‘জয় বাংলা’ই বঙ্গবন্ধুর স্লোগান

mohiuddinকাজী দীপু: “১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের দিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই রেসকোর্স ময়দানে যাই। বঙ্গবন্ধু জনসভা মঞ্চে উঠলেন। আমিও উঠে পিছনে দাঁড়ালাম। উপস্থিত লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান চলছিল। এক অন্যরকম পরিবেশ বিরাজ করছিল রমনার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে।”

বাংলানিউজের কথা হচ্ছিলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিফ সিকিউরিটি অফিসার ও বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ভাষণ দেওয়ার জন্য কখন মঞ্চে উঠবেন এবং ঐতিহাসিক এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কি বলবেন তা কেউ জানতো না।

মহিউদ্দিন বলেন, লক্ষ্য করলাম আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন (প্রয়াত), নূরেআলম সিদ্দিকী, সিরাজুল আলম খানসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর বঙ্গবন্ধুকে বলতে শুনলাম, ‘লিভ ইট টু মি, তোমরা আমার উপর ছেড়ে দাও।’

মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুরু করলেন ভাষণ।

ভাষণ দেওয়ার পুরো সময় তাকে কোনো কাগজ থেকে পড়তে দেখিনি। অত্যন্ত সাবলীলভাবে তিনি বলে যাচ্ছিলেন। একের পর এক সাজানো কথা ম‍ালার মতো বক্তব্য যখন দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমার মনেও সন্দেহ হচ্ছিলো- কোনও লিখিত কিছু আছে না কি? বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি বলে চলেছেন সম্পূর্ণ নিজের মতো, নিজেরই কথাগুলো।
bb b
মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, অনেক বক্তাকে দেখেছি ভাষণ দেওয়ার আগে ছোট চিরকুটে গুরুত্বপূর্ন তথ্য বা পয়েন্ট লিখে রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে তেমন কিছুই দেখিনি। আমার কাছে পুরো বিষয়টি ঐশ্বরিক মনে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর এই একনিষ্ঠ সৈনিক বলেন, পেছনে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুনছিলাম আর এক একটি পয়েন্টে শরীর শিউরে উঠছিল। যখনই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছিলেন দুই হাত তুলে তালি দিচ্ছিলাম।
Mohiuddin_911125023
(বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সেই ঐতিহাসিক ছবিতে মো. মহিউদ্দিনকে দুই হাত তুলে তালি দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।)

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্ব পাওয়া এই সার্বক্ষণিক কর্মী আগেও তার নিরাপত্তার দায়িত্বেই ছিলেন। মহিউদ্দীন বলেন, জনসভা মঞ্চে হাততালি দেওয়ার জন্য নয়, নিরাপত্তা দিতেই বঙ্গবন্ধুর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু তারপরেও বঙ্গবন্ধু যখন ধাপে ধাপে সাজানো গোছানো ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন তার সাবলীল কথাগুলো গভীর মনোযোগে শুনছিলাম আর হাততালি দিচ্ছিলাম।

মহিউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শেষ দিকে যখন বলছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তখন আমিও ভাবছিলাম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ ‘জয় পাকিস্তান’ বলে শেষ করেছিলেন এমন একটি বক্তব্য কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার এই নিরাপত্তাসঙ্গী। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, সেই দিনতো দূরের কথা বঙ্গবন্ধুকে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ বলতে শুনিনি।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরও বলেন, সেই সময়ে পাকিস্তান শাসকের কোন অবস্থানই ছিল না। বঙ্গবন্ধু যা বলতেন, সেভাবেই সবকিছু চলতো। ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকেই চলতো দেশ পরিচালনা। সেই সময়ে যে চেতনা কাজ করছিল মানুষের মনে, তখন পাকিস্তানের কোন শব্দই ছিল না। সর্বত্রই একটা পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব। এ দেশকে তখন থেকেই বাংলাদেশ বলে মনে লালন করছিল সবাই। পূর্ব পাকিস্তানও মনে করতো না কেউ।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, অনেক মানুষই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন বলেই তার কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করতে অল্প সময়ে শেষ হবার নয়, কয়েক ঘন্টা বা কয়েক দিন চলে গেলেও তা শেষ হবে না।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপরও তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযানপন করতেন। চলার পথে ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে তিনি গাড়ি থামিয়ে রাখতে বলতেন। অথচ ভিভিআইপিদের জন্য এ নিয়ম ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ওই নিয়ম মানতেন না।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানতেন তাহলে খন্দকার মোশতাক কেন, কোন ষড়যন্ত্রকারীরাই তাকে হত্যা করাতে পারত না, বলেন আবেগ আপ্লুত এই নেতা।

তিনি একটি দিনের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, একদিন গণভবন থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর মাঝ পথে বঙ্গবন্ধু গাড়ি থামিয়ে বলেন, বাবুবাজার যাও। চাউলের দাম কতো তা যাচাই করতে হবে।

এদিকে তাকে পাহাড়ারত গাড়ি অনেক দুরে চলে গেছে। বঙ্গবন্ধুর কথায় গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে দৌড়ে গিয়ে ব্যবস্থা নিতে হলো। এই সময়ে বঙ্গবন্ধু গাড়িতে একাই বসে ছিলেন একেবারে নিরাপত্তাহীন।

আবার কখোনো বলতেন, মিরপুর বস্তিতে যাব। বস্তির মানুষ কিভাবে আছে তা দেখতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে দেশের রাষ্ট্রপতি বা দেশের প্রধান তার নির্দেশতো অমান্য করার কোন অবস্থা আমার বা অন্য কারো ছিলো না।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের কারণে প্রায়ই সময়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়তো হতো।

তিনি বলেন, একদিন আমি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম স্যার, আমাকে দুইটি ওয়ারলেস সেট কিনে দিন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওয়ারলেস সেট দিয়ে তুই কি কবরি। তখন বলেছিলাম, স্যার কোথাও যাওয়ার সময় মাঝপথে মত পাল্টাচ্ছেন তখন আপনাকে অনিরাপদ রেখে ছুটতে হয়। ওয়ারলেস সেট থাকলে আপনাকে একা ফেলে দৌড়ে যেতে হবে না। বঙ্গবন্ধু তখনও আমার কথায় সাড়া দেননি।

বঙ্গবন্ধুর চিফ সিকিউরিটি অফিসার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরও বলেন, সে সময় ই. এ চৌধুরী নামের একজন এসপি ছিলেন। তাকেও ওয়ারলেস কেনার বিষয়ে জানিয়েছিলাম। একদিন এসপি ই. এ চৌধুরী আমাকে সঙ্গে নিয়ে ওয়ারলেস সেট প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে বললেন। তখন এর দাম কতো জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, ২২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে আরও বেশি দামের রয়েছে।

এ সময় ওয়ারলেস সেটের দাম শুনে ধমক দিলেন এবং বললেন আমার দেশের মানুষ না খেয়ে মরে যাচ্ছে, যুদ্ধবিধস্ত দেশ, পাকিস্তান দেশটাকে ধবংস করে ফেলে রেখে গেছে আর তুই আমার নিরাপত্তার জন্য ওয়ারলেস কিনতে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করবি।

তখন উদাহরণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু বলেন, জন কেনেডিকে মেরে ফেলেছে। তার নিরাপত্তার জন্য কতো ব্যবস্থা ছিল। কই এতো নিরাপত্তায়ও তো কেনেডিকে বাচাঁনো যায়নি। আল্লাহ যখন মৃত্যু লিখে রেখেছে তখনই আমার মৃত্যু হবে। এভাবেই ওয়ারলেসে সেট কেনার বিষয়টি বাতিল করে দেন বঙ্গবন্ধু।

মহিউদ্দিন বলেন, যে মানুষটি বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি দেশকে অঙ্কন করলেন, দেশের মানুষকে নতুন একটি দেশ উপহার দিলেন, সেই মানুষটির মনোভাব, জয় বাংলার প্রতি তার ভালোলাগা ও আত্মদান নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে, তারা দেশেরই শক্র।

জয় বাংলাই বঙ্গবন্ধুর স্লোগান, জয় পাকিস্তান নয়, বলেন মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.