পিতার পায়ে আঘাত করায় রফিকের পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়!

juboledeadযুবলীগ নেতা হত্যা মামলার আসামী ৫ : গ্রেফতার ১, আরেক যুবলীগ নেতাকে হত্যার হুমকি
মুন্সীগঞ্জে যুবলীগ নেতা রফিক হত্যার প্রসঙ্গে গ্রেফতারকৃত সুজন বলেছে, রফিক ও তার লোকজনের আক্রমনে সুজনের বাবা তাজুল ইসলাম পায়ে আঘাত পান। এর প্রতিশোধ নিতেই পায়ের রগ কেটে রফিককে হত্যা করা হয়। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক হত্যার ঘটনার ৫ জনকে লৌহজং থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত রফিকের বড় ভাই নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে লৌহজং থানায় এ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ শুক্রবার স্থানীয় মৌছামন্দ্রা গ্রামের মৃত ইদ্রিস মেম্বারের পুত্র রাতে অন্যতম আসামী সুজনকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ তাকে জিঞ্জাসাবাদ করছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এ ছাড়া রহিম মেম্বার নামে অপর এক ব্যক্তিকে রাতে আটক করলেও জিঞ্জাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মূলত ২০১২ সালে কাজির পাগলার আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হত্যা মামলায় বাদী পক্ষে রফিক সহযোগিতা করায় ওই মামলার আসামীদে সাথে রফিকের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এ নিয়ে এর আগেও আসামীরা রফিককে হামলার চেষ্টা করলে গ্রামবাসী রফিককে রক্ষা করে ও গ্রেফতারকৃত আসামী সুজনের বাড়ি হামলা করায় রফিকের প্রতি মোবারক হত্যা মামলার আসামীরা ক্ষিপ্ত ছিল। এ কারণেই পরিকল্পনা মত রফিককে খুন করা হয়। এদিকে টিটু খান নামে আরেক যুবলীগ নেতাকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে শাকিল নামে এক ব্যক্তি। সে গতকাল লৌহজং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

তাছাড়া এই একই গ্রুপের হাতে খুন হওয়ার আশঙ্কা করছেন নিহত আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক খানের মেয়ে ও পিতা হত্যা মামলার বাদী ওয়াহিদা খান দিয়া ও ওই মামলার স্বাক্ষী খোকন। লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেন জানান, রফিক হত্যা মামলার আসামী হচ্ছেন কাজির পাগলা গ্রামের আব্দুর রব খানের ছেলে সাহাবুদ্দিন খান বাবু (৩২), নূর ইসলামের পুত্র মো. মিঠু (৩১), আফজাল শেখের পুত্র করিম শেখ (৩৫) তাজুল ইসলামের পুত্র মো. সুজন ও মৌছামান্দ্রা গ্রামের ইদ্রিস শেখের পুত্র সুজন শেখ। এদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন খান বাবু ও সুজন ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন খান হত্যা মামলার এজাহারভূকত আসামী। অপর সুজন এক আসমীর দেয়া ১৬৪ ধারার জবার বন্দীতে খুনের সাথে জড়িত ছিল।

ওসি বলেন, মামলা দায়েরের পরই আসামী সুজনকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিঞ্জাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মামলা তদন্তের সার্থে এখনই তা প্রকাশ করা যাবেনা। রহিম মেম্বার নামে অপর একজনকে জিঞ্জাসাবাদের জন্য আটক করা হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ওই রহিম মেম্বার ঘটনা স্থলের কাছে রফিকের শরীর থেকে ঝড়ে থাকা ছাপ ছাপ রক্ত পানি দিয়ে মুছে ফেলতে ছোট ভাইকে বলেছিল বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী মহিলা জন সম্মুখে পুলিশকে জানিয়ে ছিল। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত যুবলীগ নেতা রফিকের ভাই ও মামলার বাদী নজরুল ইসলাম ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৮ই অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা মোবারককে হত্যার পর মামলা হলে রফিক ওই মামলায় বাদী পক্ষকে সহযোগিতা করে আসছিল। রফিকের সহযোগিতার কারণে কাজির পাগলার সুজন প্রেফতার হয়। দীর্ঘ দিন হাজতে থাকার পর বর্তমানে ওই মামলায় সুজন জামিনে রয়েছে। এই নিয়ে ওই মামলার আসামী ও তাদের বন্ধু মহলের সাথে রফিকের প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয়ে আসছিল। মোবারক হত্যা মামলার ব্যাপারে রফিককে বাড়াবাড়ি না করতে বিভিন্ন সময়ে হুমকি ধমকি দিয়ে আসছিল আসমীরা। কিন্তু রফিক পিছু না হওয়ায় আসামীরা তার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গত ঈদুল ফিতরের পর রফিককে বাড়ির পাশের রাস্তায় একা পেয়ে সুজন ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে আক্রমন করার চেষ্টা করে।

কিন্তু এ সময় গ্রামবাসী টের পেয়ে মসজিদের মাইকে রফিকে সন্ত্রাসীরা আক্রমন করেছে বলে ঘোষনা করলে শত শত গ্রামবাসী এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। এসময় গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে সুজনের বাড়িতে হামলা করে। গ্রামবাসীর আক্রমনে সুজনের বাবা তাজুল ইসলাম পায়ে আঘাত পান। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানান, বাবার প্রতি এ আঘাত সুজনকে আরো জিঘাংসা পরায়ন করে তুলে। সে তার পিতার প্রতি আক্রমনের প্রতিশোধ নিতে মওকা খুজতে থাকে। বন্ধুদের নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকে রফিককে কিভাবে পিতার অপমান ও আক্রমনের প্রতিশোধ নিবে। বাবা পায়ে আঘাত পাওয়ায় রফিককে পায়ের রগকেটে হত্যার করার পরিকল্পনা করে সুজন ও তার দলবল। সূত্রমতে রফিককে গত বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির সামনের রাস্তা হতে পরিচিত লোক দিয়ে মাইক্রোতে তুলে নেয়। এর পর তাকে নিয়ে মাইকোটি কাজির পাগলা হতে মাওয়ার দিকে ছোটে। পথি মধ্যে মুখোশ পড়া কয়েকজন লোক নিদৃষ্ট জায়গা থেকে মাক্রোটিতে উঠে। এসময় তারা রফিককে হাত পা বেধে ফেলে। তার পর তাকে নিয়ে আসে কাজির পাগলা গ্রামের চিতাখোলার কাছে একটি পরিত্যাক্ত রাইস মিলে।

এখানেই রফিককে পায়ের রগ কেটে রক্ত ঝড়িয়ে নিস্তেজ করে হত্যা করে সন্ত্রাসী ওই বাহিনী। লৌহজং থানার ওসি জানায়, বৃহস্পতিবার এখান থেকে কয়েকজন মহিলা রফিককে হাত-পা বাধা অবস্থায় নৌকায় তুলতে দেখেছে। এসময় একজন মহিলা এগিয়ে গেলে তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়। রফিককে দু’জন নৌকায় করে নিয়ে চন্দ্রের বাড়ির দিকে রওনা দেয়। অপরজন মহিলাদের ধমক দিয়ে চলে যান। তাদের তথ্য মতে পুলিশ ওই দিন খোজখোজি করেও রপিকের সন্ধান মেরাতে পারেনি। পরের দিন সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি নামিয়ে একটি ধনিচার জমি থেকে রফিকের হাত পা বাধা ও পায়ের রগকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।

মোবারক হত্যা মামলার আসামী সাহাবুদ্দিন বাবু, কাজির পাগলার সুজন ও মিঠু রফিক হত্যার সাথে জড়িত বলে পুলিশ মোটামোটি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এ হত্যা মিশনে কত জন অংশ নিয়েছে পুলিশ এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি। ওসি জানায়, বাকী আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মোবারক হত্যা মামলায় রফিক মামলার বাদী ও মোবারকের মেয়ে দিয়া’কে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করায় রফিককে ওই মামলার আসমীরাই পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হত্যা করেছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হতে পেরেছে। উল্লেখ্য মতিঝিলের ব্যবসায়ী মাওলানা আব্দুল কাদেরকে তার নিজে অফিসে বশে কয়েক বছর পূর্বে গুলি করে হত্যা কার হয়। ওই হত্যাকান্ডের চাক্ষুস স্বাক্ষী ছিল কাজির পাগলা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোবারক হোসেন খান।

এই স্বাক্ষীকে সরিয়ে দিতে ২০১২ সালে ১৮ অক্টোবর মোবারককে কাজির পাগলা গ্রামের নিজ বাড়ির দড়জায় কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই মামলায় বাদীকে রফিক সহযোগিতা করায় আসামীদের সাথে তার দ্বন্দ্ব লেগে যায়। তাই রফিকেও প্রান দিতে হলো। এদিকে শনিবার আরেক যুব লীগ নেতাকে মোবাইলে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে রফিক হত্যা মামলায় সহযোগিতা করার জন্য। মৌজা মান্দ্রা গ্রামের কুতুবুর রহমান শেখের পুত্র শাকিল শেখ শনিবার ৫ নং মৌছামান্ত্রা ওয়ার্ড যুবলীগ সহসভাপতি মো. টিটু খানের মোবাইলে ফোন করে তাকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে। রফিকের হত্যা মামলা নিয়ে তার ভাইয়ের সাথে থানায় দৌড়াদৌড়ি করায় ও আসমীদের ধরিয়ে দিতে পুলিশকে সহযোগিতা করার অভিযোগে তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে শাকিল।

গতকাল বিকেলে টিটু এ ব্যাপারে লৌহজং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে। অপর দিকে আবারো জীবনের নিরাপত্তার অভাব অনুভব করছেন নিহত মোবারকের মেয়ে ও পিতা হত্যা মামলার বাদী ওয়াহিদা খান দিয়া। তিনি বলেন, আমাকে সহযোগিতা করার কারণে ওরা রফিক ভাইকে মেরে ফেললো। যে কোন সময় ওরা আমাকেও মেরে ফেলবে। এত দিন শুধু হুমকি দিয়ে আসছিল। ভয় পায়নি। এখনও ভয় পাইনা। কিন্তু আমার বাবার পর রফিক ভাইকে যখন পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে, তখন আমাকেও ওরা ছাড়বেনা। তাছাড়া মতিঝিলের মাওলানা কাদের হত্যা মামলার অপর স্বাক্ষী খোকন কাককুকেও ওরা হত্যার হুমকি দিয়ে চলেছে।

মুন্সিগঞ্জেরকাগজ

Comments are closed.