পরিবারের সবাইকে হারিয়ে সুরতুন্নেসার বিলাপ-আমার বেঁচে থাকাই মিছে

pinakDমাওয়ায় লঞ্চডুবি
মাওয়ার কাছে পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ উদ্ধার কার্যক্রম আট দিনের মাথায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার পর স্বজনহারা পরিবারগুলোর কষ্ট যেন আরও বেড়ে গেছে। স্বজনহারা পরিবারগুলোতে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে।

ষাটোর্ধ সুরতুন্নেসা পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শোকে পাথর। তাঁর ছেলে, মেয়ে, জামাই ও নাতিকে কেড়ে নিয়েছে পিনাক-৬। আট দিনে কারও সন্ধান মেলেনি। শুধু পাওয়া গেছে তাঁর হাতে ভরে দেয়া বাদাম ও মুড়ির ব্যাগটি। এখন এই ব্যাগটি নিয়েই বুক চাপড়াছেন মাদারীপুরের শিবচরের পশ্চিম সন্ন্যাসীরচরের সুরতুন্নেসা। ২০০৫ সালে স্বামী আনোয়ার মাদবরকে হারিয়েছেন। এর পর ছেলে বিল্লাল হোসেন ও কন্যা শিল্পী আক্তারকে নিয়ে জীবন-সংগ্রামে কিছুটা সুখের নাগাল পেয়েছিলেন। এসএসসি পাস কন্যাকে বিয়ে দেন পাশের পূর্ব সন্ন্যাসীরচরের ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে ২০১১ সালে।

গত বছর রোজার শেষ দিকে ঘরে আসে ফুটফুটে নাতি ফহিম হোসেন। ফরহাদ হোসেন (২৭) ঢাকার নবাবপুরের লেদ মেশিনে চাকরি করতেন। তাই সপরিবারে ঢাকার রায়েরবাগ ভাড়া বাসায় থাকত ছোট্ট পরিবারটি নিয়ে। আর বিল্লাল হোসেন ঢাকার খিলক্ষেতে একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। সেখানেই একটি বাসায় থাকতেন বিল্লাল। আর বাড়িতে একাই ছিলেন সুরতুন্নেছা। সবাই মমতাময়ী সুরতন্নেছার কাছে আসেন এক সঙ্গে ঈদ করতে। জামাই ফরহাদ হোসেনের মা-বাবা না থাকায় সুরতুন্নেছার কাছে পেতেন মায়ের আদর। এক সঙ্গে ঈদ করে আবার কর্মস্থলে ফিরছিলেন পুত্র বিল্লাল হোসেন (২৩), কন্যা শিল্পী আক্তার (২৫), জামাই ফরহাদ হোসেন (২৭) ও নাতি ফাহিম হোসেন (১)। আগামী কোরবানির ঈদ, আরও নানা স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে বের হন সবাই। কিন্তু মুহূর্তেই সব কেড়ে নিয়েছে পদ্মা।

এখন একেবারেই একা। কি অবলম্বনে বেঁচে থাকবেন তাই খুঁজে পাচ্ছেন না। শোকে পাথর সুরতুন্নেসা বিলাপ করতে করতে বলছেন, আমার বেঁচে থাকাই এখন মিছে। সোমবার লঞ্চ উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার কথা শুনতেই তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। ‘তাইলে কি আমার পোলা, মাইয়া, জামাই, নাতি কাউর লাশটাও আর পামু না? আমি কি নিয়া বাঁচুম?’ বলেই মূর্ছা যান সুরতুন্নেছা। তাঁর ছোট্ট সংসার চালাতেন যেই পুত্র, সেও নেই। এখন রোজগারও নেই। তাঁর কাছে সেটা বড় কথা নয়, এখন তিনি শুধু একা হয়ে গেলেন!

সুরতুন্নেছার ভাই আলমগীর হোসেন ঢাকার পর্যটন প্রতিষ্ঠান গ্রিন চ্যানেলে চাকরি করেন। আলমগীর সব ছেড়ে এসে এখন বোনের পরিবারের এই চার সদস্যকে খুঁজে ফিরছেন। সোমবারও তিনি এই চারজনের ছবি নিয়ে দীর্ঘ সময় বসেছিলেন শিবচরের পাঁচ্চর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে- যদি কারও সন্ধান পান সেই আশায়। কিন্তু যখন শুনলেন লঞ্চ গনাক্তকরণ কাজ একেবারেই বন্ধ, শুনে তারও মন খারাপ হয়ে যায়। বলেন, ‘বইনেরে বাড়ি গিয়া কি বুঝ দিমু আইজ। এতদিন তো বলতাম লঞ্চ উঠাইলেই ওগো পাওয়া যাইব, অহন কি করুম?’ স্বজনহারারা এখনও ঘুরছেন নদীর তীরে তীরে। যদি ত্াদের প্রিয়জনের লাশটা অন্তত পাওয়া যায়?

জনকন্ঠ