মিরকাদিমের গরুর খ্যাতি দেশজুড়ে

cow mirkadimএকসময়ের সেকেন্ড ক্যালকাটা খ্যাত মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম। ব্রিটিশ শাসনামলে এই মিরকাদিম ছিল বিশাল নদী বন্দর। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নাম হারায়নি মিরকাদিম। উৎকৃষ্ট মানের চাল, ডাল, গরু ইত্যাদি উৎপাদনের কারণে মিরকাদিম এখনো প্রসিদ্ধ। কোরবানির আগে এ অঞ্চলের বিশেষ জাতের গরুর কারণে দেশজুড়ে এলাকাটির নাম শোনা যায়। বিশেষত সৌখিন মানুষ যারা দর্শনীয় গরু কোরবানি দেন এসময় তাদের আনাগোনায় এ অঞ্চল সরব হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু কিনতে আসেন বিত্তশালী ও পেশাদার ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকেই মিরকাদিম বুট্টি গরু, বাজা গাভীর জন্য বিখ্যাত। এ ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় নেপালি, মণ্ডি, হাঁসা, পশ্চিমা ও সিন্ধি জাতের গরু। একসময় মিরকাদিমের প্রতিটি ঘরে ঘরে এসব বিশেষ জাতের গরু লালন-পালন হতো। কিন্তু গৃহস্থ পরিবারগুলোর সদস্যরা অধিকাংশই বিদেশ বিভুয়ে চলে গেলে গরু পালন কমে আসে। তবে এখনো কিছু পরিবার ঐতিহ্যগতভাবেই গরু পালন করে। বিশেষ পালন কৌশলের কারণে এসব গরুর গোশত যেমন সুস্বাদু হয় তেমনি এর দাম ও চাহিদাও বেশি। পুরনো ঢাকার হাটগুলোতে এসব গরুর দেখা মেলে। তবে গত কয়েক বছর ধরে পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা ঈদের কয়েক মাস আগেই মিরকাদিমে চলে যান গরু কিনতে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু পছন্দ করে কিনে ফেলেন এবং গৃহস্থদেরই ঈদ পর্যন্ত গরু পালনের দায়িত্ব ও খরচ দিয়ে আসেন। ফলে কোরবানির হাটে ওঠার আগেই অনেক গরু বিক্রি হয়ে যায়। তবে এখনো পুরান ঢাকার নামীদামি পরিবারগুলো মিরকাদিমের গরু কোরবানিকে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য মনে করেন। কোনো কোনো পরিবার এক সাথে ৮-১০টি গরুও কোরবানি দিয়ে থাকেন। তিন দিন ধরে এসব গরু কোরবানি ও এর গোশত বিলি হয়। মিরকাদিমের গরুর গোশত বিশেষ সাধের হওয়ায় বহু মানুষ এ গোশত নিতে আসেন শখের বসে।
cow mirkadim
গরু পালনকারীরা জানান, মিরকাদিমের গরুর চাহিদা অনেক। কোরবানি ঈদের কয়েক মাস আগেই তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুকনো, ছোট ও বাছাই করা গরু কিনে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে বাজা গাভী, খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরু আনা হয়। তবে এ গরুগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে এগুলোর বেশির ভাগের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা ও নিখাদ হয়। এতে প্রতিটি গরুর দাম পরে ৩০-৪০ হাজার টাকা। তারপর সেগুলোকে খৈল, ভুসি খাওয়ানো হয়। ধীরে ধীরে কোনো রকম ইনজেকশন, ওষুধ ছাড়াই শুধু খৈল, ভুসি, কুড়া, জাউ খেয়ে গরু হয়ে উঠে মোটা তাজা। কয়েক মাস লালন-পালনের পর ঈদের আগে প্রতিটি গরু এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেন গৃহস্থরা। বিক্রেতাদের দাবি একটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। যতœ নিতে হয় অনেক বেশি। ফলে এ দামে বিক্রি করেও তেমন লাভবান হওয়া যায় না। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা আমাদের বাপ-দাদার এ ব্যবসায় আছি। মিরকাদিমের গরু খামারিদের আবেদন, সরকার যদি তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিত, তাহলে ধীরে ধীরে লুপ্ত হওয়া গরুর এ ব্যবসায় এগিয়ে নেয়া যেত। একসময় সাইজুদ্দিন হাজী, কালা মিয়া হাজী, মোফাজ্জ্বল হোসেন মিরকাদিমের গরু ব্যবসায়ী হিসেবে পুরনো ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে রাজত্ব করে গেছেন বলে জানান এলাকাবাসী। এখনো পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠের গরুর হাটে মিরকাদিমের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ এসব গরু।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্যান্য অঞ্চলে বুট্টি গরু পাওয়া গেলেও মিরকাদিমের বুট্টি গরুর বৈশিষ্ট্য আলাদা। আকারে অনেক ছোট এই গরুর চেহারা দেখলেই বুঝা যাবে গোশতের সাধ কী হবে। এর বাহ্যিক অবয়ব খুব তেলতেলে ও গোলাকৃতির হয়। গোস্ত মোলায়েম ও সুস্বাদু। এ ছাড়া নেপালি গরুর উচ্চতা খুবই আকর্ষণীয়। মণ্ডি, সিন্ধি অনেক রঙের হলেও পশ্চিমা আর হাঁসা গরু সফেদ সাদা রঙের। ধবধবে সাদা এসব গরুর উচ্চতা সবচাইতে বেশি। গরুর হাটের আকর্ষণ বৃদ্ধিতে এসব গরুর চাহিদা বেশ। সিন্ধি গরুর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। সেটাও এখানে পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ আমল থেকেই গরু ব্যবসায়ীরা এখানে গরু লালন পালন করে আসছেন। একসময় প্রতিটি বাড়িতে গরু পালন করা হতো। বর্তমানে সেরকমটি দেখা না গেলেও গরু পালনের নেশাটা অনেকের মাঝেই দেখা যায়। তা ছাড়া কোরবানি ঈদে এখানকার গরুর চাহিদা ব্যাপক হওয়ার কারণে তাদের ব্যবসায়টা টিকে আছে বলে জানালেন মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহীদুল ইসলাম। তিনি আরো জানান, শিল্প কারখানা, ডালের মিল,ফ্যাক্টরি ও চালের শত শত চাতাল থাকায় এখানে গোখাদ্যের অভাব হয় না। পর্যাপ্ত খৈল ভুসি-কুড়া এখানে পাওয়া যায়। এসব কারণে গরুর লালন পালনের বিষয়টি এখনো টিকে আছে।

নয়া দিগন্ত

Comments are closed.