গ্রাহকদের দেড় শ’ কোটি টাকা মেরে জামায়াতী কোম্পানির ‍উধাও

crime3স্বজনকে পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দিয়ে এমডির চম্পট
মুন্সীগঞ্জে দুইটি ও ঢাকার দোহার উপজেলা হতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে ম্যাগনেট মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি এমএলএম কোম্পানি। নিজের নামের সকল সম্পত্তি পাওয়ার অব এ্যাটর্নির মাধ্যমে আত্মীয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এক সময়ের জামায়াত নেতা আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার। ঢাকার নয়াপল্টনের প্রধান কার্যালয়সহ দশটি শাখার মাধ্যমে কয়েক বছরে ব্যবসা পরিচালনা করে প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার শ্রীনগর ও ষোলঘর শাখায় শত শত গ্রাহক উপস্থিত হয়ে কোম্পানির অফিসে তালা ঝুলতে দেখে হায়-হুতাশ শুরু করে। পরে তারা শ্রীনগর থানায় উপস্থিত হয়ে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে।

২০০৯ সালে ম্যাগনেট মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, লৌহজং ও ঢাকার দোহার উপজেলায় এমএলএম কোম্পানির ব্যবসা বা ঋণ আদান-প্রদানের ব্যবসা শুরু করে। কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে। এর এমডি আনোয়ারুল ইসলাম শ্রীনগর উপজেলা ছাত্রশিবিরের নেতা ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা জামায়াতের সদস্য। কোম্পানিটির ডিএমডি তাঁর স্ত্রী আছমা আনোয়ার। কৌশলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা সাধারণ জনতার মাঝে বিশ্বাস অর্জন করে। এক সময় জনগণকে অধিক টাকা সুদ দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা জমা নেয়। এতে বেশি লাভের আশায় সহজ সরল মানুষ এক লাখ থেকে শুরু করে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা দেয় ওই কোম্পানির কাছে।

প্রথম প্রথম কয়েক মাস সকল গ্রাহককে সুদের টাকা দিলেও এক সময়ে টালবাহানা শুরু করে গ্রাহকদের সঙ্গে। গত কয়েক মাস ধরে গ্রাহকদের টাকা দেই দিচ্ছি করে টালবাহানা শুরু করে কোম্পানির বিভিন্ন আইনকানুন দেখিয়ে টাকা দিতে সময় লাগবে বলে গ্রাহকদের জানায়। ২৫ সেপ্টেম্বর আনোয়ার তাঁর স্বজনদের নামে নিজের সকল বিষয় সম্পত্তির পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দিয়ে কোম্পানির অফিসে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁর বাড়ি শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর সদরে।

শ্রীনগর সরকারী কলেজের সাবেক ভিপি মোঃ মোস্তফার স্ত্রী রোকসানা বেগম বলেন, আমি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলাম। কোন টাকাই ফেরত পাইনি। এখন থানায় এসেছি কিন্তু থানাও মামলা নিতে চাচ্ছে না। এখন কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। আনোয়ারের নামে যে বিষয় সম্পত্তি ছিল তা তাঁর ভাগ্নে সেলিম ও মোস্তফা কামাল নামে একজনের ছেলের বউ ও তাঁর মেয়ের নামে ক্ষমতা অর্পণ করে গেছেন।

প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে এ সব বিষয় সম্পত্তি জেন তারা বিক্রি করতে না পারে। শ্রীনগরের সমষপুরের মাসুদ শেখ ২ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন ষোলঘর শাখায়, মধ্যবাঘড়ার জুয়েল শেখ আলামিনবাজার শাখায় দেড় লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন, শ্রীনগরের আব্দুল সাত্তার তাঁর নামে তিন লাখ ও তাঁর স্ত্রী সালমার নামে ২ লাখ মোট ৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলন। এ রকম আরও অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়ে শ্রীনগরে মাল্টি পারপাস কোম্পানিটির অফিসে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন। তাঁরা শ্রীনগরে আনোয়ারুলের বাড়িতে গিয়েও তাঁর ঘরে তালা ঝুলতে দেখেন। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

শুধু গ্রাহকদেরই নয়, তাঁর কোম্পানির অনেক কর্মচারী ও কর্মকর্তা চাকরির পাশাপাশি নিজের গচ্ছিত টাকা পয়সা সুদের আশায় জমা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে এখন কান্নাকাটি শুরু করেছেন। একদিকে চাকরি হারিয়ে বেকার, অপরদিকে নিজেদের গচ্ছিত টাকা পয়সা হারিয়ে এখন দিশেহারা। এমন একজন শামীম আহমেদ মীরাজ জানান, আমি চাকরি করার পাশাপাশি নিজের কিছু টাকাও খাটিয়েছিলাম কোম্পানির কাছে। এখন আমার সবই গেল। টাকা পয়সা তো গেছেই, সেই সঙ্গে গ্রাহকদের চাপে এখন আমি বাড়িছাড়া। তিনি বলেন, কোম্পানিটি গ্রাহকদের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে। তবে কোম্পানিও সদস্যদের কাছে অনেক টাকা পাবে। তাছাড়া এখান থেকে টাকা নিয়ে কোম্পানির এমডির নামে অনেক জায়গা জমিও কেনা হয়েছে।

শ্রীনগর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার বলেন, মাল্টিপারপাসটি ঢাকার সমবায় হেড অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছিল। আমার এখানে দেড় শতাধিক সমিতির সদস্যের নাম ঠিকানাসহ একটি খাতা জমা দিয়েছিল। সমিতির বাইরে কারও কাছ থেকে ঋণ দেয়া-নেয়ার বিধান নেই কোম্পানিটির।

জনকন্ঠ

Comments are closed.