ফের তীব্র গ্যাস সংকট শিল্পাঞ্চলে হাহাকার!

gas8গ্যাস সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। কলকারখানায় এ সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। গাজীপুর, আশুলিয়া, সফিপুর, কোনাবাড়ি এলাকার মিলকারখানাগুলোতে চলছে হাহাকার। শহুরে গৃহিণীদের রান্নাবান্নার কাজেও চলছে ভোগান্তি। উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় চোখের পানি ফেলছেন মালিকরা। উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা। মিলকারখানার চাকা না চলায় বেতনভাতা বন্ধ হওয়ার ভয়ে তারা তটস্থ।

হঠাৎ এমন সংকট জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকেও পেছনে ফেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য, তাহলে গ্যাস উৎপাদন নিয়ে সরকারের হাকডাক কি মিথ্যা! শত মিলিয়ন ডলার খরচ করে বসানো কমপ্রেসার ৯ বছরেও চালু করতে না পারার কারণও রহস্যজনক। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলেছে, এ সংকট সাময়িক। ২ মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, দেশব্যাপী এখন গ্যাস সংকট চলছে। ৫০ দিনের বেশি বন্ধ থাকার পর যমুনা সার কারখানা আবার চালু হয়েছে। সেখানে দৈনিক সাড়ে ৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও আগের চেয়ে বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আশুগঞ্জে স্থাপিত কমপ্রেসারটির ট্রায়াল শেষ হয়নি। এলেঙ্গার কমপ্রেসারটিও চালু হয়নি। তবে আস্তে আস্তে বিদ্যুতের চাহিদা কমে এলে এবং আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গার কমপ্রেসারটি চালু হলেই সংকট সমাধান হবে।

কিন্তু কারখানা মালিকরা বলছেন, এটা খোঁড়া যুক্তি। সার কারখানা চালানোর কথা বলে আরেক সেক্টরকে পঙ্গু করে দেয়ার অর্থ কি? শিল্পকারখানা বন্ধ হলে মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বেকার হবেন শ্রমিক কর্মচারী। এতে আন্দোলন হবে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে। পাশাপাশি উৎপাদন কমে গেলে যথাসময়ে পণ্য রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। আস্থার সংকটে পড়বে। বায়াররা অন্য দেশে চলে যাবেন।

তারা বলেছেন, গ্যাসের যে চাহিদা, হঠাৎ তার এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান। আবার অনেক কারখানা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না বরং বিদ্যমান উৎপাদন বিপর্যয় ঠেকাতেই হিমশিম খাচ্ছেন শিল্পপতিরা। তাদের বক্তব্য, একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কম। দুই মিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ঢাকার পার্শ^বর্তী সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, কোনাবাড়ি, সফিপুরের অবস্থা খুবই খারাপ। টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের শিল্পএলাকার চিত্রও এক। এসব এলাকায় গত এক মাসে তৈরি পোশাক, কম্পোজিট টেক্সটাইল, পাট, স্টিল, রি-রোলিং, সিমেন্টসহ শত শত ছোট-বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ কারখানার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন মালিক-শ্রমিকরা। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা এক-চতুর্থাংশ গ্যাসের চাপ থাকে না। বাধ্য হয়ে পুরো সময়টাই কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

নাজমুল আনাম নামে কোনাবাড়ি এলাকার একজন শিল্প উদ্যোক্তা জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে এ এলাকার ৩০-৩৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন গত এক মাস ধরে প্রায় বন্ধ রয়েছে। কিছু অংশ চালানো সম্ভব হলেও গত ১ আগস্ট থেকে গ্যাসের প্রেসার ৩-৪ পিএসআইয়ে নেমে আসা শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এ ব্যাপারে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা করছেন বলে তিনি জানান।

সফিপুর এলাকার একজন গার্মেন্ট মালিক জানান, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ কোনো নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে গ্যাসের প্রেসার কমিয়ে দেয়ায় মিলগুলো উৎপাদনে যেতে পারছে না। চলতি মাসের শুরু থেকেই গ্যাসের পরিস্থিতি আরও নাজুক। এ ব্যাপারে মাজহারুল স্পিনিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহারুল হক বলেন, ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শিল্পকারখানা গড়েছেন। উৎপাদন বন্ধ থাকলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন কি করে।

গ্যাস সংকট ও গ্যাসের প্রাচুর্য নিয়ে বাংলাদেশে নানা কথা রয়েছে। কোনো কোনো জরিপে এমনও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপরে ভাসছে। তা হলে গ্যাস সংকট কেন- এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। গ্যাস উত্তোলনে প্রয়োজনীয় ব্যয় ও দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। জ্বালানি সেক্টরগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করা হচ্ছে না। অদক্ষদের দিয়েই চলছে পেট্রোবাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে মূলত গ্যাসের কোনো সংকট নেই। যা আছে সেটা কৃত্রিম। এটা দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার অংশ হিসেবেই এ ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে হর-হামেশা। এ কাজে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যায় করছে ষড়যন্ত্রকারীরা। সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক রাঘববোয়াল জড়িত আছে এদের সঙ্গে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা ২ হাজার ৭০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে এখন গড়ে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি তাদের গ্যাস উত্তোলন-সামর্থ্য আরও বেশি। বিভিন্ন স্তরে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহকৃত এ গ্যাস দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭৫ শতাংশ পূরণ করছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪২, শিল্পকারখানায় ২০, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৬, বাসাবাড়িতে ১২, সার উৎপাদনে ৭, সিএনজিতে ৫ এবং বাণিজ্যিকভাবে ২ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী এই বিভাজনে ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না। শিল্প উদ্যোক্তাদের বক্তব্য ঠিকমতো উৎপাদন না হলেও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে তাদের। আর তাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। খেলাপি ঋণের বিষয়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্দর থেকে পণ্য খালাস করা থেকে শুরু করে তা গুদামজাত করাসহ অন্যান্য ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় উদ্যোক্তাদের। এর মধ্যে গ্যাসের সংকট তাদের ঋণ হিসাবকে খেলাপি করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

গ্যাস খাত উন্নয়ন চিত্রে গরমিল : মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির হিসাবে ব্যাপক গরমিল দেখা গেছে। শুধু তাই নয় খননকৃত কূপের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করছে পেট্রোবাংলা। বিশেষষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোবাংলার হিসাবে অনেক মনগড়া তথ্য রয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে পুরনো কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলেও খননকৃত কূপের সংখ্যায়ও সেগুলো দেখানো হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার বিভিন্ন নথিপত্র থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত মহাজোট সরকারের সময়কালে পেট্রোবাংলার সাফল্য নামে বুকলেটের গ্যাস উৎপাদন অংশে উল্লেখ করা হয়, পুরনো বন্ধ কূপ ওয়াকওভার (সংস্কার), নতুন উন্নয়ন কূপ ও অনুসন্ধান কূপ করে প্রকৃত উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে ৭৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বলা হয়, সাঙ্গু ও বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রসহ কয়েকটি ক্ষেত্রের কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রতিদিন ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

একই বুকলেটের এক নজরে গ্যাস সেক্টর অংশে উল্লেখ করা হয়, প্রকৃত গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিও পরিমাণ ৫৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এখানেই ৩ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি দেখানো হয়। নতুন স্ট্রাকচার চিহ্নিত করার কথা বলা হয় ৫টি। এ ছাড়া নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ২টি, অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা ৭টি, উন্নয়ন কূপের সংখ্যা ১৯টি এবং ওয়াকওভার কূপের সংখ্যা ১৭টি। সব মিলিয়ে বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের ৪৩টি কূপের কাজ করার কথা উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু একই বছরের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পেট্রোসেন্টার ও তিতাস ভবনের সামনে লাগানো বিলবোর্ডে বলা হয় খননকৃত কূপের সংখ্যা জোট সরকারের আমলে ১২টি এবং মহাজোট সরকারের আমলে ৪৪টি। সেখানে আরও বলা হয়, জোট সরকারের আমলে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিও পরিমাণ ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং মহাজোট সরকারের আমলে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ৮৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে গ্যাসের উৎপাদনে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি দেখানো হয়। আর খননকৃত কূপের সংখ্যায় একটি বেশি উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ পেট্রোবাংলা পরিদর্শনে এলে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, মহাজোট সরকারের আমলে ৩৮টি কূপ ও মুচাইয়ে স্থাপিত কম্প্রেসারের মাধ্যমে ৮৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ করা হয়েছে। এতে এনওসি (ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি) ও আইওসি (আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি) মিলে মোট ৩৮টি কূপের কথা বলা হলেও মাত্র ২৯টি কূপ গ্যাস উৎপাদনের বিবরণ দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় পেট্রোবাংলা যে হিসাব দিয়েছে তাতেও গরমিল ছিল। তারা বলেন, ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে পেট্রোবাংলা ওয়াকওভার কূপ বা সংস্কারকৃত কূপের সংখ্যা ১৭টি উল্লেখ করলেও জানুয়ারি মাসে পেট্রোবাংলা সংস্কারকৃত কূপের সংখ্যা ১২টি উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে উন্নয়ন কূপের সংখ্যা ১৯টি বললেও জানুয়ারি মাসে সাতটি কমিয়ে দেখানো হয়েছে মাত্র ১২টি। আর মহাজোট সরকারের গ্যাস খাত উন্নয়নের বিলবোর্ডে ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি গ্যাস উৎপাদন দেখানো হয় জানুয়ারি মাসে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম গ্যাস খাতের হিসাব প্রসঙ্গে বলেন, পেট্রোবাংলার হিসাব সকাল-বিকাল বদলায়। পেট্রোবাংলা নতুন লেয়ার পেয়ে নতুন স্ট্রাকচার পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে বলে জানান তিনি। বলেন, তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের কথা বলেছে পেট্রোবাংলা। এখনও কিন্তু তেল উঠাতে পারেনি।

মুজিব মাসুদ – যুগান্তর