পুরনো লঞ্চ চলছেই, ফের দুর্ঘটনার আশঙ্কা ॥ সী ট্রাক চালু দাবি

mawa overloadমাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে অনিয়মের শেষ নেই
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে লঞ্চ চলাচলে অনিয়মের যেন শেষ নেই। কেঁচো খুঁড়তে যেন সাপ বের হচ্ছে। ৩০-৪০ বছরের পুরনো লক্কড়ঝক্কড় মার্কা লঞ্চ এখনও চলছে। তাই উত্তাল পদ্মায় আবারও লঞ্চ দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা। এই রুটের ‘এমএল পদ্মা’ লঞ্চটির কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই। লঞ্চটির প্ল্যানে আছে ১৯ মিটার। তবে বাস্তবে ২৩ মিটার। কোন আলাদিনের চেরাগে এটি ১৪ ফুট বড় হয়ে গেল-সেটিই এখন প্রশ্ন। লঞ্চটির সার্ভে সনদই কী করে পেল? এই প্রশ্ন ছিল সার্ভেয়ার ড. এসএম নাজমূল হকের কাছে।

তিনি বলেন, দুই মাস আগে ঢাকা বন্দর থেকে বদলি হয়ে নারায়ণগঞ্জ বন্দরে আসে এই লঞ্চের ফাইলটি। নক্সা অনুমোদন করে নতুন মাপে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। অর্থাৎ এখন লিগ্যাল করে নিয়েছে। আমি এই ঘাপলা ধরে ২৩ মিটারেই সব কাগজপত্র ঠিক করে দিয়েছি। তবে আগে যিনি সার্ভে সনদ দিয়েছেন তিনি অন্যায় করেছেন। আমি অন্যায় করিনি। কর ফাঁকি দিয়ে বেশি যাত্রী বহন করার জন্যই এ অনিয়মের পথ বেছে নেন লঞ্চ মালিক আব্দুর রউফ।

তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর লঞ্চ প্রথম থেকেই কাগজের সঙ্গে বাস্তবের মিল আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে, শুধু এই লঞ্চের ইতিবৃত্তান্ত বিশ্লেষণ করলেই বেরিয়ে আসবে লঞ্চ সেক্টরের অনিয়মের নানা দৃষ্টান্ত। তাঁর পুরনো রেজিস্ট্রেশনটি বের করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এই লঞ্চের ডিজাইনেও নানা ত্রুটি রয়েছে। লঞ্চে যাত্রীরা প্রবেশ করতে গেলেই কপালে আঘাত পাচ্ছেন। এমনকি লঞ্চে উঠতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএর উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা আঘাতপ্রাপ্ত হন। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা এই লঞ্চটি নিয়ে রয়েছে নানা কথা। মন্ত্রীর কাছের লোক পরিচয় দিয়ে ক্রমাগত পার পেয়ে যাচ্ছে এটি। ‘এমএল খাজা’ লঞ্চের বিরুদ্ধেও রয়েছে হরেক রকম অনিয়মের অভিযোগ। এই লঞ্চটির মালিক সালেহ আহম্মেদ মারা গেছেন।

বর্তমানে তাঁর ছেলে টিপু আহম্মেদ ও মেদিনীম-লের ফিরোজ মিয়া দেখাশোনা করেন এটি। কিন্তু এই লঞ্চের স্টাফ এবং মালিকপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মোঃ রফিকুল ইসলাম নামে এক যাত্রী অভিযোগ করে জানান, পিনাক-৬ দুর্ঘটনার আগের দিন (৩ আগস্ট) কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া আসার পথে এই খাজা লঞ্চের মালিক পরিচয়ে ফিরোজ মিয়া যাত্রীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে পেশীশক্তির হুমকি দেয়। তবে কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে ত্রুটিযুক্ত এমএল খাজা এখন রুটে নেই।

এমন নানা অনিয়ম চেপে বসেছে ২২ বছর আগে চালু হওয়া এই লঞ্চ রুটে। ছোট এই রুটে বেশি লাভের আশায় লোভী একশ্রেণীর মালিক এখন যাত্রীসেবার পরিবর্তে শুধু টাকার নেশায় বুদ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও লঞ্চগুলোর যাত্রীসেবা অতি নিম্নমানের। যাত্রীদের জীবনরক্ষার বয়ার অভাব, বসার সিট নিম্নমানের, সব ক্ষেত্রে যাত্রীদের কথা না ভেবে শুধুই বেশি লাভের ধান্ধা। প্রতিদিন দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ সময় বাঁচাতে এই নিম্নমানের লঞ্চে চড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফেরিতে জায়গা না হওয়া এবং বিলম্বসহ নানা কারণেই অধিকাংশ যাত্রীর একমাত্র অবলম্বন এই লঞ্চ। বিআইডব্লিউটিসি এই রুটে ‘সি-ট্রাক’ চালু করলেও রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দাবি এখন পদ্মা সেতু না হওয়া পর্যন্ত এই নৌরুটে পর্যাপ্ত সি-ট্রাক চালুর।

এই রুটে চলাচলকারী বরিশালের শামীম হোসেন জানান, অনতিবিলম্বে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে পর্যাপ্ত সি-ট্রাক চালু করা এখন সময়ের দাবি। মাদারীপুরের শিবচরের নাসির উদ্দিন বলেন, এর আগে সি-ট্রাক চালু করলেও লঞ্চ আর স্পিডবোর্ট সিন্ডিকেট তা বন্ধ করার চক্রান্ত করে। খুলনার বিথী বেগম জানান, উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে এই লক্কড়ঝক্কড় মার্কা ছোট লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সি-ট্রাক চালু করলে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

উত্তাল পদ্মায় ত্রুটিযুক্ত ডিজাইন, দক্ষ চালক ও মাস্টারহীন লঞ্চগুলোর জন্য আবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাঁচ থেকে ছয় নটিক্যাল মাইল স্রোতে যেখানে বড় ফেরি চালাতেই দক্ষ মাস্টাররা হিমশিম খাচ্ছেন, অনেক সময় বন্ধ রাখছেন; সেখানে ছোট ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চগুলো চলছে অহরহ। আবার বহন করছে অতিরিক্ত নয়, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী।

এই লঞ্চ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। একচেটিয়া ব্যবসা, অধিক মুনাফা-এই নীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটিতে লঞ্চ ব্যবসা পরিচালনা করলেও তা দেখার যেন কেউ নেই। বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, মাওয়া-কাওড়াকান্দি পথে ৮৭টি লঞ্চের অনুমোদন আছে। অধিকাংশ লঞ্চ ৩০-৪০ বছরের পুরনো। লঞ্চের নক্সা অনুমোদন, নিবন্ধন, চলাচলের অনুমতি ও ফিটনেস সনদ দেয় নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআইডব্লিউটিএ এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। কিন্তু সরকারের এই দুই সংস্থার পাশাপাশি লঞ্চ মালিকদেরও অলিখিত অনুমোদন নিতে হয়। মূলত তাঁরাই ঠিক করেন, কার লঞ্চ আর পরিবহন এই পথে চলবে।

জনকন্ঠ