জাতের গাভিগুলো লালনপালন করা হয় মূলত কোরবানির ঈদে চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখেই। ঈদের আগের রাতে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জে গনি মিয়ার হাটে এসব গাভি তোলা হয়। আর বিশেষ শ্রেণির ক্রেতারাও যেন মুখিয়ে থাকে। আগেভাগে বাছাই করে পছন্দের গরুটি কিনতে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই হাটে।

সাদা রঙের গরু লালনপালন শেষে বিক্রি করে মিরকাদিমের অনেক খামার মালিকের ভাগ্য ফিরেছে। টানাটানির সংসারে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের অনেক সাধই অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু গরুর যত্ন-আত্তিতে কোনো ঘাটতি পড়ার সুযোগ নেই। দেশের আর কোথাও গবাদি পশু লালনপালনে যা দেখা যাবে না। যে শ্যাম্পু নিজে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খরচের কথা ভেবে দশবার ভাবতে হয়, সেই শ্যাম্পু দিয়ে পরম আদরে পালিত গরুকে নিয়মিত গোসল করান খামারিরা। মশার কামড় থেকে বাঁচাতে রাতে গোয়ালঘরে নিয়মিত মশারি খাটান। শীতে গরুর গায়ে চাপানো হয় বিশেষ ধরনের লেপ। আবার গরমে আরাম দিতে গোয়াল ঘরে ঘুরতে থাকে বৈদ্যুতিক পাখা। খাবারের ব্যাপারেও ব্যতিক্রমী ভাবনা। নির্ভেজাল খৈল, বাছাই করা ভুসি, খুদের জাউ, ভাতের মার আর তাজা ঘাস প্রতিদিন তুলে দেওয়া হয় গরুর মুখে। মাটিচাপা দিয়ে ধানের কুটা পচিয়ে এক ধরনের খাবার বানিয়ে খাওয়ানো হয় গরুকে।
mirkadim-cow-04
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম এলাকায় এক খামারে অতি যত্নে লালন পালন করা হচ্ছে সাদা গাই।

মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম ও আশপাশ এলাকায় প্রায় দুই শ পরিবার সারা বছর এমন নিবিড় যত্ন নিয়েই সাদা রঙের বিশেষ জাতের গরু লালনপালন করে। এগুলো দেশজুড়ে মিরকাদিমের সাদা গরু নামেই বিশেষ পরিচিত। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, সাদা গাই। কোরবানিতে এই সাদা গরু বিক্রি করেই ওই পরিবারগুলোর সারা বছরের আহার জোটে। প্রায় শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় মিরকাদিমের মানুষ বিশেষ ধরনের ধবধবে সাদা রঙের গাই গরু পালন করে আসছে। খামার মালিক মামুন মিয়া বলেন, ‘এবার ছয়টি সাদা গাই বিক্রি করে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করব। ছেলেমেয়েদের ভালো কাপড়চোপড় কিনে দেব।’

সাদা গরুর সুবাদে মিরকাদিম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষের কাছেও বেশ পরিচিত। বিশেষ করে কোরবানির সময় এ নামটি উচ্চারিত হয় বেশি। ঈদের আগে আগে মিরকাদিমে গরু ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। মিরকাদিমের গরু মানেই বাজারে ব্যাপক চাহিদা আর নিশ্চিত লাভের হাতছানি। একাধিক খামার মালিক জানান, বিভিন্ন উন্নত জাতের সাদা গাই বাছুর কিনে তা বছরব্যাপী লালনপালন করা হয়। গরু পরিচর্যায়ও নেওয়া হয় বিশেষ যত্ন। একেকটি গরুর শরীর ধোয়া-মোছার জন্য নতুন গামছা ব্যবহার করা হয়। এমনকি গরুর গোয়ালে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

বর্তমানে অনেক খামার মালিক সাদা রঙের ষাঁড় বাছুর কিনে লালনপালন করছেন। তবে পুরান ঢাকাবাসীর কাছে সাদা রঙের ষাড়ের চেয়ে গাইয়ের চাহিদা বেশি। দামেও রয়েছে বেশ তফাৎ। রহমতগঞ্জের হাজি হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘সাধারণত সাদা রঙের একটি ষাঁড়ের দাম ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা হলে গাইয়ের দাম হবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। অনেক সময় এই বিশেষ ধরনের পশুর সংকট হলে দাম অনেকটা বেড়ে যায়।’

ঢাকার আদি বাসিন্দারাও অনেকে বাজারদরের দুই-তিন গুণ বেশি টাকা দিয়ে হলেও মিরকাদিমের গরু কিনে থাকে। অনেকে ব্যাপারীদের অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বললেন, ‘মিরকাদিমের সাদা গাই ঢাকাইয়াদের আভিজাত্যের অংশ হয়ে গেছে। ঈদে যত গরু-খাসির মাংস খাওয়া হোক না কেন, মিরকাদিমের সাদা গাইয়ের এক টুকরো মাংস না খেলে যেন কোরবানির মাংস খাওয়াই অপূর্ণ থেকে যায়।’

চকবাজারের আফজাল আহমেদ জানান, তাঁর পরিবার প্রতি ঈদে পাঁচ থেকে ছয়টি পশু কোরবানি দিয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি মিরকাদিমের সাদা গাই থাকা চাই। এটা তাঁর দাদার আমল থেকে চলে আসছে। আকাশছোঁয়া চাহিদার কারণে সঠিক সময়ে হাটে না গেলে এই গরু পাওয়া যায় না বলে জানান রহমতগঞ্জ এলাকার আবু হানিফ। তিনি আরো জানান, মিরকাদিমের একেকটি গাই সাধারণত ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা হয়।

শুধু মিরকাদিমের গরু বিক্রির জন্য গনি মিয়ার হাট বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়। আলোকসজ্জার পাশাপাশি ওপরে টানানো হয় রং-বেরঙের সামিয়ানা। এই সামিয়ানার নিচে সাদা গরুগুলো সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়। ইচ্ছা করলেই যেকোনো পশুর হাটে মিরকাদিমের গরু মিলবে না। এ জন্য যেতে হবে এই গনি মিয়ার হাটে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদের আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ গরু ওঠে এই হাটে। এ ধরনের গরু বেচাকেনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাপারীর সংখ্যাও সীমিত। হাটের মূল আকর্ষণ বরাবরই মিরকাদিমের গাই। দেখার জন্যও অনেকে হাটে ভিড় করে।

ব্যাপারী সোহবান মুন্সী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১০টি সাধারণ গরু বিক্রি করে যে লাভ হয় মিরকাদিমের একটি গরু থেকেই তা পাওয়া যায়। তবে এই গরু সীমিত হওয়ায় ঢাকাইয়াদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। অনেকেই খালি হাতে হাট থেকে ফিরে যান।’ প্রতিবছর এই হাটে তিন হাজারের মতো সাদা গাই গরু তোলা হয় বলে হাটের ইজারাদার সূত্রে জানা যায়। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব গরু বিক্রি হয়ে যায় বলে জানালেন ক্রেতা হাজি আফসার আলী।

গরুর নাম কেন মিরকাদিমের নামে হলো এমন প্রশ্ন অনেকের মনে। স্থানীয় লোকজন সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক শ বছর আগে ঢাকার কাছাকাছি জনপদ মিরকাদিম এলাকার লোকজন সাদা গাই পালন শুরু করেছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা চলে আসছে। মিরকাদিমের গরুর ব্যাপারীরা জানান, তাঁরা যশোর, রাজশাহী, দিনাজপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে বাছাই করে সাদা গাই গরুর বাছুর কিনে আনেন। এরপর বিশেষ যত্নের সঙ্গে গরুগুলো পালন করে কোরবানির হাটে বিক্রি উপযোগী করে তোলা হয়।

সরেজমিনে জানা যায়, মিরকাদিম এলাকাটি পশুর খাদ্যের জন্য প্রসিদ্ধ। সেখানে প্রচুর তেলকল ও ধানের চাতাল থাকায় সাশ্রয়ী দামে খৈল-ভুসি পাওয়া যায়। এ ছাড়া কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় ঘাসও সহজলভ্য। খোলা মাঠে চড়ানো হয় বলে সহজেই মিরকাদিমের গরু বেড়ে ওঠে। গরুগুলো নিখুঁত এবং উচ্চতায় বেশি হয়। গরু পালনকারী মঞ্জু জানান, মিরকাদিমের সাদা গরু এমনভাবে পালা হয় যাতে গরুর গায়ে প্রচুর চর্বি হয়। এ জন্য বিশেষ ধরনের খাদ্য দেওয়া হয়। আর চর্বিযুক্ত গরুর মাংস পুরান ঢাকাবাসীর বড়ই পছন্দ।

আপেল মাহমুদ
কালের কণ্ঠ

Comments are closed.