ওয়াসার পদ্মা যশলদিয়া শোধনাগার প্রকল্প

wasaaজমি অধিগ্রহণ মূল্য নিয়ে অসন্তোষ
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: লৌহজং উপজেলার যশলদিয়ায় ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ‘পদ্মা যশলদিয়া’ নামের এই প্রকল্পটির জন্য ছয়টি মৌজায় ৮০ একর ৩২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির মালিকরা অভিযোগ করেছেন, অধিগ্রহণকৃত জমির ন্যায্য মূল্য থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাই মাওয়ায় কয়েক দফা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক কল্যাণ সমিতি বলেছে, এ পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তরা মাওয়া অচল করে দিবে। এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক আবুল হাসেম জানান, পাশের নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর কারণে এসব অঞ্চলের জমির মৃল্য অনেক বেশি। আগামী পাঁচ বছরে মাওয়ার পার্শ্ববর্তী এসব জমির মূল্য বেশ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বর্তমান বাজার দর না দিয়ে এই জমি অধিগ্রহণ করায় অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই এলাকার মানুষ। তিনি জানান, মালিকরা এখন হতাশ। তাছাড়া পাশের পদ্মা সেতুর অধিগ্রহণের জমির মূল্য থেকে কম দর নির্ধারণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর জন্য জমি অধিগ্রহণের সরকারি মূল্য ছাড়াও এনজিওর মাধ্যমে বাজার মূল্য অনুযায়ী অর্থ দেয়া হয় ভূমি মালিকদের। কিন্তু ওয়াসা কিছু টাকা অতিরিক্ত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তা যত সামান্য এবং সামঞ্জস্যহীন। ভূমি মূল্য বাজার দরের চেয়ে ৩/৪ গুণ কম দামে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোলাপাড়া মৌজায় জমির মূল্য এখন কম করে হলেও ৩ লাখ টাকা। কিন্তু মাত্র ৩৭ হাজার ৩শ’ ৬৭ টাকা হিসাবে দেড়গুণ কমে ৫৬ হাজার ৫০ টাকা ধার্য করা হয়েছে। এই মৌজায় অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ ২৫ একর ৬১ শতাংশ। একই অবস্থা কান্দিপাড়া মৌজায়। শতাংশপ্রতি নালজমির মূল্য বাজারদর কম করে হলেও সাড়ে ৩ লাখ টাকা। কিন্তু অধিগ্রহণমূল্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্তসহ ১ লাখ ১০ হাজার ৫৬ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই মৌজায় জমি ৩২ একর ২৬ শতাংশ। যশলদিয়া, বিলকালিয়ানী, উত্তর মেদিনীম-ল, দামলা মৌজাগুলোর চিত্রও একই। তিনি রবিবার বিকেলে বলেন, শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া না হলে মাওয়া অচল করে দেয়া হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ লিপু জানান, অন্য যে কোন স্থানের সঙ্গে এ এলাকার অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় করা ঠিক হবে না। বাস্তবতা বিবেচনা করা উচিত। তিনি জানান, পাশের পদ্মা সেতু প্রকল্পে দর বেশি দেয়া ছাড়াও পুনর্বাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে তা করা হচ্ছে না। নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত এই অঞ্চলের মানুষের শেষ সম্বল অধিগ্রহণ করায় যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। মাওয়ায় পদ্মা সেতুর জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের পর আবার একই এলাকায় এই ওয়াসার প্রকল্পটি গ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যেহেতু পাইপ দিয়েই এই পানি ঢাকায় নেয়া হবে। তাই প্রকল্পটি আরও কাছে থাকা পদ্মা থেকেই নেয়া যেত। এতে প্রকল্প ব্যয়ও কমতে পারত। একই এলাকার নদী ভাঙ্গা লোকজন বারবার এত ক্ষতির সম্মুখীন হতো না।

বিভিন্ন মৌজার বর্তমান দর, সরকারের (জেলা প্রশাসকের) অধিগ্রহণ দর এবং পরবর্তীতে ওয়াসার নির্ধারণ করা দরের তালিকা প্রদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত শহিদুল ইসলাম বলেন, এটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এনজিওর মাধ্যমে যে প্রাথমিক দর নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে কান্দিপাড়া মৌজায় অতিরিক্ত কোন অর্থই ধরা হয়নি। অন্য পাঁচ মৌজায় যে অর্থ ধরা হয়েছে তাও অনেক কম এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি জানান, ফুলকঁচি মৌজায় মাত্র এক শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই মৌজার দর সর্বোচ্চ ধরা হয়েছে। অথচ একবারে পাশের জমিগুলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মাওয়ার কাছাকাছি জমির মূল্য ধরা হয়েছে অনেক কম। তাহলে এনজিও বাস্তবতার নিরিখে কি মূল্যায়ন করল এ প্রশ্ন রেখে শহিদুল ইসলাম বলেন, খুব অন্যায় করা হচ্ছে।

বাস্তবতার নিরিখে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) নিয়োগ করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়কারী জহুরুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এই মূল্য নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। তাই এটি আবার রিভিউ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটি কাজ করছে। পদ্মার এই পানি শোধনাগারের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. আব্দুর রশিদ সিদ্দিকী জনকণ্ঠকে জানান, বাজার দর অনুযায়ী ভূমি ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করার চেষ্টা চলছে। সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছে। এতে আশা করা যায় জমির মালিকরা সন্তুষ্ট হবেন।

মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ফজলুল হক মিয়া জানান, স্থাবর সম্পতি অধিগ্রহণ ও হুকুম-দখল অধ্যাদেশ ১৯৮২ মোতাবেক তিন ধারার নোটিশ দেয়ার পূর্ববর্তী ১২ মাসের দলিলের গড় মূল্য অনুযায়ী এই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দরের আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে এটা সত্য বাস্তবে জমির দাম আরও বেশি। কিন্তু রেজিস্ট্রি খরচ কমানোর জন্য বেশি দরে জমি কিনেও কম দরে রেজিস্ট্রি করার প্রবণতার কারণেই এই অসাঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়েছে। এই সমিতির সভাপতি আমজাদ হোসেন জানান, ভূমি মালিকদের ন্যায্য দর দেয়া না হলে কঠিন কর্মসূচী গ্রহণ করতে বাধ্য হত।

এই সমিতির উপদেষ্টা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মোঃ সোলায়মান ওরফে সোলায়মান কমান্ডার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা দয়া নয় অধিকার চাচ্ছেন। জমি নিতে হলে ন্যায্য মূল্য দিতেই হবে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। তাদের যথাযথ মূল্য পরিশোধের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

জনকন্ঠ

Comments are closed.