৪০০ বছরের ঢাকের হাট

dolদুর্গোৎসবের সময় ঢাকিদের কদর বেড়ে যায়। অনেক এলাকার পূজারিরা ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানান হাটে গিয়ে শিউলি ফুলের ছড়ানো গন্ধে, নদীপাড়ের কাশফুলের দোলায় আনন্দময়ী দুর্গার আগমনবার্তা রটে গেছে। কারিগর প্রতিমার গায়ে তুলির শেষ আঁচড় দিতে ব্যস্ত। মন্দির সজ্জায় ব্যস্ত পূজার আয়োজকেরা। চারপাশের আড়ম্বর যা-ই থাকুক, ঢাকে কাঠি না পড়লে পূজা শুরু হচ্ছে না। দুর্গাপূজার শুরু মহাষষ্ঠীতে প্রতিমার আসনে প্রতিস্থাপন থেকে শুরু করে বিসর্জন—সবখানেই ঢাকের বাজনা চাই-ই চাই। দুর্গোৎসব ঘিরে এ বাদ্য যাঁরা বাজান, সেই ঢাকিদের চাহিদা ও কদর দুই–ই বেড়ে যায়।

ঢাকিরা সাধারণত পূজা শুরুর কয়েক দিন আেগ থেকে সারা দেশের মণ্ডপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েন অনেকটা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে। তবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর হবিগঞ্জের পূজািররা ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানান হাটে গিয়ে এবং দরদাম করে। এই হাটের নাম ‘ঢাকের হাট’। প্রায় ৪০০ বছর ধরে ব্যতিক্রমী এমন একটি হাট বসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পুরান বাজার এলাকায়। কটিয়াদী উপজেলা সদরের কাছেই পুরান বাজার। রীতি অনুযায়ী, উৎসবের আগের দিন অর্থাৎ পঞ্চমী ও ষষ্ঠীর দুই দিন এ হাট বসে।

ষষ্ঠী কাল মঙ্গলবার। সেই হিসাবে সোমবার ও পরদিন মঙ্গলবার কটিয়াদীতে বসবে ঢাকের হাট। এ হাটে আসা ঢাকিরা আসেন মুন্সিগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের শ্রীপুর ও নরসিংদী থেকে। ঢাকের পাশাপাশি কাঁসি, সানাই, নানা জাতের বাঁিশ, করতাল, খঞ্জির বাদকেরাও সমবেত হন হাটের আগের দিন থেকে।
dol
কটিয়াদীর ঢাকের হাটে কোনো পণ্য কেনাবেচা হয় না। শুধু দুর্গাপূজার জন্য অর্থমূল্যের বিনিময়ে মণ্ডপ পরিচালনাকারীদের সঙ্গে ঢাকিরা চুক্তিবদ্ধ হন। কোন দলের মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ হয় উপস্থিত মুনশিয়ানা পরীক্ষার মাধ্যমে। দলের দক্ষতা বোঝাতে ঢাকিরা তাই হাটেই বাজনা বাজিয়ে থাকেন। শুধু তা-ই নয়, বাজনার তালে নাচ আর নানা ঢঙে অঙ্গভিঙ্গ প্রদর্শনের মাধ্যমে পূজারিরদের নজর কাড়ার চেষ্টা করা তাঁদের পেশারই অংশ। ওই দুই দিন পুরান বাজারে ভিন্ন রকম উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বাজনার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। দক্ষতা দেখার পর চলে দর-কষাকষি। সাধারণত দলভিত্তিক চুক্তি হয়ে থাকে। প্রকারভেদে ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকেন তাঁরা।

জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তাঁর রাজ প্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। উপজেলাটির চারিপাড়া গ্রামে ছিল ওই রাজার প্রাসাদ। একবার রাজা নবরঙ্গ রায় সেরা ঢাকির সন্ধান করতে বিক্রমপুর পরগনার (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ) বিভিন্ন স্থানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বার্তা পাঠান। সে সময় নৌপথে অসংখ্য ঢাকি দল পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীর কটিয়াদীর যাত্রাঘাটে সমবেত হন। রাজা নিজে দাঁড়িয়ে একে একে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন এবং পুরস্কৃত করেন। সেই থেকেই যাত্রাঘাটে ঢাকের হাটের প্রচলন শুরু। পরবর্তীকালে স্থানান্তরিত হয়ে পুরানবাজারে বসে আসছে এ হাট।

এ হাটের আয়োজকদের একজন বেণি মাধব ঘোষ বলেন, প্রতিবছর আড়াই শ থেকে তিন শ ঢাকির দল হাটে সমবেত হলেও তাদের থাকা বা বিশ্রামের কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেকটা মর্যাদাহীনভাবে বিশ্রামের জন্য স্থানীয় আখড়াগুলোতে অবস্থান নিতে হয় তাদের।

তবে কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আইন উদ্দিন বললেন, এ হাটের ব্যবস্থাপনা যাতে ভালোভাবে হয়, তা নিয়ে একটি প্রস্তাব আছে উপজেলা পরিষদে। সেটি বাস্তবায়ন করা হবে ধীরে ধীরে।

স্থানীয় গবেষক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা এ হাটকে শুধু দুর্গাপূজার অংশ হিসেবে ভাবতে নারাজ। তাঁদের চোখে এটি স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ। স্থানীয় লোকসাহিত্য গবেষক মু. আ. লতিফ বললেন, কটিয়াদীর ঢাকের হাট ৪০০ বছরের ঐতিহ্যের স্মারক। একে ধরে রাখতে হবে।

প্রথম আলো

Comments are closed.