কেরানীগঞ্জে মুন্সীগঞ্জের একই পরিবারের চারজন খুন

keranigonjরাজধানীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমপুরের একটি ৬ তলা বাড়ির ফ্ল্যাট থেকে একই পরিবারের ৪ সদস্যের মৃতদেহ বুধবার সকালে উদ্ধার করেছে পুলিশ। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের পরিচয় জানা যায়নি। এমনকি প্রতিবেশীরা, পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা কিংবা ওই বাড়ির কেয়ারটেকারও তাদের সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছে। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে যে আলামত পাওয়া গিয়েছে তা খুনীদের শনাক্ত করতে যথেষ্ট বলেও দাবি পুলিশের।

ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান দ্য রিপোর্টকে জানান, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। লাশ দেখে মনে হচ্ছে দুই-তিন দিন আগে তাদের হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যে আলামত পেয়েছি তা খুনীদের ধরার জন্য যথেষ্ট। এ ঘটনায় দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আটক দুজন হলেন- প্রতিবেশী সিএনজিচালক আক্কাস (৪৫) ও বাড়ির কেয়ারটেকার সোহেল (৩২)।

কিন্তু ঘটনাস্থলে পুলিশ আসার আগে সাধারণ মানুষের পদচারণায় আলামত নষ্ট হয়েছে বলে আশংকা করছে সিআইডি। আবার নিহতদের সাথে আরও দুইজন সাবলেট থাকতেন বলেও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা যায়। তাদের পরিচয়ও জানেন না প্রতিবেশীরা।
keranigonj3
ওই বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দা প্রিয়া দ্য রিপোর্টকে বলেন, তারা দুই মাস আগে যখন বাড়িতে উঠেছিলেন তখন টেলিভিশন, ফ্রিজ, খাটসহ বেশকিছু আসবাবপত্র দেখেছিলাম। কিন্তু আজ (বুধবার) যখন ঐ ফ্ল্যাটের দরজা খোলা হয়েছে তখন দেখলাম ঘরে খাট ছাড়া আর কিছু নেই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা বাড়িটির নিচ তলায় একটি মুদির দোকান রয়েছে। সারা বাড়িতে লাশের পচা গন্ধ। দ্বিতীয় তলার ডান পাশের ফ্ল্যাট যেখানে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে সে ফ্ল্যাটে ঢুকতেই প্রথমে বড় একটি খালি রুম। তার ঠিক হাতের ডান পাশে বাথরুম, এর পাশে রান্নাঘর। রান্নাঘরে ছোট একটি তেলের চুলা এবং ফলস ছাদের উপর কিছু রান্না করার উপকরণ রয়েছে। তার বামপাশের ঘরটি মাঝারি আকারের। এ ঘরের ভিতর কোনো আসবাবপত্র নেই। শুধু দুটি পানির বোতল, একটি বডি স্প্রে ও একটি ফ্রিজের খালি কার্টন মেঝেতে বিছানো অবস্থায় পাওয়া যায়। শেষ যে ঘরটিতে লাশগুলো পাওয়া যায় সে ঘরের দেয়ালের সাথে খাটটি দড়ি দিয়ে বাধা রয়েছে। মেঝেতে একজন নারী, একজন পুরুষ ও দুইটি শিশুর লাশ পড়ে রয়েছে। পুরুষ লাশটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ। লাশগুলোর আশপাশে কাঁথা, বিছানার চাদর, টুকরো কাগজ ছড়ানো-ছিটানো। তবে ফ্ল্যাটের মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে বরাবর যে ঘরটি চোখে পড়বে, সে ঘরটিতেই এ মৃতদেহগুলো পাওয়া যায়। ফ্ল্যাটের মূল দরজার ছিটকিনি ভাঙ্গা ছিল না।
keranigonj2
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার টেগুরিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. বাবুল দেওয়ান ঘটনা প্রসঙ্গে দ্য রিপোর্টকে বলেন, নিহতের বাসার পাশে আমার এক ভাগ্নে থাকে। সে সকাল পৌনে নয়টার দিকে আমাকে জানায় এখানে একটি বাসায় ৪ জনের লাশ পাওয়া গেছে। পরে ঘটনাস্থলে এসে দেখি আমি আসার আগেই অনেকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করেছে। আমি দুইজন বাদে সবাইকে বের করে দিয়ে সোজাসুজি ঘরে ঢুকে দেখি খাটের উপর একটি লাশ কাঁথা দিয়ে মোড়ানো। কাঁথা সরানো পর দেখি সেটি একটি মহিলার লাশ। এরপর খাট উঠিয়ে দেখি খাটের নিচে একজন উলঙ্গ পুরুষ ও দুই শিশুর লাশ।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটি লাশের হাত, পা ও মুখ বাধা ছিল। ঘরের মেঝেতে কয়েকটি কম্বল ও কাগজের টুকরা পরে থাকতে দেখেছি। এ ছাড়াও মেঝেতে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া কয়েকটি মোমবাতির টুকরো ও বেশকিছু সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নিহত এ পরিবারটি সিএনজিচালক আক্কাসের (৪৫) বন্ধু রফিকের পরিচিত। রফিককে খুঁজে পাওয়া গেলে লাশগুলোর পরিচয় পাওয়া যাবে। তাই আমার সহায়তায় ডিবি আক্কাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে নিয়ে গেছে যাতে তারা রফিককে খুঁজে পায়।

পুলিশের কাছে আটক বাসার তত্ত্বাবধায়ক সোহেলের বরাত দিয়ে মেম্বার বাবুল দেওয়ান বলেন, নিহত শিশুদের বাবা স্থানীয় কাঁচাবাজারে পাইকারি সবজি বিক্রেতা ছিলেন। তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। দু’মাস আগে ওই বাড়িতে ওঠা পরিবারটি প্রথমে দুই হাজার টাকা ভাড়া বাবদ জমা দেন। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় মাসের ভাড়া পরিশোধ করেননি। সোহেল ভাড়ার টাকা আদায়ের জন্য এলেও ফ্ল্যাটে তালা দেখে চলে যেতেন। কারণ সোহেল এ বাড়িতে থাকতেন না। প্রতিদিন এসে পুরো বাড়ি ঝাড় দিয়ে যেতেন। সোমবার এসেও এ ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া দেখেন তিনি। কিন্তু বুধবার এসে দেখেন ফ্ল্যাটের মূল দরজায় তালা নেই, তবে বাইরে দিয়ে ছিটকিনি লাগানো এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। এরপর ভেতরে ঢুকে লাশ দেখে সবাইকে খবর দেয়। পরে আমি এসে থানার ওসিকে ফোন করি।

তিনি আরও বলেন, এ বাড়ির মালিক মো. সামছু সৌদি প্রবাসী।
keranigonj1
এদিকে, সিআইডি’র ইন্সপেক্টর (ফরেনসিক) শাহ আলম দ্য রিপোর্টকে জানান, নিহতদের মধ্যে মহিলার বয়স আনুমানিক ২৬, পুরুষের বয়স ৪০, মেয়ে শিশুর বয়স ৭ ও ছেলে শিশুর বয়স ৩ বছর। শ্বাসরোধ করে এবং যে ঘরে লাশ পাওয়া গিয়েছে সে ঘরেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। রান্না ঘরে কখনও রান্না করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ঘরের ভিতর মাদক সেবনের আলামতও পাওয়া গিয়েছে এবং ৬ থেকে ৭ জন এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত।

মহিলার লাশ খাট থেকে নামানো এবং পুলিশের আগে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা এসে দেখেছি চারটি লাশ মেঝেতে ফেলানো। যদি মহিলার লাশ খাটের উপর ও বাকি তিনটি লাশ খাটের নিচে থাকে এবং সাধারণ মানুষ আমরা আসার আগেই প্রবেশ করে তাহলে খুনের বেশিরভাগ আলামতই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই মনিরুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে জানান, ঘটনাস্থল থেকে বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা গিয়েছে। এর মধ্যে দু’টি চাবি, একটি মানিব্যাগের ভিতর ফোন নম্বর লেখা কিছু টুকরো কাগজ, একটি আইডি কার্ড, সিম ছাড়া একটি মোবাইল, একটি ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা গিয়েছে। মোবাইলের আইএমইআই নম্বর দিয়ে বের করার চেষ্টা চলছে যে এটি কে ব্যবহার করত। আইডি কার্ডটি মমতাজুর রহমান ও ড্রাইভিং লাইসেন্সটি সাজু নামে রয়েছে। এরা কারা তা বের করার জন্য কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে আমরা তদন্ত করছি।

পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তাসলিমা দ্য রিপোর্টকে জানান, দুই মাস আগে নিহতরা এ বাড়িতে ভাড়া উঠেন। কখনও তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমরাও সাধারণত কারও ফ্ল্যাটে যেতাম না। তাদেরও অন্য ফ্ল্যাটে যেতে দেখিনি। সব সময় দেখতাম ফ্ল্যাট তালা দেওয়া। তারা কি করত তাও জানি না। আর সোহেল তো এখানে থাকত না। সে এসে বাড়ি ঝাড় দিত ও ভাড়া নিয়ে যেত।

কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গতকাল (মঙ্গলবার) রাত ৮টা থেকে এ বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। শুধু এ বাড়িতে না, পুরো এলাকাতেও বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের সংযোগ ঠিক করা হয়নি।

তবে নিহতদের সাথে যে সাবলেট থাকার কথা প্রতিবেশীরা বলাবলি করছে তাদের ব্যাপারে ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাসহ কেউ কিছু বলতে পারেনি।
keranigonj
তবে এলাকার অন্যকিছু লোককে আলোচনা করতে শোনা যায় যে, এই ঘটনা তো হইতোই। বাড়ির দরজা যে রাইত পর্যন্ত খুইল্লা (খুলে) রাখা হইত।

বাড়িটি একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা জেরিন দ্য রিপোর্টকে জানান, নিহতদের কারও সাথে পরিচয় হয়নি কখনও। আমরাও যেতাম না কারণ তারা একটু নিম্ন শ্রেণীর ছিল। আমি আমার পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের ঘরে মাঝে মাঝে যাই। দ্বিতীয় তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটে ভাড়া ৫ হাজার টাকা বলে জানান তিনি।

নিচতলার মুদি দোকানদার দুলাল বেপারী দ্য রিপোর্টকে জানান, ৫ বছর ধরে আমি এখানে দোকানদারি করছি। গত দুই মাস আগে নিহতরা এ বাড়িতে এলেও ৭ থেকে ৮ দিন আগে শুধুমাত্র একবার মহিলাটি তার শিশু সন্তানকে নিয়ে আমার দোকানে চিপস্ কিনতে এসেছিলেন। এছাড়া চাল, ডাল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কোন কিছু কখনও কিনতে আসেনি। তবে যেদিন চিপস্ কিনতে এসেছিলেন সেদিন বোরকা পরা ছিলেন, তাছাড়া কখনও এ মহিলা বের হলে বোরকা পড়তে দেখিনি।

গত একবছরে এমন ৭টি অজ্ঞাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার টেগুরিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. বাবুল দেওয়ান। তিনি জানান, এর মধ্যে ২টি হত্যাকাণ্ডে কারও পরিচয় পাওয়া যায়নি। আমাদের এ এলাকার পাশে হাইওয়ে হওয়ায় এবং হাইওয়ের আশপাশে কিছু না থাকায় খুন করে দুর্বৃত্তরা লাশ এদিকে ফেলে রেখে যায়। আগের ৭টি হত্যাকাণ্ডেও একজনকে হাত-পা বাধা অবস্থায়, একজনকে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা অবস্থায়, একজন তরুণীকে গলায় বেধে গাছের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

দ্য রিপোর্ট

Comments are closed.