সদরের সঙ্গে গজারিয়ার যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ট্রলার!

gaz11মুন্সীগঞ্জের অবহেলিত জনপদ গজারিয়া। গজারিয়া উপজেলা দেশের একটি গুরুত্বত্বপূর্ণ স্থান হয়েও এখানে কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এখানে রয়েছে শতাধিক শিল্প কারখানা। লোকসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এরমধ্যে ভোটার ১ লাখ ৬ হাজার ১০৩ জন। ১শ’ ৩১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় হাজারও সমস্যা। এরমধ্যে যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা, গ্যাস, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সমস্যা নিত্যদিনের। ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গজারিয়া উপজেলা। ঢাকার খুব কাছে হয়েও এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। ক্ষত-বিক্ষত রাস্তার নেই কোন সংস্কার। বর্ষা এলেই নিম্নাঞ্চলে গোটা উপজেলা পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় মানুষের চরম দুর্ভোগ। মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই।

অথচ অফিস আদালত ও মামলা-মোকাদ্দমার কাজের জন্য গজারিয়াবাসীকে প্রতিদিন জেলা সদরে যেতে হয়। এর জন্য যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ইঞ্জিন চালিত নৌকা। এমনকি গজারিয়া থানার পুলিশকে আসামি আনা-নেয়াও করতে হয় ট্রলারের মাধ্যমে। ধলেশ্বরী-মেঘনা নদী পথে ট্রলারে করে ২ উপজেলাবাসীকে আসা-যাওয়া করতে হয়। জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় জেলার অপর ৪টি উপজেলায়ও গজারিয়াবাসীর যোগাযোগে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে জেলা শহরের পূর্বাঞ্চলের গজারিয়াকে মেঘনা নদী বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এতে করে জেলার ৫টি উপজেলার সঙ্গে গজারিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ এলাকার বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে গজারিয়ায় প্রবেশের জন্য ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা যাত্রী পারাপার করে থাকে।
gaz11
মুন্সীগঞ্জ সদরে আসতে গজারিয়ার ইস্মানিরচর ও হোসেন্দি বাজার এলাকা থেকে ট্রলার ছাড়ে। কিন্ত বর্ষা এলে মেঘনা উত্তাল হয়ে পড়ে। সঙ্গে দেখা দেয় ঝড়ো হাওয়া। এদিকে, গজারিয়া লঞ্চঘাট এলাকা থেকে সোনারগাঁও উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় দিয়ে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ইঞ্জিত চালিত নৌকা যাত্রী পারাপার করে। পরে অটোরিকশা ও স্কুটারযোগে জেলা শহরে পৌঁছেন যাত্রীরা। এতে যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেঘনা পাড়ি দিতে হয়। মেঘনা নদীতে মুন্সীগঞ্জ ও গজারিয়াবাসীর ফেরি ব্যবস্থা চালু করার দাবি থাকলেও তা দীর্ঘদিনেও কার্যকর হয়নি।
gaz12
নদীপথ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেকেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম ও অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে সড়ক পথে মুন্সীগঞ্জে আসা যাওয়া করে থাকেন। আবার, গজারিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে উপজেলার রসুলপুর এলাকার ফুলদী নদী। ফলে গজারিয়া উপজেলা সদর, থানা ও হাইওয়ে সড়কে যেতে ট্রলার দিয়ে পার হতে হয় গজারিয়ার জনগোষ্ঠীকে।

এলাকাবাসী জানান, বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য গজারিয়ায ২৯ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবেরচরে অবস্থিত। সম্প্রতি তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল, চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে হাসপাতালে দালাল চক্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।
gaz13
প্রতি ইউনিয়নে ১টি করে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও চিকিৎসকরা ঠিকমতো আসেন না। শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা খুবই নাজুক। ৫৫টি গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। গজারিয়া উপজেলা ৬৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৮টি কমিউনিটি স্কুল, ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬টি মাদ্রারাসা এবং ২টি মহাবিদ্যালয় রয়েছে। কিন্ত প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। শিক্ষকগণ ঠিকমতো স্কুলে আসেন না। মাধ্যমিক শিক্ষা ও মাদ্রাসায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ, আসবাবপত্রের সঙ্কট কম নয়। গজারিয়াবাসী গ্যাস থেকে বঞ্চিত। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।

গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গজারিয়ায় ২শ’ লাইন ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি উপজেলা সদরে অবস্থিত। এর গ্রাহক মাত্র ৪ জন। এই এক্সচেঞ্জটি ৫-৬ বছর আগে ডিজিটালে রূপান্তর হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এলাকার ২ শতাধিক গ্রাহক টেলিফোনের জন্য আবেদন করে বছরের পর বছর ঘুরছেন। বিদ্যুৎ-এর নতুন সংযোগ পাচ্ছেন না অনেকেই। অতিরিক্ত হারে লোডশেডিং,অতিরিক্ত বিল, হাইভোল্ট ও লো-ভোল্টে গজারিয়াবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ইউনিয়নের সমস্যা ৪০-৫০টি গ্রামে এখনও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। গজারিয়ার অভ্যন্তীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।

১৬০টি গ্রামের মধ্যে ৮০টি গ্রামে এখনও সড়ক পথের ব্যবস্থা হয়নি। এসব গ্রামবাসী উপজেলা সদরে যোগাযোগ করেন পায়ে হেঁটে। ভবেরচর থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কারের অভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন এলাকাবাসী।

মুন্সীগঞ্জবার্তা