তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজও জমা হচ্ছে না

pinakDমাওয়ায় লঞ্চডুবি : আরেক দফা সময় বাড়ানোর হচ্ছে
মাওয়া লঞ্চডুবি তদন্ত কমিটির দ্বিতীয় দফা সময় শেষ হচ্ছে আজ বুধবার। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট জমা হচ্ছে না। বরং আরেক দফা সময় বাড়ানো হচ্ছে। আইনী জটিলতার কারণে গ্রেফতারকৃত লঞ্চ মালিক ও তার পুত্রের স্বাক্ষী গ্রহন করতে না পারায় এই সময় বাড়ানো হচ্ছে।

সাত সদস্য বিশিষ্ট সরকারের এই তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব নুর-উর-রহমান নৌ পরিবহন মন্ত্রণালযের সচিব বরাবর সময় বৃদ্ধির এই যুক্তি তুলে ধরে আবেদন করেন। এদিকে লঞ্চ মালিক সমিতির মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা কাওড়াকান্দির দু’জন ও কাঠাঁলবাড়ি লঞ্চ ঘাটের দু’জন এই চার জনের স্বাক্ষ্য গ্রহন করা হয়েছে মঙ্গলবার। এই নিয়ে তদন্ত কমিটি ৩৫ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহন করেছে। ঢাকার সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে দেশের একমাত্র মেরিন কোর্টে লঞ্চ মালিক আবু বক্কর কালু ও তার পুত্র ওমর ফারুক লিমনকে হাজির করা হলে আদালতটির অনুমতি প্রাপ্তি সাপেক্ষে স্বাক্ষ্য গ্রহন করা হবে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জনকণ্ঠকে জানান, গ্রেফতারকৃত লঞ্চ মালিক আবু বক্কর সিদ্দিক কালুর স্বাক্ষ্য নেয়া জরুরি। তাই জেলগেটে জিঞ্জাসাবাদের জন্য মুন্সীগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত ১৪ আগস্ট আবেদন করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্যতিত অন্য কারও জিঞ্জাসাবাদে অনুমতি দেয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই বলে জানিয়েছেন আদালতটির বিচারক। তাই আইনী জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বিকল্প হিসাবে আইন অনুযায়ী মেরিন কোর্টে স্বাক্ষী নেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মেরিন কোর্টে দায়ের করা আরেকটি মামলায় লঞ্চ মালিকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই প্রডাকসন ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। এই ওয়ারেন্ট লৌহজং থানায় যাচ্ছে। লৌহজং থানা থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলা খানায় পোছলেই তাদের মেরিন কোর্টে পাঠানো হবে। বৃহস্পতিবার ওয়ারেন্টটি ইস্যু হলেও মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত তা লৌহজং থানায় পৌছেনি বলে জানিয়েছেন ওসি মো. তোফাজ্জল হোসেন।

তদন্ত কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘এই নিয়েই সমস্যা হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ কারাগারের জেলার আমাকে বলেছিলেন-ওয়ারেন্টটি ফ্যাক্স করে দিন আসামী মেরিন কোর্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। কিন্তু মেরিন কোর্ট বলছে ওয়ারেন্ট ফ্যাক্সে পাঠানো যাবে না বিশেষ বাহক দিয়েও নয় যথা নিয়মেই যাচ্ছে।’

সাইফুর ইসলাম আরও জানান, ইনল্যান্ড শিপিং অডিনেন্স ১৯৭৬ এর ৪৫ (৩) ধারায় এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেহেতু আইন মোতাবেক সরকার তদন্ত কমিটিটি করেছে, তাই মামলার বাইরেও এই তদন্তে যাদের দায়িত্ব অবহেলা এবং দোষী সাবস্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে এই কমিটি সাবলিমেন্ট কেস করতে পারবে। তাই সরকারের এই কদন্ত কমিটির রিপোর্টটি অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পরের দিন ৫ আগস্ট লৌহজং থানায় ফৌজদারী আইনে ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন ৪ আগস্ট মেরিন কোর্টে পাঁচ জনের (লঞ্চ মালিক পুত্র ওমর ফারুক লিমন ব্যতিত বাকীরা) বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয়। এই মামলার বাদী হয়েছেন সমুদ্র পরিবহনের চীফ ইসন্সপেক্টর সফিকুর রহমান।

এদিকে দুর্ঘটনার দিন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর তাদের সার্ভেয়ার ড. এস এম নাজমূল হকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সরকার যেহেতু উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে তাই বৈঠকে করে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি বাতিল করে। তাই পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনায় একমাত্র সরকারের তদন্ত কমিটিই কাজ করছে। ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর ইসলাম জানান, শুধু স্বাক্ষ্য গ্রহনের মধ্যেই এই তদন্ত সিমাবদ্ধ নেই। নথীপত্র, রেজিস্ট্রেশন, সার্ভে সনদ, আবহাওয়া রিপোর্ট, নদীর ঢেউ, লঞ্চের নকসা সংশ্লিষ্ট সবই পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারা কারা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে তা সবই সুষ্ঠুভাবে সনাক্ত করা হচ্ছে। কমিটির সদস্য বুয়েটের শিক্ষক প্রকৌশলী গৌতম কুমার সাহা নক্সায় ত্রুটি কাজ করছেন।

তবে লঞ্চটি উঠাতে পারলে টেকনিক্যাল অনেক কিছু পাওয়া যেত। অনুমোদিত নক্সা অনুযায়ী লঞ্চটি বাস্তবে মিল ছিল কিনা। এই সাত সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের এই তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব নুর-উর-রহমান ছাড়া অন্য দস্যরা হচ্ছেন- বুয়েটের শিক্ষক প্রকৌশলী গৌতম কুমার সাহা, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ম্যাজিষ্ট্রেট সাইফুল হাসান, বিআইডব্লিউটিএ’র ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ, বিআইডব্লিউটিসির প্রতিনিধি আব্দুল রহিম তালুকদার ও মুন্সীগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো.নজরুল ইসলাম সরকার এবং কমিটির সদস্য সচিব সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও সার্ভেয়ার ক্যাপটেন জসিম উদ্দিন। উল্লেখ্য গত ৪ আগস্ট মাওয়ায় পিনাক-৬ ডুবে যায়।

এ দুর্ঘটনায় ৪৯ জন যাত্রীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। সরকারি হিসাবে এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৬১ যাত্রী। পর দিন ৫ আগস্ট রাতে “অধিক মুনাফার আশায় ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বেপোরোয়া লঞ্চ চালিয়ে অবহেলাজনিত নরহত্যার” অপরাধে ছয় জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। পলাতক অপর চার আসামী হচ্ছে- লঞ্চের পুরনো মালিক (কাগজেপত্রে এখনও যিনি মালিক) মনিরুজ্জামান খোকন, সারেং (মাস্টার) গোলাম নবী, সুখানী (গ্রিজার) ছবদর হোসেন মোল্লা ও কাওড়কান্দি ঘাটের ইজারাদার আব্দুল হাই শিকদার।

জনকণ্ঠ