বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও জাতির কলঙ্ক মোচন

nooh-ul-alam-leninনূহ-উল-আলম লেনিন: দীর্ঘ ৩৪ বছরের প্রতীক্ষার অবসান হলো। সুপ্রিম কোর্ট আজ এক ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে। রায়ে খুনিদের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়। অবশেষে কিছুটা হলেও বাঙালি জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো। এই রায়ের ভেতর দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু কেন আমাদের এই ন্যায় বিচারের জন্য ৩৪টি বছর অপেক্ষা করতে হলো আজ প্রথমেই আমরা সে প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।

‘…আমার ঘোষিত এই অধ্যাদেশ অথবা সামরিক আইন বিধি অথবা আদেশ সম্পর্কে অথবা… নির্দেশ অনুযায়ী কৃত কোন কাজ বা নেয়া কোন ব্যবস্থা সম্পর্কে কোন রকমের প্রশ্ন তোলার অধিকার সুপ্রিম কোর্ট, ট্রাইব্যুনাল অথবা কোন কর্তৃপক্ষসহ কোন আদালতেরই থাকিবে না।’

খন্দকার মোশতাক কর্তৃক ঘোষিত ‘অসাধারণ’ সামরিক ফরমান

বাংলাদেশ গেজেট, রেজিঃ নং- DA-1

২০ আগস্ট ১৯৭৫

এভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের পথ চিরদিনের জন্য রুদ্ধ করতে চেয়েছিল খুনি মোশতাক এবং তার সহযোগীরা। বিচার তো দূরের কথা, খুনিদের যে কোনো কর্মকান্ড সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টসহ যে কোনো আদালতের প্রশ্ন তোলার অধিকারটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছিল। অতঃপর এই সামরিক ফরমানের অধীনে ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হয়েছিল আরেকটি দায়মুক্তির অধ্যাদেশ। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামে খ্যাত ওই অধ্যাদেশ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডের দায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি দিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের ‘‘সুপ্রিম কোর্ট বা কোন ট্রাইব্যুনাল অথবা যে কোন আদালতের’ বিচারিক ক্ষমতা রহিত করেছিল।
nooh-ul-alam-lenin
মোশতাকের ৮০ দিনের রাজত্বকালসহ জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার টানা একুশ বছরের শাসনামল জুড়ে বহাল ছিল উল্লিখিত অধ্যাদেশ। ফলে একুশ বছর ধরে বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অথবা বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্য, অসহায় নারী অথবা ছোট্ট সোনামনি রাসেল কারও হত্যাকান্ডেরই বিচার হয়নি; প্রশ্ন তোলা যায়নি কোনো আদালতে।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২৮ জুন বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ৬জনসহ ৯ কূটনীতিককে (জিয়া, এরশাদ ও খালেদা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সেইসব খুনিদের কূটনীতিকের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন) দেশে তলব করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৩ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (অব.) ফারুক, শাহরিয়ার ও খায়রুজ্জামানকে গ্রেফতার এবং ৩১ আগস্ট ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মামলা দায়ের করা হয়। পরে ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। আর ওই বছর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি বাতিল বিল পাস হয়। এই বিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে ১৯৯৭ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট ইনডেমনিটি বাতিল আইনকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। দীর্ঘ একুশ বছর পর বাঙালি জাতি একটি বর্বর অধ্যাদেশের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়।

তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ২১ এপ্রিল নিম্ন আদালতে প্রচলিত আইনে শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। দীর্ঘ শুনানি, জেরা ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সওয়াল জবাব শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারিক আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মামলায় ১৫ জন অপরাধীকে প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ২৩ বছর পর বিচারিক আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রলোভন সত্ত্বেও আদালত মাথা নত করেন নি। এই ঐতিহাসিক রায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ভিত্তি স্থাপন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করে।

কিন্তু উচ্চ আদালতে এসে শুরু হয় অভাবিত সব কান্ড কারখানা। আমার বন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বাংলাদেশকে ‘সব সম্ভবের দেশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মিথ্যে বলেননি তিনি। আমরা গভীর বিস্ময় ও বেদনা নিয়ে লক্ষ করলাম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স নিয়ে অকল্পনীয় সব নাটকীয়তা! প্রথমেই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনকের হত্যা মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই মামলাটির ডেথ রেফারেন্সের আগাম শুনানির আবেদন পর্যন্ত নাকচ করে দেয় (৭ ফেব্রুয়ারি ২০০০)। অতঃর শুনানি গ্রহণযোগ্যতা পেলেও শুরু হয় একের পর এক বিচারপতির ‘বিব্রতবোধ’ হওয়ার পালা। ২০০০ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম বিচারক বিচারপতি আমিনুল কবীর বিব্রতবোধ করায় মামলার নথি ফিরে যায় প্রধান বিচারপতির কাছে। ২৪ এপ্রিল ২০০০ গঠিত হয় নতুন বেঞ্চ। অবাক কান্ড! এবার এই বেঞ্চের উভয় বিচারক, বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন এবং বিচারপতি মোহাম্মদ মতিন বিব্রতবোধ করলে বিচার কাজ ঠেকে যায়। লজ্জা, হতাশা ও ক্ষোভ সমগ্র বাঙালি জাতিকে ম্রিয়মাণ করে তোলে। বিংশ শতাব্দীর অন্তিম মুহূর্তে এসেও আমরা মধ্যযুগীয় অতল অন্ধকারে পথ হাতড়িয়ে বেরাতে থাকি।
nooh-ul-alam-lenin1
নানা টানাপোড়েন ও চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর মহামান্য হাইকোর্টের দুই বিচারকের বেঞ্চ দুই রকম রায় দেন। বিচারপতি রুহুল আমিন নিম্ন আদালতে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত ৫ আসামিকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। আর বিচারপতি খায়রুল হক নিম্ন আদালতের দেয়া রায়, ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ বহাল রাখেন। সঙ্গত কারণেই এই বিভক্ত রায় আবার বিচার প্রক্রিয়াকে ঝুলিয়ে দেয়। প্রশ্ন উঠে তৃতীয় বেঞ্চ গঠনের।

অবশেষে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল বিচারপতি ফজলুল করিমের একক বেঞ্চ পূর্ববর্তী দুই বিচারপতির বিভক্তি রায় পর্যালোচনা ও শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। তিনি ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখেন এবং তিন আসামিকে খালাস দেন। উচ্চ আদালতের এই রায় দেশবাসী মেনে নেন। তারা আশা করেন এবার সুপ্রিম কোর্ট পর্যায়ের বিচারের সর্বশেষ ধাপটিও শীঘ্রই সম্পন্ন হবে এবং বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়-বিচার লাভের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে ৮ বছর পেরিয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চ গঠনে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। ২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। স্বভাবতই জোট সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যাপারে আগ্রহী তো ছিলইনা, বরং তারা রাজনৈতিকভাবেই ছিল এই মামলার বিচারের বিরোধী। কেননা বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রধান বেনিফিশিয়ারি। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের ভাবাদর্শগত এবং রাজনৈতিক মিত্র হচ্ছে বিএনপি, বিশেষ করে খালেদা জিয়া ও তার পরিবার এবং একাত্তরের ঘাতক-যুদ্ধাপরাধীদর দল জামায়াতে ইসলামী। এই জোট সরকার দীর্ঘ পাঁচ বছর আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় বিচারপতি নিয়োগ না করে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে রাখে সচেতনভাবেই। এমনকি ‘গণতন্ত্র আইনের শাসন ও মানবাধিকারের’ বংশীবাদক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছরে তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে। ‘‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিজ ডিনাইয়েড’ এই সর্বজনীন সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে।

গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বারবার বাংলাদেশের মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। অনেক রক্তক্ষরণ এবং অগণিত মানুষের আত্মদানের পটভূমিতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হয়। নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসন নিয়ে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করে। উন্মোচিত হয় সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘‘দিন বদলের সনদ’-এ অঙ্গীকার ছিল নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তা-ই ঘটেছে। দেশের সর্বোচচ আদালত সুপ্রিম কোর্ট গত ৫ অক্টোবর থেকে ২৯ কার্যদিবস ধরে হাইকোর্টের রায়ের পেপারবুক পাঠ শ্রবণ এবং আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের সওয়াল জবাব ধৈর্য্য ধরে শোনার পর অবশেষে ১৯ নভেম্বর ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেছে।

এই রায়ের ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হলো, কোন ব্যক্তি সে যত শক্তিধরই হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রমাণিত হলো প্রজাতন্ত্রের আর সকল নাগরিকের মতো প্রজাতন্ত্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা হওয়া সত্ত্বেও অথবা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হওয়ার গৌরবে ভূষিত একজন মহামানব হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিকদের অতিরিক্ত কোন বিচারিক সুযোগ পাননি। তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে আর সবার মতো প্রচলিত আইনে। বরং একজন সাধারণ নাগরিক নিহত হলে সে হত্যাকান্ডের বিচারে যে সুযোগ থাকে, দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচারের প্রশ্নে সে সুযোগটুকু পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিক সুযোগ বঞ্চিত এবং বৈরী শক্তির নানাবিধ কারসাজি সত্ত্বেও ন্যায়-বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় এই দিনটির জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যাসহ সমগ্র বাঙালি জাতিকে সুদীর্ঘ ৩৪টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

কী ভয়ঙ্কর দম্ভ ছিল খুনিদের! তারা আইনের ঊর্ধ্বে, কেউ তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। কেননা পঁচাত্তর পরবর্তী রাষ্ট্র বা সরকারগুলো ছিল তাদের পক্ষে। ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট খুনিদের রাজনৈতিক সর্দার বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ঘৃণিত ‘মীরজাফর’ খন্দকার মোশতাকের জারি করা সামরিক ফরমানই (এই নিবন্ধের শুরুতে উদ্বৃত) তার সাক্ষ্য বহন করে। আজ সভ্যতা ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থি সেই ফ্যাসিস্ট ঘোষণাটি টয়লেট পেপারে পরিণত হয়েছে। বাঙালি জাতির কলঙ্কমোচন হয়েছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যেদিন সপরিবারে নিহত হন সে দিনটি আমাদের কাছে অন্য কারণেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কথা ছিল ওই দিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদালয় পরিদর্শনে আসবেন। আমরা তৎকালীন ছাত্রনেতারা সারারাত জেগে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। রাত ১১টায় বঙ্গবন্ধু জ্যেষ্ঠপুত্র এবং জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা সদ্য বিবাহিত শেখ কামালকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন থেকে আমরা একরকম জোর করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা জোর না করলে কামাল সেদিন আমাদের সঙ্গে কলাভবনেই থেকে যেতেন এবং হয়ত প্রাণে বেঁচে যেতেন। কিন্তু আমরাতো জানতাম না ইতিহাসের নিয়তি আমাদের জন্য কী ট্র্যাজেডি নিয়ে অপেক্ষা করছে।

১৯৭৫-এর পাখিডাকা ভোরে যখন আমরা আমাদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ওই দুঃসংবাদটি শুনলাম, তখন আমরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাৎক্ষণিকভাবে আমরা ঢাকাতে কোন প্রতিবাদ সংগঠিত করতে পারিনি। আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম বটে, কিন্তু পারিনি, সে কাহিনী আজ নয়। তবে এটুকু বলব রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভীরুতা, কাপুরুষতা এবং সিদ্ধান্তহীনতাও এ জন্য দায়ী। বঙ্গবন্ধুর লাশ যখন তাঁর ৩২নম্বরের বাসভবনের সিঁড়িতে পড়ে আছে, তখন বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য বন্দুকের নলের ডগায় খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। টিভিতে ওই দৃশ্য দেখে আমাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। যারা বঙ্গবন্ধুর জীবিতাবস্থায় সদম্ভে ঘোষণা করতেন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কিছু বললে জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলবেন, সেই নেতাদেরও সেইদিনে খুঁজে পাইনি। তারা কেউই মাথা উঁচু করে দাঁড়াননি। কয়েকদিনের মধ্যে তারা গ্রেফতার বরণ করেন।

ইতিহাসের কী পরিহাস! ওই নেতারাই পরবর্তীকালে আবার আওয়ামী লীগের কর্ণধার হয়েছেন, কেউ কেউ মন্ত্রী হয়েছেন। এবারও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা কারাগারে বন্দি হলে এবং হত্যা ষড়যন্ত্রের শিকার হলে ওই নেতারা আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা মাইনাস টুর নামে কার্যত মাইনাস ওয়ান (শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চির বিদায় জানানোর তত্ত্ব) তত্ত্বের পালে হাওয়া দেন। ভীরুতা, কাপুরুষতা এবং সুবিধাবাদের যে নিকৃষ্ট নজির তারা স্থাপন করেন ইতিহাসই তার বিচার করবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর মোশতাক-জিয়াচক্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল। ৬৭ দিন পর ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিন আমরা প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকম্পিত করে সংগঠিত মিছিল করেছিলাম। জয় বাংলা ও জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনির পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগান উঠেছিল ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ এবং ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।’ তারপরের কাহিনী বারান্তরে বলা যাবে। আজ কেবল একটা গ্লানিবোধের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির অনুভূতি প্রকাশ করেই এই নিবন্ধের ইতি টানব।

১৯৭১ সালে আমরা টগবগে তরুণ। ১ মার্চ ইয়াহিয়ার জাতীয় সংসদের অধিবেশন মুলতবির ঘোষণা শোনার পর, কী ছাত্রলীগ, কী ছাত্র ইউনিয়ন, তৎকালীন কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই কারও নির্দেশের অপেক্ষা করিনি। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমে এসেছিলাম। পঁচিশে মার্চের পর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম মরণজয়ী মুক্তিযুদ্ধে। ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় অর্জনের আগে কেউই আমরা ঘরে ফিরে যাইনি।

সেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের সাহসী প্রজন্ম, মাত্র সাড়ে তিন বছর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ ধ্বনিত করতে পারিনি। আমরা নেতাদের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছি। আমরা বিশ্বাসঘাতকতা, কাপুরুষতা ও আত্মসমর্পণ দেখে দেখে হতাশায় মুষড়ে পড়েছি।

অবশ্য প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে আমরা খুব দ্রুত সংগঠিত হয়েছিলাম। সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু, কারফিউ, রাজনীতি, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ এবং গ্রেফতার নির্যাতনকে উপেক্ষা করেই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ছাত্র-তরুণ এবং রাজনৈতিক কর্মীরা সংগঠিত তৎপরতা শুরু করেছিলাম। আমরা ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ নামে লিফলেটসহ অনেক প্রচারপত্র, ‘ইস্পাত’ নামে গোপন পত্রিকা প্রকাশ করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিছিল-সমাবেশ করেছি। হামলা মোকাবিলা করেছি, বন্দুকের নলের মুখে জাতির জনকের বাড়ির সামনে মৌন মিছিল নিয়ে গিয়েছি। অনেকে কারাবরণ করেছে, আত্মদানের ঘটনাও বিরল নয়। কেবল আত্মরক্ষাই নয়, ৭১-এর মতো আবার একটি মুক্তিযুদ্ধের লক্ষে অনেক সহকর্মী সীমান্ত অতিক্রম করেছে। সহ্য করেছে দুঃসহ অনিশ্চিত জীবন। হাতিয়ার তুলে নিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ জীবনও দিয়েছে। আজকের দিনে তাদের স্মৃতির প্রতি জানাচ্ছি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

এসব সত্ত্বেও আমি এবং আমার মতো অনেকেই গত ৩৪ বছর একটা অপরাধবোধ ও গ্লানিবোধের যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও মোটিভ ছিল-ষড়যন্ত্র ছিল তার বিচার কিন্তু আজও হয়নি। একথা তো সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হত্যা করে, তেমনি জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান বলে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আমাদের পবিত্র সংবিধানকে। জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র-বৈশিষ্ট্য পাল্টে দেন। এ থেকেই প্রমাণিত হয় বঙ্গবন্ধুর খুনি ও তার সহযোগীদের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য, অর্জনসমূহ এবং বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শকে নির্মূল করা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ জাতির জনকের আদর্শ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যও গত ৩৪ বছর ধরে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম পরিচালনা করে আসতে হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার রাজনৈতিক প্রতিশোধ অর্থাৎ ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ধারায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এখনও ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটেনি। এ কারণে আত্মজিজ্ঞাসায় নিজেদের ক্ষত-বিক্ষত করেছি আমরা কেন বঙ্গবন্ধুর খুনের বদলা নিতে পারলাম না? ’

’৭১-এ পারলেও কেন ’৭৫-এ আমরা তাৎক্ষণিকভাবে দ্রোহের পতাকা উড্ডীন করতে পারলাম না? যত যুক্তিই দেখাই না কেন, অন্য যাকেই দায়ী করি না কেন তারপরও নিজেদের ভীরুতা ও অক্ষমতাকে কোনদিন ক্ষমা করিনি। ৩৪টি বছর এই গ্লানিবোধ আমাকে আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বদলা নিতে না পারলেও ৩৪ বছর পর যে জাতি ন্যায়-বিচার পেয়েছে, জাতি যে একটা দুরপনেয় কলঙ্ক থেকে উদ্ধার পেয়েছে এই সান্তানাটুকু নিয়েই আজ ইতিহাসের দায়মুক্তির সংগ্রামের পথে এগিয়ে যেতে চাই। আর মনে মনে উচ্চারণ করতে চাই, ‘‘পিতা, আমাদের ক্ষমা করো’ বলতে চাই, ‘‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’