বাঁধ সংস্কারে বরাদ্দ নেই নির্মাণে আছে লুটপাট

paobiবর্ষা মৌসুমে যাতে নদ-নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে জনপদ ভাসাতে না পারে সে জন্য নদীর তীরবর্তী এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নদীভাঙন ঠেকাতে নদীর তীর সংরক্ষণে প্রতিবছর অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) দেওয়া মোট বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় এ খাতে। কিন্তু সময়মতো প্রকল্পের টাকা না পাওয়া, বাঁধ ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ায় এবং নির্মিত বেড়িবাঁধ সংস্কারে কোনো টাকা বরাদ্দ না দেওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে সুফল পাচ্ছে না সরকার ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী।

পাউবোর প্রধান পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী ডি সি সূত্রধর কালের কণ্ঠকে বলেন, সারা দেশে তাঁদের বোর্ডের অধীনে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর রক্ষা বাঁধ রয়েছে। ৫৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে এখনো নতুন নতুন বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর রক্ষার কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে অনিয়মই শুধু দায়ী নয়, আমাদের দেশের মাটিও সব জায়গায় একরকম না। এ কারণেও অনেক স্থানে সামান্য পানির তোড়েই বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সব প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিকভাবে মনিটরিং এবং বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙন ঠেকাতে না পারলে স্থায়ীভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪০০ মিটার বাঁধ ভেঙে কয়েক হাজার বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারিয়াকান্দির কুর্নিবাড়ী থেকে চন্দনবাইশা পর্যন্ত মোট ছয় কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য আমরা সরকারের কাছে একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলাম দুই বছর আগে। কিন্তু সেই প্রকল্প এখনো পাস হয়নি।’ তিনি বলেন, ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারলে এখন সারিয়াকান্দিবাসীকে বন্যার দুর্ভোগ সইতে হতো না।

পাউবো সূত্র জানায়, নদীর তীর রক্ষা বা বেড়িবাঁধ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ ছাড় করা দরকার নভেম্বর-ডিসেম্বরে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে টাকা পেতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত লেগে যায়। পরে এ টাকা দিয়ে আর কাজ এগোনো যায় না। কারণ তখন বর্ষা মৌসুম চলে আসে।

পাউবোর প্রধান মনিটরিং কর্মকর্তা প্রকৌশলী নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বছর পাউবোর অধীনে মোট ৫৩টি প্রকল্পের জন্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু পুরনো বেড়িবাঁধ বা নদীর তীর রক্ষা বাঁধের সংস্কারের জন্য কোনো টাকা পাওয়া যায়নি।

পাউবোর সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান বলেন, তাঁর মতে, প্রতি তিন বছর পর পর বেড়িবাঁধ বা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধগুলো সংস্কার করা উচিত। কিন্তু এ খাতে সরকারের কোনো বরাদ্দ থাকে না বিধায় এগুলো সামান্য পানির চাপেই ভেঙে যায়।

নদীভাঙন রোধে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই কাজের কাজ কিছু হয় না। বরং দুর্নীতির কবলে পড়ে বিভিন্ন প্রকল্পের পুরো অর্থ জলে যায়। সারা দেশে প্রভাবশালী ঠিকাদাররা কাজ শেষ না করেই টাকা তুলে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে পাউবোর সাবেক এক মহাপরিচালক বলেন, নারায়ণগঞ্জে নদী খননের জন্য একটি অফিস আছে। সেই অফিসটি তিনি ঢাকায় আনার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। তিনি বলেন, সেখানে কাজ করার আগেই বিল তুলে নেওয়া হয়, কারণ ওখানকার প্রভাবশালীদের চাপ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণ করতে পারেন না। তাই কাজ শুরুর আগেই অনেক সময় তাঁরা বিল দিয়ে দেন। তিনি বলেন, এখনো অনেক ঠিকাদার আছেন, যাঁরা কাজের আগেই বিল নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করেন। তবে কাজের মান ঠিক হচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব স্থানীয় কর্মকর্তাদের।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, নদীভাঙন ঠেকাতে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময় সরকার পটুয়াখালী, ভোলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং চাঁদপুরের কয়েকটি এলাকায় ছয়টি প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু অভিযোগ আছে, নদীভাঙন রোধসহ নদী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজে জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক বেশি ফেলার কথা বলে ওই ছয়টি প্রকল্প থেকেই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে অন্তত ৮০ কোটি টাকা। আর এর পেছনের কারিগর পাউবোরই কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।

অভিযোগ আছে, পটুয়াখালীর ছোট বালিয়াতলী ও ফেরি ঘাট রক্ষা প্রকল্প থেকে ১২ কোটি টাকা, মুন্সীগঞ্জ শহররক্ষা প্রকল্প থেকে আড়াই কোটি, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট শক্তিশালীকরণ প্রকল্প থেকে ১২ কোটি, ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা শহর রক্ষা প্রকল্প থেকে ২০ কোটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর শহর রক্ষা প্রকল্প থেকে ১৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়। একইভাবে চাঁদপুরে প্রায় ২০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পাউবোর টাস্কফোর্সের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে এসব টাকা পকেটস্থ করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, গত এপ্রিলে এরকম একটি ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে পাউবোকে একটি সরেজমিন প্রতিবেদন দিয়েছেন ট্রাস্কফোর্সের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী তোফায়েল আহমদ। পরে এ অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনেও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে উপর মহল থেকে তোফায়েলকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়। এরপর থেকেই পাউবোর কোনো দুর্নীতির তথ্য বাইরে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, নিয়মানুযায়ী ডাম্পিংয়ের জন্য প্রস্তুতকৃত জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক টাস্কফোর্স সদস্যরা গণনা না করা পর্যন্ত সেগুলো নদীতে ফেলা যায় না। কিন্তু অভিযুক্ত ওইসব প্রকল্পে সেসব নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ দেখিয়ে অন্তত ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

২০০৯ সালে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন এই টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন। পাউবোর বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির বদনাম ঘোচাতেই কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৩ সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৩০।

জানা গেছে, এভাবে শুধু ছয় প্রকল্পের ৮০ কোটি টাকা নয়, প্রতিবছর এ খাতে শত শত কোটি টাকা বিভিন্নভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তুলে নেন ঠিকাদাররা।

জানতে চাইলে কাজী তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাউবোর বিভিন্ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করে বোর্ডকে রিপোর্ট দিয়েছি। এখন ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিল তা আমার জানা নেই। আর আমি মন্ত্রী মহোদায়কে কথা দিয়েছি, আমি গণমাধ্যমের কাছে কোনো তথ্য দেব না। তাই এর বেশি আর কিছু বলতে পারছি না।’ তবে মন্ত্রীর নির্দেশ পেলে তিনি গণমাধ্যমে অনেক তথ্য দিতে পারবেন বলেও জানান।

জানতে চাইলে পানিসম্পদপ্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম (বীর প্রতীক) গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে। যারা অনিয়ম করছে তাদেরকে সাসপেন্ড করে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন দ্বারা তদন্ত করাচ্ছি।’

কালের কন্ঠ

Comments are closed.