‘আমি অহন কেমনে কিস্তির টাহা দিমু’

mawagসরেজমিন : মাওয়াঘাট
মাসুদ খান: ‘কোনোমতে জানে বাইচ্চা আইছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার হোডেলডারে পদ্মায় গিল্লা হালাইল। পাঁচ-ছয় লাখ টাহার মালামাল ছিল ভিতরে। কিছুই বাইর করতে পারি নাই। কয়েকবার ভাঙ্গনের পর এহানে আইয়া কিস্তিতে টাহা নিয়া হোডেল করছিলাম। অহন আমি কিস্তির টাহা দিমু কিবাবে। পোলাপানের লেহাপরারই বা কী অইবো।’ মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া ফেরিঘাটে মঙ্গলবার রাতে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়া হোটেল মালিক সেকান্দার সর্দার এভাবেই বিলাপ করছিলেন। সেকান্দার সর্দার জানান, ইতিপূর্বে তিনি আরো তিন দফা ভাঙনের শিকার হয়েছেন। বছর দুই আগে মাওয়া পুরনো ফেরিঘাট এলাকার তিন নম্বর রো রো ফেরিঘাটে তাঁর হোটেলের ব্যবসা জমজমাট ছিল। সেই হোটেলটি পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। পরে একটি এনজিওর কাছ থেকে কিস্তিতে সাত লাখ টাকা নিয়ে আবারও মাওয়ার এ ঘাটে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। এখানেও ভাঙনের ফলে দুই দফা হোটেলটি স্থানান্তর করতে হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে তাঁর হোটেলটি গ্রাস করে পদ্মা। পাশের ঘরটি আকস্মিক পদ্মায় ডেবে গেলে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। দেখতে দেখতে তাঁর হোটেল ঘরটিও পদ্মা গিলে নেয়। হোটেলের ভেতর ফ্রিজ-টিভিসহ পাঁচ লক্ষাধিক টাকার মালামাল ছিল। কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তিনি। সেকেন্দার আরো জানান, তাঁর তিন ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ালেখা করছে। পদ্মায় সব কিছু হারিয়ে এখন তিনি সংসার খরচের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
mawag
মাওয়া ঘাটের চায়ের দোকানি সোহেল খাঁ কান্নারত অবস্থায় বলেন, ‘আগে পুরনো ফেরিঘাটের দুই নম্বর ঘাটে আমার দোকান আছিল। সেখানে ভাঙনের পরে তিন নম্বর রো রো ফেরিঘাটে দোকান দেই। এইহানেও ভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন এই ঘাটে আইসা চায়ের দোকান দেই। কিন্তু পদ্মা আমার পিছ ছাড়লো না। এইহান থেইকাও আমারে তাড়াইয়া দিল। এহন আমি ঋণের কিস্তি দিমু কেমনে? এত ঋণ আমি কিবাবে সোধামু?’

সেকান্দার আর সোহেলের মতো মঙ্গলবারের পদ্মার ভাঙনে অনেক দোকানিই নিঃস্ব হয়ে গেছে। ৬০ জন দোকানি তাদের দোকান ঘর সরিয়ে নিয়েছেন ভাঙনের কবলে পড়ে। এ অবস্থায় এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকগুলো এখন তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে। ক্ষতিগ্রস্তরা মনে করে, বিপদের এ সময়ে সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে।

ফেরি সার্ভিস চালু সীমিত আকারে
ঘাটে আকস্মিক ভাঙনে মাওয়া-কাওড়াকান্দি ফেরি সার্ভিস ১১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল বুধবার সকালে সীমিত আকারে চালু করা হয়েছে। তবে রো রো ফেরি চলাচল এখনো বন্ধ রয়েছে। কে-টাইপ ও টানা ফেরিসহ আটটি ফেরি চলাচল করবে উল্লেখ করে বিআইডাবি্লউটিসির ম্যানেজার সিরাজুল হক জানান, আপাতত কোনো ট্রাক পারাপার করা হবে না। দুই পাড়ে এখনো পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে পাঁচ শতাধিক যানবাহন। এদিকে তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে ওই রুটের ৩৫টি ছোট লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় লঞ্চঘাট থেকে রো রো ফেরি শাহ আলী শুধু যাত্রী পারাপার করছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে পদ্মার আকস্মিক ভাঙনে মাওয়া ৩ নম্বর রো রো ফেরিঘাট থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় ৪০ ফুট এলাকা পদ্মায় তলিয়ে যায়। এ অবস্থায় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দেশের প্রধান ওই ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল বুধবার সকালে মাওয়া ঘাট পরিদর্শন শেষে দ্রুত ফেরি সার্ভিস স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

মন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বলেন, আপৎকালীন অবস্থায় মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সব রকম চেষ্টা চলছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রো রো ফেরিঘাট পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সকাল ৮টা ২২ মিনিটে কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে ফেরি ডাপলু ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ফেরি আবারও চলাচল শুরু হয়। পরে ফেরি লেন্টিং ও ফেরি থোবাল যানবাহন নিয়ে মাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। বিআইডাব্লিউটিসির মেরিন অফিসার আহম্মদ আলী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি সাত সেন্টিমিটার বেড়ে এখন বিপৎসীমার মাত্র ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী এখন উত্তাল। সার্বিক বিবেচনায় রো রো ফেরি পন্টুনটি মাওয়া ২ নম্বর ঘাটে স্থাপনের চেষ্টা চলছে।

কালের কন্ঠ