কাতারে ১০ বাংলাদেশীসহ একঘরে বন্দি ৩০ নারী

bondi1ভাগ্যগুণে ফেরা সূর্য বেগমের জবানি
সংসারে সচ্ছলতা আনতে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ভিন দেশে পা রাখতেই তাদের কপালে নেমে আসে দুঃসহ যন্ত্রণা। যে কাজের কথা বলে তাদের নেয়া হয়েছিল, সে কাজ জোটেনি তাদের। দালালরা ১০ বাংলাদেশীসহ ৩০ নারীকে দিনের পর দিন একটি ঘরে বন্দি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছে। ৫ আগস্ট মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এমনই বন্দিদশা থেকে ভাগ্যগুণে ফিরে এসেছেন মুন্সীগঞ্জের নারী সূর্য বেগম। বুধবার দীর্ঘ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। কাতারে দালালদের হাতে বন্দি থেকে বেঁচে ফেরার সেই দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনী তিনি আলোকিত বাংলাদেশকে জানিয়েছেন। কাতারে ১২ বাংলাদেশী বন্দি নারীর মধ্যে তিনি ও সিলেটের সাহের বানু ভাগ্যবান।

কারণ তারা দুজন টাকা দিয়ে দালালদের মাধ্যমে নিরাপদে ফিরতে পেরেছেন। বাকিরা এখনও কাতারে বন্দি অবস্থায় দিনযাপন করছেন। এদিকে দেশে ফিরেও দালালদের ভয়ে নিজেদের আড়াল করে রাখছেন সূর্য ও সাহের। বিদেশ ফেরত সূর্য বেগম বলেন, ১২ রোজায় মুন্সীগঞ্জের এক দালাল ও পল্টনের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে দেড় লাখ টাকায় তিনি কাতার যান। তার সঙ্গে আরও ৫ নারীও ছিলেন।

কাতার এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর সেখানে বাংলাদেশী কয়েকজন দালাল তাদের একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে ১০ থেকে ১২ ফুটের একটি কক্ষে ১২ বাংলাদেশী এবং ইন্দোনেশীয়, ভারতীয় ও নেপালিসহ ৩০ নারীকে আটকে রাখা হয়। পরে অবশ্য বিভিন্ন কারণে ওই ঘরে নারীর সংখ্যা কমতে থাকে। এক পর্যায়ে তা ১৭ জনে নেমে আসে। অবশেষে ১ মাস ৫ দিন পর টাকার বিনিময়ে তিনি ও সিলেটের সাহের বানু সেখান থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন। এখনও সেখানে ১০ বাংলাদেশী নারী বন্দি রয়েছেন।

সূর্য বেগম বলেন, আলো-বাতাসহীন ওই কক্ষে খুব সামান্য খাবার ও পানি দেয়া হতো। আধা কেজি চালের ভাত ১৭ জনকে খাওয়ানো হয়। কাজে যেতে না চাইলে শারীরিক নির্যাতন চলে। নির্যাতনে অনেক নারীই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। বন্দি নারীদের ছবি দেখিয়ে কাতারের বাসিন্দাদের ম্যানেজ করত দালালরা। ছবি দেখে পছন্দ হলে কাতারের বাসিন্দাদের বাড়িতে কাজের জন্য পাঠানো হতো।

রাতদিন দুঃসহ কাজ শেষে আবার সেই একঘরেই ফিরে আসত নারীরা। কারণ এছাড়া থাকার কোনো জায়গা ছিল না তাদের। সূর্য বেগম আরও জানান, দালালরা কাতারের বিভিন্ন স্কুলে ভালো বেতনে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে কাতারে নিয়ে যায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালরা। সূর্য দেশে ফেরার সময় সেখানে বন্দি অন্য বাংলাদেশী নারীরা তাদের স্বজনদের মোবাইল নম্বর দিয়ে তাদেরকে উদ্ধারের কথা বলেন।

সূর্য বেগম দেশে ফিরে এসে কাতারে বন্দি নাজমার বাগেরহাটে থাকা ভাই মিলনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মিলন ও সূর্য পুরো ঘটনা জানিয়ে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, বাংলাদেশী ১০ জন নারী (অবিবাহিতসহ) দালালদের মাধ্যমে কাতারে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

কাজের কথা বলে তাদের নিয়ে বিভিন্ন কাতার বাসিন্দার কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। কাতারে একটি ঘরে আটকে রেখে ইলিয়াস, মনির ও সোহেল নামে তিন বাংলাদেশী দালাল তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছে। অভিযোগপত্রে বন্দি ১০ বাংলাদেশী নারীর নাম, তাদের দালালদের নাম ও নম্বর দেয়া হয়েছে।

কাতারে বন্দি নারীরা হলেন বাগেরহাটের নাজমা, তিনি ফকিরাপুলের আল-হেরাম ট্রাভেলসের আহম্মদ ও আসলামের মাধ্যমে কাতার যান। মুন্সীগঞ্জের রীনা স্থানীয় লিটন মাতব্বরের মাধ্যমে, ময়মনসিংহের সাবিনা ও গাজীপুরের লাইলি ১২০/১ নম্বর ফকিরাপুল হারুন ম্যানশনের আবিদ এয়ার ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে, কুমিল্লার আয়শা বাচ্চু মিয়ার মাধ্যমে, নরসিংদীর জাহানারা রুজি নামে এক দালালের মাধ্যমে, মুন্সীগঞ্জের রেখা ১৩২ নম্বর ফকিরাপুলের বকশি হোটেলে নিচতলার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির ফজলুর মাধ্যমে, টাঙ্গাইলের ময়না স্থানীয় দালাল সেরলির মাধ্যমে, সিলেটের আছমা ইলিয়াসের মাধ্যমে ও কেরানীগঞ্জের নাজমা স্থানীয় কফিল উদ্দিনের মাধ্যমে কাতারে পাড়ি জমান। মন্ত্রণালয়ে দেয়া অভিযোগে কাতারে বাংলাদেশী নারীদের যেখানে আটকে রাখা হয়েছে তার ঠিকানা দিয়েছে সূর্য বেগম।

ঠিকানাটি হচ্ছে ফিউচার রিক্রুটমেন্ট, শেখ ফয়সাল আল থানি ভবন (দোতলা), অফিস নম্বর ১০, দরজা নম্বর ২, আল ইতিহাস স্ট্রিট আল গারাফা, ফোন নম্বর : ৪৪৩১৩৭২৭, ৩৩৭৭৫৭৫৮, ফ্যাক্স নম্বর : ৪৪৩১৩৭৪০। বন্দি নাজমার ভাই মিলন জানান, নাজমার সঙ্গে ফোনে তার একাধিকবার কথা হয়েছে। তাকে কাতারে পাঠায় ফকিরাপুলের আল-হেরাম এজেন্সি।

আল-হেরামের আসলাম নাজমাকে ফিরে পেতে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবার টাকা দিতে না পারায় বন্দি বোনকে মুক্ত করতে পারছেন না মিলন। তবে কাতারে বন্দি বাংলাদেশী নারীদের উদ্ধারে চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

জুবায়ের চৌধুরী = আলোকিত বাংলাদেশ

Comments are closed.