পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চটি কোথায় গেল- নানা প্রশ্ন?

pinakDপানিতে ডুবে মানুষের সলিল সমাধি নয়, এবার আস্ত একটি যাত্রীবোঝাই লঞ্চের সলিল সমাধির ঘটনা ঘটল। সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর আট দিন পর অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হলো। এ ঘটনা দেশের প্রায় সর্বমহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, বেআইনী তৎপরতায় জড়িত থেকে অভ্যন্তরীণ নৌরুটগুলোতে অহরহ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে চলেছে। সর্বশেষ দুঃখজনক ও বিয়োগান্তুক ঘটনায় ৫৫ ফুট লম্বা, ২০ ফুট চওড়া ও ২৫ ফুট উচ্চতার একটি কাঠ, লোহা ও স্টিলনির্মিত লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। এ ঘটনা গত ৮ মার্চ মালয়েশিয়ার ২৩৯ যাত্রীবাহী একটি বোয়িং বিমান আকাশেই উধাও হয়ে যাওয়ার রূপকথার কাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আকাশে সে বিমান হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যেমন আলোচিত, তেমনি বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে যাত্রীসহ একটি লঞ্চ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বিস্ময়কর।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এ লঞ্চের উদ্ধার তৎপরতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পিনাক-৬ নামের প্রায় ৩শ’ (সরকারীভাবে আড়াই শ’) যাত্রীবোঝাই লঞ্চটি গত ৪ আগস্ট কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া যাওয়ার পথে ডুবে যায়। ডুবে যাওয়ার পর থেকে এটিকে উদ্ধারের জন্য সরকারের হাতে থাকা সকল শক্তি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু সব আশা নিষ্ফল করে গত সোমবার উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। ডুবে যাওয়ার পর যাত্রীদের মধ্যে জীবন্ত উদ্ধার হয়েছে ১১০, লাশ পাওয়া গেছে ৪৪। নিখোঁজ রয়েছে আরও ৬১। অবশ্য বেসরকারীভাবে এ সংখ্যা আরও বেশি।

আস্ত এতবড় একটি লঞ্চ পদ্মা নদীর কোথায় হারিয়ে গেল এ নিয়ে দেশজুড়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা কোনমতেই হতে পারে না। তাঁদের মতে, পদ্মা নদীতে সর্বোচ্চ গভীরতা ২শ’ ফুট। ডুবে যাওয়ার পর স্রোতের টানে এটি কোন অবস্থাতেই সাগর পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার ২৫ ফুট উচ্চতার কারণে এটি পলিতে ঢেকে যাওয়ার সুযোগও নেই। তাহলে এটিকে খুঁজে পেতে ব্যর্থতা কোথায়, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা জিজ্ঞাসার।

প্রসঙ্গত, উল্লেখ করতে হয়-বঙ্গোপসাগরের ৩শ’ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ফুট গভীরতায় বাংলাদেশের অত্যাধুনিক ট্রলারগুলো যে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত এগুলো শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে অর্থাৎ, ‘সোনার’ সিস্টেমে মৎস্যের অবস্থান খুঁজে বের করে থাকে। এ সিস্টেমে সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির মাছের ঝাঁক কোথায় রয়েছে তাও খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে ট্রলিং করে মাছ তুলে নিতে ট্রলারগুলোর আর কোন অসুবিধা হয় না। এভাবেই ট্রলারগুলো সাগর থেকে রূপালী সম্পদ আহরণ করছে নিয়মিত।

নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার পর নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিক উদ্ধারকারী জাহাজ- যেগুলোতে রয়েছে সাইট স্ক্যানার সোনার এবং সাব-বটম প্রোফাইলার এবং এর পাশাপাশি হেলিকপ্টার ও সনাতন পদ্ধতির অভিযানেও এটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। এটি মানুষের কাছে এখনও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। এ না পাওয়ার ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কিনা, সে প্রশ্নও মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার দশটি অনুসন্ধান জাহাজ পদ্মা নদীর সন্দেহজনক স্পটগুলোতে তন্ন তন্ন করে অভিযান চালিয়ে এটির কোন হদিস মেলাতে পারল না।

প্রশ্ন উঠেছে, এতে প্রযুক্তির অভাব রয়েছে, না প্রযুক্তি বোঝার অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। কেননা, গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে যেখানে ক্ষুদ্রাকৃতির মাছ পর্যন্ত ট্রলারগুলো সোনার সিস্টেমে তুলে আনতে সক্ষম, সেখানে নদীবক্ষে নিমজ্জিত আস্ত একটি লঞ্চ খুঁজেই পাওয়া যাবে নাÑএটা বিশ্বাসে আনতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। গত মার্চে মালয়েশিয়ার বিমান উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যেমন বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, তেমনি বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ ডুবার পর উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী না হলেও দেশব্যাপী সকলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, এত তাড়াতাড়ি উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা উচিত হয়নি। ভেবে চিন্তে প্রয়োজনে বিদেশী সহায়তা এক্ষেত্রে নেয়া যেতে পারত। যেহেতু জাহাজটি ডুবে যাওয়ার সময় সচিত্র ছবি ধারণকৃত রয়েছে সেক্ষেত্রে এটি নদী তলদেশে কোথাও না কোথাও যে রয়েছে-এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু গেল কোথায়? কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বন্দরের জরিপ ও উদ্ধারকারী জাহাজের সব তৎপরতা এভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে নৌরুটের যে কোন দুর্ঘটনা নিয়ে মানুষের মনে হতাশার সৃষ্টি করেছে।

উল্লেখ্য, গত চার দশকে অসংখ্য জাহাজডুবির ঘটনায় প্রায় সাড়ে দশ হাজার যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৩ সালে। ওই বছর ১ হাজার ১০৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা সরকারী হিসেবে। এ সব ঘটনার কোনটিতেই ডুবে যাওয়া জাহাজের সলিল সমাধি ঘটেনি। কোন না কোনভাবে সহসা বা বিলম্বে ল-ভ- হয়ে পড়া লঞ্চও উদ্ধার করা গেছে। কিন্তু এবারই প্রথম ৫৫ মিটার লম্বা একটি লঞ্চ পানির নিচে হারিয়েই গেল। সম্ভবত এটাই দেশের ইতিহাসে এ জাতীয় প্রথম ঘটনা।

নৌ-বিশেষজ্ঞদের কারও কারও মতে, দেশে যে আধুনিক ট্রলারগুলোর গভীর সাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত এগুলোর কয়েকটিতে একযোগে উদ্ধার অভিযানে লাগানো হলে হয়ত বা এদের সোনারে ধরা পড়ে যেতে পারে লঞ্চটির অবস্থান। উল্লেখ্য, গভীর সমুদ্রে বর্তমানে ৮০টিরও বেশি এ জাতীয় ট্রলার মৎস্য আহরণে নিয়োজিত। এ সব ট্রলার থেকে সমুদ্র তলদেশের বালি পর্যন্ত নিরীক্ষা করা যায়। মাছের শ্রেণীবিন্যাস খুঁজে পাওয়া যায়। অধিক পরিমাণ মাছের আবাস নির্ণয় করা যায়। সেক্ষেত্রে এ সব ট্রলার পদ্মা নদীর তলদেশে ডুবে যাওয়া একটি এতবড় লঞ্চ শনাক্ত করতে না পারার কথা নয়। বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জনকন্ঠ