হংকং-সিঙ্গাপুরের মতো নগরীর স্বপ্ন দেখছে মাওয়াবাসী

padmaHK2পদ্মা সেতু নির্মাণ সামগ্রীর প্রথম চালান পৌঁছেছে ॥ আনন্দের বন্যা
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: পদ্মা সেতুর নির্মাণ সামগ্রীর প্রথম শিপমেন্টের মালামাল ‘বেন্টানাইট’ মাওয়ায় পৌঁছেছে। এ নিয়ে পদ্মা সেতুর এ প্রান্তের জনগণের মাঝে উৎসব আর আনন্দের বন্যা বইছে। পদ্মার ভাঙ্গনকবলিত মাওয়া প্রান্তের মানুষের মনে আশার আলো উঁকি দিয়েছে পদ্মা সেতুর এ মালামাল পৌছায়। দ্রুত পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলে নদী শাসনের কাজও শুরু হবে আর নদী শাসনের কাজ শুরু হলে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা পাবে এলাকাবাসী। তাছাড়া সেতু নির্মিত হলে এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থারও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান, মেডিক্যাল কলেজ, ক্রীড়া কমপ্লেক্সসহ আধুনিক নগরী। পদ্মা সেতুর পরে এখন এ এলাকাবাসী এক ধাপ এগিয়ে হংকং সিটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন এ এলাকাকে হংকং সিটির ন্যায় গড়ে তোলা হবে। এলাকাবাসী পদ্মা সেতুর মালামালের এ চালান দেখে এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে শেখ হাসিনা ঠিকই এ এলাকাকে হংকং, সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক নগরীতে গড়ে তুলবেন। যেভাবে শত যড়যন্ত্রের মধ্যে আজ বাস্তবে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, তাই এলাকাবাসী মনে করে হাসিনার পক্ষেই সম্ভব এখানে হংকংয়ের মতো সিটি গড়ে তোলা।

স্থানীয় মেদিনী মণ্ডলের বাসিন্দা মজিবুর রহমান অপু বলেন, মালামাল আনায় আমরা আনন্দিত। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। কুমারভোগের বাসিন্দা শাকিল আহমেদ বলেন, ‘পদ্মা সেতুর মালামাল আইছে শুইন্না আমাগো খুশি লাগতাছে আর সেতু অইলে (হলে) কী খুশি অইমু তা বুজাইতে পারমু না। সেতু অইলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আমাগো সব কিছুর উন্নতি অইবো।’ পদ্মা পাড়ের উত্তর মেদিনী ম-লের বাবুল মিয়া জানান, এখন মনে হচ্ছে আমার বাড়িটা ভাঙ্গনের হাত হতে রক্ষা পাবে। কারণ সেতুর কাজের সঙ্গে সঙ্গে নদী শাসনের কাজও শুরু হবে আর নদী শাসন হলে আমার বাড়িটাও আর পদ্মায় কেড়ে নিতে পারবে না।

স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ ওসমান গনি তালুকদার জানান, মালামালের চালান দেখেই বোঝা যায় সেতুর কাজ কতটুকু এগিয়েছে। এ এলাকা ভাঙ্গনপ্রবণ। ভাঙ্গনে ক্ষতবিক্ষত লৌহজংবাসী পদ্মা সেতুর নদী শাসনের ফলে রক্ষা পাবে। এ সেতু শুধু দেশের দুটি প্রান্তকে যুক্ত করছে না। বরং সেতুর দু’প্রান্তের ভাঙ্গনকবলিত এলাকাবাসীকেও রক্ষা করছে। এ এলাকার জনগণ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হংকং সিটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। তাই এলাকার জায়গা জমির দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

সাবেক হুইপ ও স্থানীয় এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে যারা যড়যন্ত্র করেছে, তারা দেশ ও জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। সকল যড়যন্ত্র পার করে শেখ হাসিনার সরকার আজ পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে। জনগণের মাঝে এতদিন যে হতাশা ছিল এ মালামাল দেখেই এলাকাবাসীর সে হতাশা কেটে গেছে। এলাকাবাসীর মধ্যে এখন আনন্দের বন্যা বইছে। নদী শাসনের কাজের প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন এ এলাকাকে হংকংয়ের মতো আধুনিক নগরীতে গড়ে তোলা। সেতু প্রান্তের এ এলাকাকে একটা পর্যটন নগরীতে রূপ দেয়া। যেখানে বিদেশী পর্যটকরাও এসে আনন্দ উপভোগ করবেন প্রকৃতির নির্মল পরিবেশে। এসব নির্মাণের পাশাপাশি এ এলাকার জনগণের ভাগ্যেরও উন্নয়ন ঘটবে। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এলাকার লোকজন পদ্মা সেতুর জন্য নিজের বাপ-দাদার ভিটেবাড়িসহ অসংখ্য বাড়িঘর ফসলী জমি ছেড়ে দেয়ায় তিনি এলাকাবসীকে ধন্যবাদ জানান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে লৌহজং উপজলোর কুমারভোগ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে চীন থেকে আমদানিকৃত পদ্মা সেতুর মালামালের প্রথম চালানটি মাওয়ায় পৌঁছায়। লৌহজংয়ের ইউএনও মোঃ খালেকুজ্জামান এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, চীন থেকে পদ্মা সেতুর আরও মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে, সেগুলোও শীঘ্রই মাওয়ায় পৌঁছবে। এছাড়া আরও মালামাল পথে রয়েছে।

পদ্মা সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল কাদের জানান, বুধবার রাতে রওনা হয়ে যথাসময়ে প্রথম শিপমেন্ট পৌঁছেছে। আরও দু’টি শিপমেন্ট চট্টগ্রাম পোর্টে রয়েছে। রবিবার দ্বিতীয় শিপমেন্টের মালামাল মাওয়ায় পৌঁছবে। এতেও টেস্টিং ইকুইপমেন্টস থাকবে। তবে চীনের সাংহাই থেকে বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) আরেকটি বড় শিপমেন্ট রওনা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় পূর্বাভাস অনুযায়ী তা তিন দিন পিছিয়েছে। ক্রেন ও বার্জসহ বড় এই শিপমেন্টের মালামাল নিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর দু’টি জাহাজ রওনা হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সড়কপথে ৬টি ট্রাকে করে ৬০ টন এ বেন্টানাইট সরাসরি মাওয়ায় আনা হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার বিকেলে চায়না মেজর ব্রিজ ও পদ্মা সেতু প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে কুমারভোগ পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন সাইটে মালামাল আনলোড করা হয়। এসআই চৌধুরী এ্যান্ড কোম্পানি (সিকো গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান)-এর পরিচালক আলী আহমদ জানান, ‘বেন্টানাইট’ এক ধরনের কেমিক্যাল জাতীয় পাউডার। এটি পদ্মা সেতুর কাজে সয়েল টেস্টের জন্য ব্যবহার করা হবে। এটি সেতু নির্মাণ কাজের মালামালের প্রথম শিপমেন্ট। তিনি আরও জানান, গত ১৮ আগস্ট সমুদ্রপথে চীন থেকে জাহাজে করে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের এসব সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে যন্ত্রপাতি ও মালামালের দ্বিতীয় শিপমেন্ট চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাবে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, প্রথম শিপমেন্টের আসার মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু কর্মযজ্ঞ আরও বেড়ে গেল। তাই সেখানকার নিরাপত্তাসহ সকল কর্মকা-ের প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় স্থানীয় প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে অংশ নিচ্ছে।

জনকন্ঠ

Comments are closed.