জাপানি মিডিয়ায় আবে’র বাংলাদেশ সফর

JAPANPMরাহমান মনি: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর জাপানি মিডিয়ায় কভারেজ না পেলেও জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বাংলাদেশ সফর এবার জাপানি মিডিয়ায় স্থান পেয়েছে। প্রভাবশালী প্রিন্ট মিডিয়াগুলো স্থানীয় জাপানি ভাষার পাশাপাশি তাদের ইংলিশ ভার্সনেও হাস্যোজ্জ্বল ছবিসহ শীর্ষ খবর হিসেবে কভারেজ করেছে। যদিও বেশকিছু পত্রিকা বাংলাদেশ সফরের সঙ্গে পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কা সফরের খবরটিও জুড়ে দিয়েছে।

জাপানের কোনো প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম বাংলাদেশ সফর না হলেও এইবারই প্রথমবারের মতো প্রথমসারির প্রায় সব প্রিন্ট মিডিয়া জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। এর আগে আরও বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশ সফর করে থাকেন, যার সর্বশেষ ইয়োশিরো মোরি (১৯ আগস্ট ২০০০ থেকে ২০ আগস্ট ২০০০) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু সে সব সফর নিয়ে জাপান মিডিয়ায় তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তেমন কোনো কভারেজ দেয়া হয়নি স্থানীয় মিডিয়াগুলোতে।

কিন্তু এবারের আবের সফর ছিল কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে। অনেকটা দেয়া-পাওয়ার মতো এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার জানানোর জন্য। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাধান্য ছিল জাপানের সমর্থনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য বিশেষ অনুরোধ এবং প্রত্যাহার করায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে কৃতজ্ঞতা জানানো। জাপানের অনুরোধে বাংলাদেশ প্রার্থিতা পদ প্রত্যাহার করায় জাপানি মিডিয়া তা ফলাও করে প্রচার করে। বিষয়টিকে আবে প্রশাসনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখছে মিডিয়া। আর এর ফলে জনজরিপে আবের সমর্থনও বেড়েছে। গত আগস্ট মাসে ৯ ও ১০ তারিখে সর্বশেষ জরিপে যেখানে আবের প্রতি সমর্থন ছিল ৫১.৮% সেখানে চলতি মাসের ৬ এবং ৭ দুই দিনব্যাপী জরিপে ৩.৯% সমর্থন বেড়ে আবের প্রতি সমর্থন ৫৫.৭% এ দাঁড়ায়।
JAPANPM
বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর করলে সফরসূচির সম্ভাব্য দিনক্ষণ ঠিক হলেই বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রচার শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে। আর সফরসূচি চূড়ান্ত হলে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক উভয় মিডিয়ায় সংবাদ শিরোনাম হিসেবে ঘোষণা হতে থাকে। অনেকটা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে কে কতটা আপডেট সংবাদ পরিবেশন করতে পারবে সেই বিষয়ে। বিমানবন্দরে সারিবদ্ধভাবে একান্ত অনুগতদের দাঁড়িয়ে থাকা এমনকি মাথাবনত অবস্থায় পদধূলি নেয়ার দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায় মিডিয়ার কল্যাণে। যদিও তারা বাসস পরিবেশিত সংবাদই প্রচার করে থাকে।

কিন্তু জাপানের অবস্থা ভিন্ন। এখানে প্রধানমন্ত্রী কোথায় গেলেন, কবে গেলেন বেশিরভাগ লোকই তা জানে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নামটি পর্যন্ত জানেন না এমন লোকের সংখ্যাও নেহায়েতই কম নয়। যারা টিভি অবলোকন করে থাকেন তারা হয়ত খবর প্রচারের কল্যাণে কিছুটা অবগত হন।

গত ৬ এবং ৭ সেপ্টেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফর করেন। ২১ ঘণ্টার এই সফর উপলক্ষে ঢাকা সেজেছিল লাল-সাদা-সবুজের সমাহারে পুষ্পিতা যৌবনা রূপে।

এর আগে গত মে মাসের শেষ নাগাদ (২৫-২৯ মে) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর করেন। সেই সময় তিনি জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং অধীর আগ্রহে ঢাকার অপেক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। শিনজো আবেও বাংলাদেশ সফরের আশ্বাস দেন। এক হিসেবে আবে তা লুফে নিয়ে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ সফরের আশ্বাস দেন।

এই লুফে নেয়ার অন্যতম কারণ ছিল অনেকটা রথ দেখে কলা বেচার মতো। কারণ ২০১৫ এবং ২০১৬ দুই বছর মেয়াদে জাতিসংঘের অস্থায়ী পদে বাংলাদেশ ছিল শক্ত প্রার্থী। জাপান হচ্ছে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। আর আগেও এ বিষয়ে জাপানের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। ১৯৭৮ সালে একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল জাপানকে। সেই সময় অত্যন্ত নবীন সদস্য বাংলাদেশের কাছে হেরে যেতে হয়েছিল জাপানকে। সেই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়ার সফল কূটনৈতিকতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় জাপান। বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে সদস্য পদ লাভ করে বাংলাদেশ শির উঁচু করে তার অবস্থানের কথা জানান দেয়।

দীর্ঘ ৩ যুগ পর আবারও একই পরিস্থিতির মোকাবেলায় পড়ে জাপান। তিন যুগ আগের ঘটনা ভুলতে পারেনি জাপান। ৩৬ বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায়নি জাপান। তাই অনেকটা আগেভাগেই নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল জাপান। কোনো কিছুর বিনিময় হলেও তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল জাপান। তাই তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম গরিব (জাপানের ভাষায়, স্থানীয় মিডিয়াগুলো তাই প্রচার করে থাকে) দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রভ্রমণের (সরকারি আমন্ত্রণ) আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষ সম্মান দিয়েছিল জাপান। জাপান অবশ্য এই প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বা নির্বাহী প্রধানকে সরকারি আমন্ত্রণ জানিয়েছে তা কিন্তু নয়। এর আগেও তারা ২০০৫ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনইচিরো কোইজুমি। কিন্তু সেই সময় জাপান মিডিয়ায় কোনো স্থান হয়নি সেই ভ্রমণের কথা। ২০১০ সালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। সেই ভ্রমণও জাপান মিডিয়ায় কোনো স্থান হয়নি। ২০১৪’র মে মাসের রাষ্ট্রীয় ভ্রমণের সময় অবশ্য একটি পত্রিকায় ভেতরের পাতায় ৬ ইঞ্চির এক কলামের স্থান নেয় খবরটি কোনো রকম ছবি ছাড়া। তবে সরকারি সফর নিয়ে নয়। জেটরোর সঙ্গে সভা নিয়ে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সব সময়ই উদাসীন ছিল এই বিষয়ে। শুধু ড. ইউনূসের জাপান ভ্রমণে তারা নড়ে বসে।

কিন্তু এবারের আবের রাষ্ট্রীয় সফর ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। মে মাসে হাসিনার জাপান সফরকালীন প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং সমর্থন নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা হয়। ফলস্বরূপ বাংলাদেশ বিশাল অঙ্কের অর্থ ছাড়ের প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়। যদিও তা ঋণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকের সৌজন্যতা। কিছু পাওয়ার বিনিময়ে কিছু দেয়া এই আর কি।

জাতীয় ম্যানার জাপানিদের বিশ্বস্বীকৃত। নিজের ভুল স্বীকার করে ৪০০ এঙ্গেলে মাথা নত করা কিংবা বিনা অজুতে একেবারে সেজদাহ্ চলে যাওয়া এবং কৃতজ্ঞতা জানানো জাপানি সৌজন্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রধানমন্ত্রী আবের বাংলাদেশ সফর ছিল তারই অন্যতম।

জাপানের প্রভাবশালী প্রিন্ট মিডিয়া জাপান টাইমস, ইয়োমিউরি সিমবুন, আসাহি সিমবুন, মাইনিচি সিমবুন, জাপান টুডে, নিহোন কেইজাই সিমবুন পত্রিকাগুলো সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ৭ সেপ্টেম্বর। সবগুলো পত্রিকা ইংলিশ এবং জাপানি উভয় ভাষায় দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকের কথা শিরোনাম করেছে। তবে প্রায় সবগুলো পত্রিকাই জাপানের পক্ষে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কথা হেডলাইন করেছে।

জাপন টাইমস, নিক্কেই এশিয়ান রিভিউর প্রধান শিরোনাম ছিল প্রায় অভিন্ন। তারা ‘জাপানের পক্ষে জাতিসংঘের অস্থায়ী পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পদ প্রত্যাহার এবং সমর্থনের কথা হেডলাইন করে।

জনপ্রিয় পত্রিকা জাপান টু বাংলাদেশ সফরের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সফরের কথাটিও জুড়ে দেয়। তারা লিখে প্রধানমন্ত্রী তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। তবে খবরের অধিকাংশজুড়েই বাংলাদেশের অংশটি প্রাধান্য পায়।

সংবাদ সংস্থা জিজি প্রেস, বাংলাদেশ প্রার্থিতা পদ প্রত্যাহার করে জাপানকে সমর্থন জানানোয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। তারা জানায়, বাংলাদেশ জাপানের অনুরোধে সাড়া দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় জাপানের আসন এখন প্রায় নিশ্চিত। এখন এই আসনটি পেতে জাপানকে আর কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না। এশিয়া তো বটেই বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য জাপানের জন্য এই আসনটি পাওয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়ায় অন্যতম শক্তিশালী জার্মানি, ব্রাজিল এবং ভারতের সঙ্গে পাশাপাশি জাপানও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার সাধনে একযোগে কাজ করে যেতে পারবে।

জাপানের জাতীয় সংবাদ সংস্থা এনএইচকে (নিহোন হোসো কিয়োকাই বা জাপান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন) গুরুত্বসহকারে সংবাদটি পরিবেশন করে। এনএইচকে তাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় (টিভি) সচিত্র চলমান সংবাদ পরিবেশন করে। এনএইচকে ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ২০টি ভাষায় তাদের রেডিও সম্প্রচার করে থাকে। যার মধ্যে বাংলা ভাষাও একটি। প্রতিটি ভাষাতেই তারা প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর গুরুত্বসহকারে প্রচার করে থাকে। বিশেষ গুরুত্ব দেয় জাপান সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়টি।

ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর মধ্যে এনটিভি, টিভি আশাহি, ফুজি টেলিভিশন, টেলিভিশন টোকিও, টিবিএস চ্যানেলগুলো চলমান সচিত্র প্রতিবেদন সম্প্রচার করে। ৬ সেপ্টেম্বর রাতের খবর এবং পরের দিন অর্থাৎ ৭ সেপ্টেম্বর সকালের খবরে তা দেখানো হয়। টেলিভিশন নিউজগুলোতে ১৪ বছর আগে মোরির সকলের কথাও উল্লেখ করা হয়।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বন্যা, যানজট, নোংরা শহর ঢাকা দেখে অভ্যস্ত জাপানিরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি সাজানো ঢাকা শহর দেখে ভড়কে যান। তারা ভিন্ন ঢাকা দেখে প্রবাসী বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন জাপানকে সমর্থন দেয়ার জন্য।

সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী আবে তার কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক বাংলাদেশে তার সফরের কথা জানান।

এর পর ৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জাপান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের আসন্ন বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা সফরের ওপর এক প্রেস ব্রিফিং করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা সফরকালীন বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

জাপান বাংলাদেশের অকৃত্রিম এবং পরীক্ষিত বন্ধু। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন থেকে জাপানি নাগরিকগণ এবং বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে জাপান সরকার বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নে বিশেষ করে যোগাযোগ খাতে অবকাঠামো তৈরিতে বিশেষ অবদান রেখে আসছে, একথা দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল জনগণ এক বাক্যে স্বীকার করে। সাপ-নেউলে সম্পর্কের বৃহত্তম দুটি রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে একে অপরকে এক হাত দেখে নিলেও প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে উভয় দল ইতিবাচক। বিষয়টি জাপানেও প্রশংসিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক এবং মনুষ্য সৃষ্টিকারী দুর্যোগে জাপান মিডিয়ায় হতদরিদ্র বাংলাদেশের সংবাদ জাপানি মিডিয়ায় প্রকাশ পেলে প্রবাসীদের হৃদয়টা যেমন ভেঙে যায়, মাথা নিচু হয়ে যায় এটাই ছিল এতদিন বাংলাদেশের ইমেজ, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, পরিপাটি ঢাকা এবং বন্ধুত্বের প্রতিদানে প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও সমর্থন জাপানে বাংলাদেশিদের প্রেরণা জুগিয়েছে, মাথা উঁচু করিয়েছে। সরকারের এ কাজে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর প্রবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে।

rahmanmoni@gmail.com
সাপ্তাহিক

Comments are closed.