সবই নিয়ে যাচ্ছে পদ্মা!

munshigonj1বৃদ্ধ সুফিয়া বেগম বাড়ির আঙিনায় বসে সর্বগ্রাসী পদ্মার দিকে অপলক তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। একসময় তিনি ছিলেন কুমারভোগ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। কত অসহায়ের সহায় হয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজেই বড় অসহায়। সর্বগ্রাসী পদ্মা তাঁর নিজের বাড়িই নিয়ে গেছে। অথচ এ বাড়িকে ঘিরে তাঁর সারা জীবনের কত স্মৃতি জড়িত। স্বামীর ভিটে ছেড়ে যেতে একদম মন চায় না তাঁর। তাই হয়তো বাড়ি হারানো সুফিয়া পদ্মার পাড়ে বসে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। সুফিয়ার মতো শেখ মো. আবুলেরও একই অবস্থা। পদ্মার ভাঙনের শিকার হয়ে ঘর-দুয়ার সরিয়ে নিয়েছেন। শিমুলিয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম আর শেখ আবুল এখন আশ্রয় নিয়েছেন কুমারভোগের সড়কে।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের পদ্মা নদী আবারও ভাঙনের মুখে। মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে কুমারভোগ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও পাশের শিমুলিয়া বাজার, খড়িয়া ও শিমুলিয়া গ্রাম পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনে আতঙ্কিত ওই সব এলাকার লোকজনের রাতের ঘুম এখন হারাম হয়ে গেছে।

সরেজমিন পদ্মাপারের শিমুলিয়া ও খড়িয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির প্রবল স্রোত আর উত্তাল ঢেউয়ের কারণে বেশ কয়েক দিন ধরে পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে লৌহজংয়ের পদ্মা সংলগ্ন গ্রামগুলোতে। রবিবার রাতে লৌহজংয়ের কুমারভোগ ইউনিয়নের শিমুলিয়া বাজারের পূর্বপাশের খড়িয়া গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। তাতে তলিয়ে গেছে বহু বাড়িঘর আর স্থাপনা, কুমারভোগ ইউনিয়ন পরিষদের অংশবিশেষ, বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ভাঙনের মুখে রয়েছে। যেকোনো সময় কুমারভোগ ইউপি ভবনটি পদ্মায় বিলীন হয়ে যেতে পারে। ভাঙনরত এলাকায় চলছে ঘরবাড়ি সরানোর কাজ। লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে খড়িয়া গ্রামের আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষ।

শিমুলিয়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সুফিয়া বেগম বলেন, ‘এই বাড়িটার সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়াইয়া আছে। যখন মেম্বার আছিলাম, তখন কত মানুষ এই বাড়িডায় আইতো। মনডা চায় না বাড়িডা ছাইড়া যাই। কিন্তু রাক্ষুসী কি আমারে ছাড় দিবো? বাপ-দাদার ভিটেমাটির শেষ সম্বলটুকুও হারাইলাম। একদিকে নদীর উৎপাত, আরেক দিকে ভাঙা কপাল। থাকার জায়গা নাই, টেকা নাই, ঘর বানামু কি দিয়া। ১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা ইউপি সদস্য ছিলেন তিনি। বয়সের ভারে তিনি এখন অনেকটাই কাবু।

সুফিয়ার মতো অন্তত ৩০টি পরিবার গত পাঁচ দিনে বসতভিটা হারিয়েছে। গত কয়েক দিনের নদীভাঙনে লৌহজংয়ের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদীর তীরবর্তী লৌহজংয়ের কুমারভোগ গ্রামের খড়িয়া, নয়াবাড়িসহ ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে এসব এলাকার সহস্রাধিক পরিবার।

খড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম জানান, পদ্মা সেতু শিগগিরই হবে শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম যে মাওয়া থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে এই কুমারভোগের খড়িয়া গ্রাম। এখানে সেতু রক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে রক্ষা করা হবে পদ্মার তীরবর্তী এ গ্রামগুলো। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, অবিলম্বে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য সেতু রক্ষা বাঁধের কাজটি সম্পন্ন করা হোক। তবেই ভাঙনের কবল থেকে কুমারভোগ ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম রক্ষা পেতে পারে।

কালের কন্ঠ