আবেনোমিক্স : হন্তারক যখন সহপাঠিনী

japanAbরাহমান মনি: বিশ্বে সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে জাপান। জাপানিদের নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা যেকোনো জাতির জন্যই ঈর্ষণীয়, বিশেষ করে জাপানি ম্যানার হচ্ছে বিশ্ব সেরা। সহজেই নিজের ভুল স্বীকার করা এবং ধন্যবাদ জানানো জাপানি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ যেন আরও একধাপ এগিয়ে। শিশুকাল থেকেই এ শিক্ষা।

এই জন্যই বলা হয়ে থাকে যে, যার আমেরিকান অর্থ আছে, জার্মানি পোষা কুকুর আছে, চায়নিজ খাবার আছে এবং ঘরে একজন জাপানি বউ আছে সে সুখীদের মধ্যে সেরা সুখীদের একজন।

জাপানি শব্দ ওকু (ড়শঁ) যার অর্থ ভিতর বা অন্দরমহল। আর সান ব্যবহার হয়ে থাকে সাধারণত মি. বা মিসেস, মিস অর্থে। যদিও তারা প্রাণীকুলের সকলকেই শেষে সান জুড়ে দেয়। কুকুর, বিড়াল, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভাল্লুক সবাইকে সান বলে অভিহিত করে থাকে। ওকুসান (ড়শঁংধহ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গৃহকর্ত্রী বা বধূ বা অন্দরমহলের দায়িত্ব পাওয়া বিশেষ ব্যক্তি। বাড়ির ভেতর সামলানোই যার দায়িত্ব বা মূল কাজ।

আধুনিক জাপান সেই যুগ থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর জাপান এক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সর্বক্ষেত্রেই জাপানি নারীদের অংশগ্রহণ এবং অবদানে বিশ্বে আজ জাপান উচ্চাসনে আসীন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গৃহীত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যা ‘আবেনোমিক্স’ নামে পরিচিত, সেখানে নারী সমাজকে আবে বেশি কাজে লাগিয়ে বা কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল এবং জাপান পুনঃজাগরণে আরও বেশি অবদান রাখার কথা বলা হয়েছে।

সেই জাপানেই যদি টিনএজার সহপাঠিনী কর্তৃক খুন এবং পরবর্তীতে দেহ খণ্ডবিখণ্ড হতে হয় তারই বাড়িতে তখন তা আলোড়ন সৃষ্টি করে রক্ষণশীল এ সমাজে। যদিও এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তথাপি ভাবনায় ফেলেছে বিশেষজ্ঞদের। নড়েচড়ে বসেছে পুরো প্রশাসন। সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়া। গলদঘর্ম হতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের।

আণবিক বোমাখ্যাত নাগাসাকি প্রিফেকচার পুলিশ ২৭ জুলাই সহপাঠিনীকে হত্যা করার পর শিরñেদ করার অভিযোগে ১৬ বছরের এক কিশোরীকে গ্রেপ্তার করেছে। নাগাসাকির সাসেবো পুলিশ জানায়, আইওয়া মাৎসুও নামক ১৫ বছরের এক কিশোরীকে হত্যার পর নিজ গৃহে বেডের ওপর দেহ থেকে মস্তক এবং বাম কবজি বিচ্ছিন্ন করে রাখে গ্রেপ্তারকৃত কিশোরী।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কিশোরী মাৎসুওকে ভোঁতা অস্ত্র (হাতুড়ি) দিয়ে একাধিকবার মাথার পিছনে আঘাত করার পর নিস্তেজ করে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। হত্যা করার পর ধারালো ছুরি (করাত) দিয়ে দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে। এছাড়াও বাম হাতের কবজি কেটে ফেলে এবং গলা থেকে নিম্নাংশ পর্যন্ত ফেঁড়ে দেহের ভিতরের অংশ তছনছ করে।japanAb

গ্রেপ্তারকৃত কিশোরী পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে যে, সে নিজেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটন না হলেও কিশোরী জানায়, মানবদেহের ভিতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবলোকন করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। এই জন্য সে যে কাউকেই খুন করতে পারত। খুন করার কাজে ব্যবহার করার জন্য সে নিকটস্থ হোম সেন্টার থেকে হাতুড়ি, করাত, ছুরি প্রভৃতি কিনে রাখে।

২৬ জুলাই শনিবার কিশোরী তার সহপাঠিনী আইওয়া মাৎসুওকে বাসায় ডেকে আনে। মাৎসুও বাসা থেকে বের হবার সময় মাকে বান্ধবীর বাড়ি যাবার কথা বলে যায় এবং সন্ধ্যার পর ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়। কিন্তু রাত ১১টা বাজার পরও ফিরে না আসলে মাৎসুওর মা কিশোরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে যথাসময়ে ফিরে গেছে বলে জানায়। সন্তান ফিরে না আসায় বিচলিত অভিভাবক স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনে অবহিত করেন।
অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ে এবং সর্বশেষ অভিযুক্ত কিশোরীর সঙ্গে দেখা গেছে বলে নিশ্চিত হয়। সেই অনুযায়ী পুলিশ কিশোরীর গৃহে হাজির হয়।

সাসেবো পুলিশ অভিযুক্ত কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করলে মাৎসুও যথাসময়ে চলে গেছে বলে জানায় এবং তড়িঘড়ি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তার কথাবার্তায় স্বাভাবিকতা থাকলেও বডিল্যাঙ্গুয়েজ কিছু একটা লুকোবার চেষ্টা করছে বলে পুলিশের সন্দেহ হলে পিছনের দিক থেকে অনেকটা জোরপূর্বক গৃহে প্রবেশ করলে বেডের ওপর মাৎসুওর খণ্ডবিখণ্ড মৃতদেহ দেখতে পায়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কিশোরীকে আটক করে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় পুলিশ কিশোরীর নাম প্রকাশ করেনি আইনি জটিলতার কারণে। ছবিও নয়।

কিশোরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এই প্রথম নয়। এর আগেও সে বিভিন্ন অস্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী (৬ষ্ঠ শ্রেণী, ১২ বছর) সে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহকৃত (স্কুল থেকে) লাঞ্চের সঙ্গে ব্লিচিংসহ বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে দিত। ছোট ছোট প্রাণী হত্যা করে দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে রাখত। এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে সর্বশেষ একটি বিড়াল হত্যা করে দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে মুণ্ডুটি তার ফ্রিজে রেখে দেয়। পুলিশ তা উদ্ধার করে।

জুনিয়র হাইস্কুলে পড়াকালীন (নবম শ্রেণী, ১৫ বছর) সময়ে সে বেসবলের ব্যাট দিয়ে জন্মদাতা পিতাকে আক্রমণ করে। এইজন্য তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক বিভিন্ন কেস স্টাডি করে তাকে বিপজ্জনক অভিহিত করে ‘যদি এভাবে ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে যে কাউকেই খুন পর্যন্ত করে বসতে পারে’। এ জন্য তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেন। এবং প্রিফেকচার কর্মকর্তাদের তা অবহিত করেন জুন ২০১৪তে। কিন্তু কর্মকর্তারা সে সময় কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন।

২০১৩ সালে তার মা দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে এ বছর এপ্রিল মাসে তার বাবা আবার বিয়ে করেন। এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিশোরীকে একা থাকার জন্য ভিন্ন একটি বাসা নেয়া হয়। গত এপ্রিল মাস থেকে সেখানে সে থাকা শুরু করে। ধৃত হবার সময় তার বাসা থেকে দশ লাখ ইয়েন উদ্ধার করা হয়। পিতার আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ব্যয়ে কোনো কার্পণ্য করা হতো না। পিতাই তা বহন করতেন।

কিশোরী তার সৎমাকে জানিয়েছিল যে, সে জীবজন্তু হত্যা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছে, তাই আর জীবজন্তু নয়, এবার সে মানুষ হত্যা করতে চায়। সৎমা হিসেবে মেনে নিতে না পারায় এই সব বকছে বলে সৎমা তাকে স্বাভাবিক হওয়ার পরামর্শ দিতেন। কোনো প্রকার কর্ণপাত করতেন না। এমনকি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পূর্বদিন অর্থাৎ ২৫ জুলাই মনোচিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিন্তু স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় সেইদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়ে ওঠেনি। সেও কিছুটা বুঝতে পেরেছিল যে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো মানসিক রোগীই নিজেকে তা ভাবে না তাই কিশোরী নিজেও তা ভাবতে পারেনি। আর তারই ফলশ্রুতিতে সহপাঠিনীকে ডেকে এনে নিজ বেডে খুন করে দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে মানবদেহ সম্পর্কে নিজ কৌতূহল নিবৃত করার হীন চেষ্টা করে।

এ ঘটনাটি জাপানে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বড় হয়ে ওঠার তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
কিশোরীর পিতা এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমার কন্যার কৃতকর্মকে কখনো ক্ষমা করা যায় না। সে যে কাজ করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। এজন্য আমি দুঃখিত এবং লজ্জিত।’

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.